জামায়াত নিষিদ্ধে কোটি মানুষের রায় সংসদে
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৩, ২২:৪৯
সকল যুদ্ধাপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধসহ ছয় দফা বাস্তবায়নে গণজাগরণ মঞ্চের দাবির পক্ষে রায় দিয়েছেন কোটি জনতা। গণস্বাক্ষরে প্রতিফলিত জনগণের স্বাক্ষরের নমুনাপত্র জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কাছে তুলে দিয়েছেন মঞ্চের সংগঠকরা। জাতীয় সংসদ এ গণস্বাক্ষরের মাধ্যমে অর্জিত ‘গণরায়ের’ প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে ছয় দফা বাস্তবায়নে কার্যকরী ভূমিকা নেবে বলে দাবি করেছেন আন্দোলনরতরা। এক্ষেত্রে সরকার ‘সময়ক্ষেপণ’ করবে না বলেও তারা আশা করছেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে আমরণ অনশন অব্যাহত রেখেছে শহীদ রুমী স্কোয়াড। অনশনের একশ’ ঘন্টা পূর্তিতে গত শনিবার রাত আড়াইটার দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর অনলাইনের মাধ্যমে খোলা চিঠি দিয়েছে স্কোয়াড। তবে গতকাল রাত পর্যন্ত ঐ চিঠির বিপরীতে সাড়া দিয়ে কোনো বক্তব্য দেননি প্রধানমন্ত্রী।
পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে সংসদ অভিমুখে গণমিছিল নিয়ে যাত্রা করে গণজাগরণ মঞ্চ। মিছিলটি রাজধানীর পরিবাগ দিয়ে রওয়ানা দিতে চাইলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। বাংলামোটর অতিক্রম করার সময় দ্বিতীয় দফায় পুলিশি বাধার মুখে পড়ে মিছিলটি। পুলিশের বাধা ভেঙ্গে মিছিলটি জাতীয় সংসদ অভিমুখে যাত্রা করলে আবারো ফার্মগেট এলাকায় বাধাপ্রাপ্ত হয়। পুলিশ সেখানে একটি বাস আড়াআড়িভাবে রাস্তার ওপর রেখে গণমছিলটিকে আটকে দেয়। এক পর্যায়ে মিছিলকারীরা সেখানে অবস্থান নেন। পরে পুলিশি প্রহরায় গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারসহ ১২ জনের একটি প্রতিনিধি দল জাতীয় সংসদ ভবনের দিকে যাত্রা করেন। দুপুর একটার দিকে মিছিলটি শাহবাগে ফিরে আসে। মঞ্চের প্রতিনিধি দলটি জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে গেলে পুলিশ আটকে দেয়। পরে ১২ জনের মধ্য হতে তিনজনের একটি প্রতিনিধি দল স্পিকারের সাথে সাক্ষাত্ করেন। ঐ তিনজন হলেন ইমরান এইচ সরকার, ছাত্র ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান তমাল এবং কানিজ আকলিমা টিনু। দুপুর দুইটার দিকে তারা জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কর্নেল (অব.) শওকত আলীর কাছে গণস্বাক্ষরের একটি নমুনাপত্র হস্তান্তর করেন।
মঞ্চের অন্যতম সংগঠক বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সভাপতি বাপ্পাদিত্য বসু বলেন, গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ মার্চ পর্যন্ত মঞ্চের ছয় দফার পক্ষে সারা দেশ থেকে এক কোটি সাত হাজার ৭৬১টি স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছে। এ রায়ে মঞ্চের দাবির সাথে একাত্মতা জানিয়ে কোটি জনতা গণরায় দিয়েছেন। এখন সরকারকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
মঞ্চের মিছিলে বাধা দেয়া প্রসঙ্গে রমনা জোনের উপ-কমিশনার (ডিসি) মারুফ হাসান জানান, মিছিলটি শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু মিছিলের নিরাপত্তার স্বার্থে এবং নাশকতার আশঙ্কা থাকায় বাধা দেয়া হয়েছে। তবে তাদের প্রতিনিধি দল স্পিকারের সাথে দেখা করে গণস্বাক্ষর হস্তান্তর করেছে।
স্পিকারের সাথে সাক্ষােশষে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, স্পিকার আমাদের দাবি মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। দাবির বিষয়টি সরকারকে জানিয়ে তা বাস্তবায়নের সুপারিশ করবেন। এ বিষয়ে সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইমরান জানান, জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া শুরুসহ ছয় দফা বাস্তবায়নের দাবিতে ৪ এপ্রিল তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেবেন। এরপরও যদি সরকার ‘সন্তোষজনক ব্যবস্থা’ গ্রহণ না করে তবে কঠোর কর্মসূচি দেয়া হবে বলে তিনি জানান।
জনসংযোগ করবে গণজাগরণ মঞ্চ
৪ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেয়ার আগে আজ সোমবার থেকে আগামী ৩ এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং বিদ্যালয়ে জনসংযোগ করবে গণজাগরণ মঞ্চ। মঞ্চের দাবির পক্ষে হ্যান্ডবিল প্রকাশ করা হয়েছে। আজ থেকে তা শাহবাগসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নির্দিষ্ট স্থানে বিলি-বন্টন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রীকে খোলা চিঠি
রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিতে চলমান আমরণ অনশনের ১০০ ঘণ্টা পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীকে একটি খোলা চিঠি দিয়েছে শহীদ রুমী স্কোয়াড। গত শনিবার রাত আড়াইটার দিকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে প্রেরিত ই-মেইল বার্তায় যুদ্ধাপরাধের দায়ে জামায়াত-শিবিরকে ‘কবে কখন কীভাবে নিষিদ্ধ করা হচ্ছে’ তা জানতে চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট বক্তব্য দাবি করা হয়েছে। তবে গতকাল রাত আটটা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পায়নি স্কোয়াড। এ প্রসঙ্গে স্কোয়াডের মুখপাত্র সেঁজুতি শোনিমা নদী জানান, ‘মেইল পাওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে মেইলের বক্তব্যের বিষয়ে সাড়া দিয়ে কোনো বক্তব্য এখনো দেননি প্রধানমন্ত্রী।
চিঠিতে প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়, ‘আমরা জানি বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি হিসেবে এবং আওয়ামী লীগের বর্তমান সভানেত্রী হিসেবে একমাত্র আপনার সত্যিকারের সদিচ্ছাই পারে এদেশ থেকে যুদ্ধাপরাধী জঙ্গিদল জামায়াত-শিবিরের মূলোত্পাটন করতে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমগ্র ইউরোপ জুড়ে নািস পার্টির সমস্ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা হয় এবং এখনো তা বহাল আছে। আমরা আশা করছি বাংলাদেশ একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে একই উপায়ে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে বিশ্বের দরবারে আরেকটি উদাহরণ তৈরি করবে।’
অনশনরতদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে বলা হয়, ‘আপনি জানেন এবং বোঝেন, আপনি চাইলেই যে কোন বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রগুলোতে জামায়াত-শিবিরের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা সম্ভব। আপনি চাইলেই আপনার সামনে খুলে যাবে অনেকগুলো রাস্তা; যার যে কোন একটিতেই গেলেই অর্জিত হবে বিজয়। আপনি চাইলেই সকল বাধা-বিপত্তি এড়িয়ে আইনগতভাবে, সাংবিধানিকভাবে, রাজনৈতিকভাবে অথবা স্রেফ গণতান্ত্রিকভাবেই এটি সম্ভব। আর তাই, আমাদের আস্থার জায়গাতে ধস নামলেও, একদিন আপনিই পারবেন এদেশ থেকে জামায়াত-শিবিরকে পুরোপুরি নির্মূল করতে। এ বিশ্বাস এখনো আছে আমাদের। তাই, অবিলম্বে আপনার কাছ থেকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিক-নির্দেশনা এবং সুস্পষ্ট বক্তব্য শুনতে চাই আমরা।’
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য না শোনা পর্যন্ত অনশন চলবে জানিয়ে চিঠিতে বলা হয়, ‘আন্দোলনের এ পর্যায়ে এসে আমরা জানি, বিজয়-না হলে মৃত্যু-এ পথেই এগিয়ে যেতে হবে আমাদের।’
অনশনরত একজন হাসপাতালে
অনশনরত পাঁচ জন গত শনিবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও শনিবার রাত ও গতকাল সকালের মধ্যে চারজন আবার অনশনস্থল জাতীয় জাদুঘরের মূল ফটকের সামনে ফিরে এসেছেন। তবে শারীরিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নতি না হওয়ায় বারডেম হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন অনশনকারী শুভ্র মাহমুদ জ্যোতি। সবমিলিয়ে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৯ তরুণ-তরুণী শাহবাগে অনশন করছেন। তাদের দাবির সাথে গতকাল আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন সংহতি জানিয়েছেন। পানিশূন্যতাজনিত কারণে অনশনরতদের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটছে বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকরা। গত ২৬ মার্চ এ অনশন শুরু করে শহীদ রুমী স্কোয়াড।
কঠোর কর্মসূচি দেয়ার হুশিয়ারি
আগামী ৪ এপ্রিলের মধ্যে জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আইনি প্রক্রিয়া শুরুর সুনির্দিষ্ট ঘোষণাসহ ছয় দফা বাস্তবায়নে সরকারকে আন্তরিকভাবে উদ্যোগী হওয়ার আহবান জানিয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। ৪ এপ্রিলের মধ্যে এ দাবির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেয়া না হলে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ অবরোধ, অবস্থান ধর্মঘট, লং মার্চ, মহাসমাবেশ, গণঅনশন, সারাদেশ থেকে ‘ঢাকামুখী অভিযাত্রা’সহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হবে গণজাগরণ মঞ্চ। গতকাল রাতে শাহবাগে এক সাংবাদিক সম্মেলনে মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার এ হুঁশিয়ারি দেন।
তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলনের তীব্রতায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে জামায়াতে ইসলাম ও ছাত্র শিবির হামলা, সন্ত্রাস, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িতে হামলা ভাঙচুর করে দেশে নৈরাজ্য ও সহিংস পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে অন্যায়ভাবে দফায় দফায় হরতাল ডেকেছে। অতীতেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়ে জনগণ এই অপশক্তির ডাকা সকল হরতাল প্রত্যাখ্যান ও প্রতিহত করেছে।
২ এপ্রিল ছাত্র শিবিরের ডাকা হরতাল প্রত্যাখ্যান ও প্রতিহত করতে জনগণের প্রতি আহবান জানিয়েছে মঞ্চ।
স্পিকারের কাছে গণস্বাক্ষর হস্তান্তর বিষয়ে তিনি বলেন, মঞ্চের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী সংগৃহীত এক কোটি সাত হাজার ৭৬১টি গণস্বাক্ষর জাতীয় সংসদের স্পিকার বরাবর পেশ করা হয়েছে। তিন সদস্যের প্রতিনিধি দল স্পিকার মহোদয়ের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেন। সুসজ্জিত ট্রাক ভর্তি স্বাক্ষরের নমুনাসহ প্রতিনিধি দলটি স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন। স্পিকার দাবির সঙ্গে একমত পোষণ করে দাবিসমূহ বাস্তবায়নের জন্য সরকারের কাছে যথাযথভাবে তুলে ধরার আশ্বাস প্রদান করেন। প্রতিনিধি দলের পক্ষ থেকে চার এপ্রিলের মধ্যে জামাত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আইনি প্রক্রিয়া শুরুর সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দাবি করেন।
ইমরান বলেন, দেশের কোটি মানুষ গণস্বাক্ষর প্রদান করে দাবির যৌক্তিকতা প্রমাণ করেছেন এবং এর সঙ্গে তাদের একাত্মতাও ঘোষণা করেছেন। এ গণ আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো গণতান্ত্রিক সরকারের কর্তব্য।