এই বিশ্বে যারা বিচারকের আসনে থাকেন তারা স্রষ্টার আজ্ঞা পালনেই কর্মরত

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নবনিযুক্ত বিচারক বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, এই মানুষের বিশ্বে যারা বিচারকের আসনে থাকেন তারা স্রষ্টার আজ্ঞা পালনেই কর্মরত। এখানে ভুল-ভ্রান্তির কোন অবকাশ নেই। বিশেষ করে হাইকোর্টে থাকাকালীন জানতাম আমার উপর আরো একটি আদালত রয়েছে যে আদালত আমার ভুল সংশোধন করবে। তিনি বলেন, আজ থেকে সেই অবকাশ আর রইল না বিধায়, যে দায়িত্ব আজ অর্পিত হলো তা সত্যিই সুকঠিন। এই দায়িত্ব যেন নির্ভয়ে ও নির্ভুল সচেতনতার সাথে পালন করতে পারি তার জন্য নিশ্চিতভাবে আপনাদের সহায়তা কামনা করবো। আইনজীবী ও এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলমের সংবর্ধনার জবাবে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী এ কথা বলেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতির এজলাশ কক্ষে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে নবনিযুক্ত অপর তিন বিচারপতিকেও সংবর্ধনা দেন এটর্নি জেনারেল ও আইনজীবীরা। অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এসকে সিনহা, বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াহহাব মিয়া, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি মো. ইমান আলী, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সংবর্ধনার জবাবে বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক বলেন, আইনজীবীরা আমার বিগত জীবনের সবদিক তুলে ধরে ভবিষ্যত্ বিচারিক কাজের গুণগত প্রত্যাশিত প্রাপ্যতাটুকুও জানাতে দ্বিধা করেননি। জানি না প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে সার্থকভাবে কতটুকু সমন্বয় ঘটাতে পারবো। তবে দেশ, জাতি ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সংবিধান ও আইন অনুসারে নিজ দক্ষতা, প্রজ্ঞা, মেধা ও শ্রম প্রদানে আমি অতীতের ন্যায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। আপনাদের কাছে এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি। আপনাদের সহযোগিতা পেলে সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে বিচার প্রার্থীদের প্রত্যাশা নিশ্চিত করতে পারব। তিনি বলেন, মানুষ হিসেবে আমি ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে নই। এক্ষেত্রে আপনারা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে সঠিক পথে বিচার নিশ্চিত করার জন্য সহায়তা করবেন বলে আশা করি। আপনাদের সহযোগিতা ছাড়া সুবিচার নিশ্চিত করা এক দুরূহ ব্যাপার। বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়া তার বক্তব্যে বিচার কাজ চালিয়ে নিতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ, হাজার হাজার মা-বোনের সম্ভ্রম এবং কোটি কোটি মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। স্বাধীনতার জন্য অন্য কোন জাতি এত ত্যাগ স্বীকার করেছে কিনা তা আমার জানা নেই। জাতির জনকের সফল নেতৃত্বের ফসল স্বাধীন এ দেশটির কারণে আমার/আপনাদের বর্তমান এই অবস্থান। আমার বিবেকে সব সময় একটি প্রশ্নই জাগে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া আমাদের এই স্বাধীন রাষ্ট্র, যার সুফল আমরা ভোগ করছি, তার বিনিময়ে রাষ্ট্রকে আমরা কি দিচ্ছি? তিনি বলেন, সুযোগ সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও আমরা যদি রাষ্ট্রের অন্যতম এই অঙ্গ বিচার বিভাগকে শক্তিশালী না করতে পারি এবং ‘আইন সবার জন্য সমভাবে প্রযোজ্য’ এটা প্রতিষ্ঠা না করতে পারি তবে রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো এক সময় ব্যর্থতার দিকে এগিয়ে যাবে। আসুন আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে যার যার অবস্থানে থেকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এমন এক বিচার ব্যবস্থা গড়ার চেষ্টা করি যেখানে এ বাংলার ১৬ কোটি মানুষের ন্যায় বিচার পাওয়ার শাসনতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হবে। আমাদের সবার লক্ষ্য যদি হয় ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা, তবে একসাথে কাজ করলে অবশ্যই সেই লক্ষ্যে আমরা পৌঁছাতে পারব। বিচারপতি হাসান ফয়েজ বলেন, আমরা যেন একসাথে বিচার বিভাগকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারি যাতে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা যায়। জাতি চায় সাহসী ও স্বাধীন উচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টকে অর্জন করতে হবে জনগণের পরিপূর্ণ আস্থা। আমি আমার পক্ষ থেকে আপনাদেরকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, বিচার আইন অনুসারেই হবে ইনশাল্লাহ। তাই আমি আমার শপথের প্রতি অবিচল থাকব। তিনি আরো বলেন, ২০০৩ সালে গ্লানিকর জীবনে আমাকে নিপতিত করার পর থেকে অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আমার পাশে এসে যারা দাঁড়িয়েছিলেন আমার জীবনের এই শুভক্ষণে সেই বিজ্ঞ আইনজীবীদেরকে জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা। বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমি বেশ ভাগ্যবান এই কারণে যে, আমার মায়ের পরিবারে বহুসংখ্যক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা থাকায় পূর্ব থেকেই বিচারসুলভ ভাবনা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে। খালু বিচারপতি মরহুম আমিনুর রহমান খান এবং সম্পর্কীয় ভগ্নিপতি বিচারপতি মরহুম আব্দুল হাকিম, মামা ৫০ দশকের আইন সচিব মরহুম ওয়াছিউদ্দিন আহমেদ, মরহুম কবির উদ্দিন আহমেদ, যিনি স্পেশাল পাওয়ার আপিল ট্রাইব্যুনালের প্রধান ছিলেন, তাদের থেকে বিচারপতির অভিজ্ঞতা অনেকটা পারিবারিক সূত্রেই অবলোকন করার সুযোগ পেয়েছি। আমার প্রয়াত স্ত্রীর পিতা মরহুম সিরাজুল মাওলা ছিলেন একজন জেলা জজ। বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিচার বিভাগের ক্ষমতা ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ বিবেচনা দেয়ার পক্ষে বিশ্বকবি জীবনের সবদিকসহ বিচারকের কি ভূমিকা হওয়া উচিত তা তার ন্যায় দন্ড কবিতায় উল্লেখ করেছেন এই বলে, যা আমি মনে করি প্রতি বিচারকের জন্য প্রযোজ্য। তিনি বলেন, আমার মরহুম পিতা একজন সফল শিল্পপতি, সামন্ত পরিবারের সন্তান হয়েও মনের দিক থেকে ছিলেন অতি প্রগতিশীল। তিনি ছিলেন মাইকেল ভক্ত। প্রায়ই মেঘনাদবধ পাঠ করে শোনাতেন। শৈশবেই তার মুখে শুনেছি “আমি কি ডরাই সখি ভিখারী রাঘবে।” পরবর্তীতে নজরুলের কবিতায় পড়েছি “চির উন্নত মম শির, শির নেহারি ঐ শিখর হিমাদ্রির।” নানান মুখে শুনেছি রবীন্দ্রনাথের অমর বাণী “উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই , ওরে ভয় নাই, নি:শেষে প্রাণ যে করিবে দান ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।” বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী বলেন, একজন বিচারক তবেই স ষ্টার আজ্ঞাবহ হবেন যখন তিনি এই অমোঘ বাণীসূমহ অনুসরণ করবেন। আমি আইনের শাসন ও মানবাধিকারের একজন আজন্ম অনুসারী। যুক্তরাজ্য পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত ইমিগ্রেশন এ্যাডভাইজার সার্ভিসে নিয়োজিত থাকাকালে স্যার ইয়ান মেকডোনাল্ড কিউসি, অধ্যাপক ডেভিড জ্যাকসনের কাছে শিখেছি জুডিশিয়াল রিভিউ ও রিটের মাধ্যমে কিভাবে মানুষের অধিকার রক্ষা করতে হয়। তিনি বলেন, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদকে সংকুচিত নয় বরং প্রসারিত করাই বিচারকের দায়িত্ব। আইনের জগতের সব মহান সৃষ্টিই হয়েছে জুডিশিয়াল একটিভিজমের মাধ্যমে। আমাদের দেশেও বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক এবং পরবর্তীকালে আপিল বিভাগের বিচারপতিদের একটিভিজমের কারণে অতীতে তাবু ভঙ্গ করে ৫ম ও ৭ম সংশোধনী মামলার রায় হয়েছে। আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই একটিভিজমের অগ্রযাত্রা চলবে। চার বিচারপতিকে পৃথক পৃথক বক্তব্যে অভিনন্দন জানান এটর্নি জেনারেল এডভোকেট মাহবুবে আলম ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি একেএম সাইফুদ্দিন আহমেদ। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর উদ্দেশে এটর্নি জেনারেল বলেন, সিগমন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী প্রতিটি শিশুই জন্ম নেয় একটি পরিষ্কার স্লেড নিয়ে যার উপর দাগ পড়তে থাকে পরিবেশের প্রভাবে। যে অর্থে আপনি অতি ভাগ্যবান বিক্রমপুর পরগণায় জন্মগ্রহণ করেছেন, যেখানে জন্ম নিয়েছেন মহাত্মা অতীশ দীপংকর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সরোজিনি নাইডু, ডা. মেঘনাথ সাহা এবং স্যার আচর্য জগদীশ চন্দ্র বসুর মতো প্রগতি, অসাম্প্রদায়িকতা এবং দেশপ্রেমের মহিমান্বিত ধারকগণ। তিনি বলেন, আপনি জনস্বার্থ বিষয়ক মামলার রায় দিয়ে অসহায় বিচারপ্রার্থীদের সাহায্যে জনস্বার্থমূলক এক নূতন দিগন্ত উম্মোচন করেছেন। মানুষের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে আইনি জটিলতার বিষয়গুলোকে কখনো প্রাধান্য দেননি। আদালতের মর্যাদা ও সম্মান রক্ষায় আপনার ভূমিকা অপরিসীম। এছাড়া জুডিশিয়াল একটিভিজমের ক্ষেত্রে আপনার অবদান স্মরণ করিয়ে দেয় রিচারপতি লর্ড ডেনিং ও কৃষ্ণ আয়ারকে। এটর্নি জেনারেল বলেন, সংবিধানের ৭ম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা, বিজিএমইএ ভবনকে অবৈধ ঘোষণাসহ অনেক যুগান্তকারী রায় আপনি দিয়েছেন। আইনজীবীরা আশা করে আপনি আপিল বিভাগের একজন বিচারক হিসেবে আপনার মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা একইভাবে প্রয়োগ করে বিচারপ্রার্থীদের ন্যায় বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখবেন। বিচারপতি আনোয়র উল হকের উদ্দেশে এটর্নি জেনারেল বলেন, আপিন একজন সঙ্গীতপ্রিয় ব্যক্তি ও রবীন্দ্র অনুরাগী। বিভিন্ন সময়ে আপনার সাথে আলাপচারিতায় দেখেছি যে, রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা আপনার মুখস্ত। একজন রবীন্দ্র অনুরাগী ব্যক্তি আজ সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতি পদে আসীন। বিচারপতি ছিদ্দিকুর রহমান মিয়ার উদ্দেশে এটর্নি জেনারেল বলেন, বিচার কার্যে দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে আপনি আইনের বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় ৯২টি পুস্তক ও ধর্মীয় বিষয়ে ১৩টি বই রচনা করেছেন। আপনার লিখিত আইনের পুস্তকসূমহ ছাত্রদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। আপিল বিভগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আপনি মেধা ও প্রজ্ঞা দ্বারা বিচার বিভাগে অবদান রাখবেন। বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর উদ্দেশে এটর্নি জেনারেল বলেন, সুচিত্রা সেনের বাড়ি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ সংক্রান্ত, মিরপুর ক্যান্টনমেন্টের জমি অধিগ্রহণ, সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন সংক্রান্ত অনেক উল্লেখযোগ্য মামলার রায় প্রদান করেছেন আপনি। আপনার মেধা, প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার আলোকে এ মহান বিচারালয়ে যে বিচারকার্য সম্পন্ন করবেন তাতে আমাদের বিচারব্যবস্থা সমৃদ্ধ হবে বলে আশা করি।