২ এপ্রিল সারাদেশে ১৮ দলের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল

ইসলামী ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতারের প্রতিবাদে প্রথমে ছাত্র শিবির আগামীকাল মঙ্গলবার (২ এপ্রিল) সারাদেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করে। পরে বিএনপি নেতৃত্বধীন ১৮ দল মঙ্গলবার দেশজুড়ে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করে। এছাড়া সরকারের পদত্যাগের দাবিতে ১০ এপ্রিল ঢাকায় সমাবেশ করবে ১৮ দল। সমাবেশে বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া সরকার পতনের কর্মসূচি ঘোষণা দেবেন। গতকাল রাতে গুলশানে বিএনপি’র চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে বেগম খালেদা জিয়ার সভাপতিত্বে ১৮ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে হেফাজতে ইসলামীর লংমার্চ, সারাদেশে পুলিশী আক্রমণ, গুলিবর্ষণ, বিরোধী দলীয় নেতাদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, মামলাসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে লেবার পার্টির সভাপতি ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান জানান, হেফাজতে ইসলামের লংমার্চে ১৮ দল এখনই সমর্থন দিবে না। কারণ তারা আরাজনৈতিক কর্মসূিচ পালন করছে। বৈঠক সূত্র জানায়, হেফাজতে ইসলামীর কর্মসূচিতে বাধা দেয়া হলে ৮ ও ৯ এপ্রিল ৩৬ ঘন্টা হরতাল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, সরকারের এখন শেষ সময়। সরকার নানাভাবে ছলছুতো করে নিপীড়ন নির্যাতন চালিয়ে ক্ষমতা টিকে থাকার চেষ্টা করছেন। তাদের আর সময় দেয়া হবে না। ১০ এপ্রিলের পর সরকার পতনের এক দফা প্রস্তুতি নেয়া হবে। গতকাল রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে মোহাম্মদপুরে এক আত্মীয়ের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সভাপতিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদ জানিয়ে শিবির আগামীকাল মঙ্গলবার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। গ্রেফতারের খবরে ঢাকাসহ সারাদেশে শিবির বিক্ষোভ মিছিল করে। এসব বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ঢাকার বিভিন্নস্থানে শিবির কর্মীরা ৫টি গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, নোয়াখালী, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে শিবির কর্মীরা গাড়ি ভাংচুর করেছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, তাকে গ্রেফতারের জন্য বেশ কয়েকদিন ধরেই গোয়েন্দা তত্পরতা চলছিল। দেলাওয়ারের বিরুদ্ধে হত্যা, নাশকতা ও সরকার বিরোধী কর্মকাণ্ডের ইন্ধন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। আজ তা আদালতে হাজির করে রমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানান তিনি। এদিকে ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দেলাওয়ার গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে শিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল জব্বার বলেন, সরকার অন্যায়ভাবে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতিকে গ্রেফতার করেছে। শিবির সভাপতিকে গ্রেফতার করে সরকার সারা বাংলাদেশের ছাত্রজনতাকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তাই শিবির সভাপতিকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে মঙ্গলবার হরতাল ছাড়াও আজ সোমবার দেশব্যাপী তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করবে। এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতা ফারুক হত্যা মামলায় শিবিরের সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন আসামি। ২০১০ সালের ৭ মার্চ ঢাকার ধামরাই থেকে র্যাব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমীর আলী হলের শিবির সভাপতি ইকরাম হোসাইনকে গ্রেফতার করে। ইকরাম আদালতে ফারুক হোসেনকে হত্যার ব্যাপারে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে বলা হয়, ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে শাহ মাখদুম হলে ছাত্রলীগ নেতা ফারুক হোসেনকে হত্যার আগে হলে আক্রমণ চালানোর পরিকল্পনার জন্য ঐ সময় ছাত্রশিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম ও কেন্দ্রীয় কমিটির তত্কালীন অফিস সম্পাদক দেলাওয়ার হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। আদালতে দেয়া ঐ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির প্রেক্ষিতে ফারুক হত্যা মামলায় রেজাউল করিম ও দেলাওয়ার হোসেনকে আসামি করা হয়েছে। রাজধানীর ডেমরার মাতুয়াইল শিশু সদনের সামনে রাত ৮ টার দিকে শিবির কর্মীরা ৩ টি বাসে আগুন ধরিয়ে দেয়। গুলশানের শাহজাদপুরে রুপায়ন সেন্টারের সামনে সন্ধ্যা ৭ টার দিকে মোহাম্মদপুর-গুলশান রুটে বিআরটিসির একটি দোতলা বাস জ্বালিয়ে দেয় শিবির কর্মীরা। ঢাকেশ্বরী মন্দিরের সামনে রাত সাড়ে ৮ টার দিকে শিবির কর্মীরা সেফটি পরিবহনের একটি বাস জ্বালিয়ে দেয়। রাত ৯টায় শেওয়াপাড়া বাস স্ট্যান্ডে এনা পরিবহনের একটি বাস শিবির কর্মীরা জ্বালিয়ে দেয়। একই সময়ে বাসস্ট্যান্ডের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকা একটি প্রাইভেট কারে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের দুইটি ইউনিট গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলে। চট্টগ্রাম অফিস জানায়, বহদ্দারহাট ও বাদুরতলা এলাকায় গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় শিবিরের ঝটিকা মিছিল বের করলে পথচারী ও এলাকাবাসীর মধ্যে আতংক ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় জামায়াত শিবির কর্মীরা বিপুল সংখ্যক যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর করে। রাজশাহী অফিস জানায়, রাত ৮ টার দিকে রাজশাহীর অকট্রয় মোড়ে শিবির কর্মীরা একটি অটোরিকশা জ্বালিয়ে দেয়। একই সময় শালবাগান এলাকায় শিবির একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। এসময় পুলিশের সঙ্গে শিবিরের কয়েক দফা ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, নোয়াখালীর ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মাহবুবুর রশিদের গাড়িতে জামায়াত - শিবির কর্মীরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। একই সময় শিবির কর্মীরা আরো ৫-৬টি গাড়ী ভাঙচুর করে এবং দোকানপাটে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। রবিবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে জেলা শহর মাইজদীর দত্তেরহাটে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ৭জনকে আটক করে। ঘটনার সময় পুলিশ সুপার গাড়িতে ছিলেন না। তিনি তার অফিসে ছিলেন বলে জানিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একই সময় হামলাকারীরা পিকআপ, সিএনজি, অটোরিক্সা ও বাসসহ ৫-৬টি গাড়ি ভাঙচুর করে। খুলনা অফিস জানায়, নগরীর খানজাহান আলী সড়কে ছাত্রশিবিরের মিছিলে পুলিশ বাধা দিলে ৫/৬টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে। ফেনী প্রতিনিধি জানায়, ফেনীর পাঁচগাছিয়া সড়কে জামায়াত-শিবির অতর্কিত হামলা চালিয়ে একটি যাত্রীবাহী টাউন সার্ভিস বাস, ২টি সিএনজি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং মহিপালে ২টি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ করে। জলঢাকা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, জলঢাকায় ঝটিকা মিছিল থেকে ৩টি বাস ও দু’টি ট্রাক ভাংচুর করেছে শিবিরের নেতা-কর্মীরা। জয়পুরহাট প্রতিনিধি জানান, বিকালে জয়পুরহাট-বগুড়া মহাসড়কের বাসষ্ট্যান্ড হতে হিচমি মোড় পর্যন্ত ২কিলোমিটার এবং হিচমি থেকে-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের ৪কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করে।