চার হাজার কোটি টাকার অর্ডার হারিয়েছে পোশাক খাত

চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার (৫০ কোটি ডলার) রপ্তানি আদেশ হারিয়েছে তৈরি পোশাক খাত। এসব অর্ডারের বেশিরভাগই প্রতিবেশী ভারতসহ ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ায় চলে গেছে। এই অবস্থায় আর হরতাল না দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিজিএমইএ’র পক্ষ থেকে বলা হয়, পোশাক শিল্পের বড় ক্রেতারা প্রতিবছর অর্ডার নেগোসিয়েশন ও অর্ডার দেয়ার জন্য তাদের প্রতিনিধি এদেশে পাঠালেও এবারের গ্রীষ্ম মৌসুমকে সামনে রেখে অর্ডার দেয়ার জন্য এ মুহূর্তে তারা প্রতিনিধি পাঠাতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। বরং ‘নিরাপত্তাজনিত’ কারণ দেখিয়ে অর্ডার নেয়ার জন্য বাংলাদেশী পোশাক সরবরাহকারীদেরকে তাদের হেডকোয়ার্টারে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। গত সপ্তাহে বুধ ও বৃহস্পতিবার দু’দিনের টানা হরতাল চলাকালে রাশিয়া থেকে পোশাক শিল্পের কয়েকজন ক্রেতা ঢাকা এসেও শুধুমাত্র হরতালের কারণে বিমান বন্দর থেকেই স্বদেশে ফিরে যান। পোশাক শিল্পে অর্ডার ক্রমেই কমছে। অন্যদিকে ঘন ঘন হরতালের কারণে সম্প্রতি এ শিল্পের অনেক উদ্যোক্তাই সমুদ্রপথে পণ্যের জাহাজীকরণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ লিড টাইম (পণ্য প্রেরণের চুক্তিবদ্ধ সময়) মোকাবেলার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে আকাশপথে পণ্য রপ্তানি করছেন। আবার কিছু উদ্যোক্তা ইতিমধ্যেই স্টকলট (অর্ডার বাতিলকৃত তৈরি পণ্য) পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন। আবার অনেক উদ্যোক্তাই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাহাজীকরণ করতে না পারার কারণে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী ডিসকাউন্ট, অর্ডার বাতিল বা বকেয়া (ডেফারড পেমেন্ট) পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। এতে করে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন উদ্যোক্তারা। বিজিএমইএ’র মতে, গার্মেন্টস পণ্যের প্রধান গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে দ্বিতীয় দফায় মন্দা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। সেইসাথে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বল অবকাঠামো খাত এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটে স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পে উত্পাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি পণ্যের মূল্য হ্রাস, দেশে ডলারের বিনিময় মূল্য হ্রাসের ফলে উদ্যোক্তাদের সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হচ্ছে। এই অবস্থায় ঘন ঘন হরতাল কর্মসূচি পোশাক শিল্পকে পিছিয়ে দিচ্ছে। এ শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে আছে ৪০ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকা। এ শিল্পকে কেন্দ করে গড়ে উঠেছে ব্যাংক-বীমা, শিপিং, সেবাখাত, পর্যটন, হোটেল, পরিবহনসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্প। পরোক্ষভাবে দেশের প্রায় ৪ কোটি লোক এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। গবেষণা প্রতিষ্ঠা নিলসেন লিমিটেডের সমীক্ষার বরাত দিয়ে বলা হয়, গত ২০১০-১১ অর্থবছরে ব্যাংক ও বীমা খাতে পোশাক শিল্পের অবদান ছিলো যথাক্রমে প্রায় ১ হাজার ৯০ কোটি টাকা ও প্রায় ১৭০ কোটি টাকা। একই সময়ে শিপিং খাতে অবদান ছিলো প্রায় ১ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। পরিবহন খাতে ৮৩০ কোটি টাকা। সরকার স্ট্যাম্প, লাইসেন্স নবায়ন ফি প্রভৃতি বাবদ আয় করেছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। একই সময়ে এই শিল্প প্রত্যক্ষ কর হিসাবে সরকারকে ৫৫২ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। উল্লিখিত সময়ে সেবাখাতে পোশাক শিল্পের অবদান ছিলো প্রায় ১১০ কোটি টাকা, প্রকৌশল খাতে ৪৩১ কোটি টাকা, বিদ্যুত্ খাতে বিল বাবদ প্রায় ৪৪১ কোটি টাকা, গ্যাস ও ওয়াসা খাতে বিল বাবদ প্রায় ১১১ কোটি টাকা, তথ্য প্রযুক্তি খাতে প্রায় ২৯৬ কোটি টাকা, আবাসন খাতে প্রায় ৭৮৫ কোটি টাকা এবং হোটেল ও পর্যটন খাতে প্রায় ১৩৯ কোটি টাকা। সুতরাং জাতীয় অর্থনীতির প্রাণ তৈরি পোশাক শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে সমগ্র অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে- এমন আশংকা করছে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।