রাজশাহীতে এবার এসআইয়ের মাথা থেঁতলে দিয়েছে শিবির

রাজশাহীতে আবারো ছাত্রশিবির কর্মীদের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ। গত রবিবার সকালে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুলিশের শিক্ষানবিশ উপ-পরিদর্শক (পিএসআই) মকবুল হোসেনের দুই হাতের কব্জি বিছিন্ন করার পর গতকাল সোমবার সকালে শিবির কর্মীরা নগরীর শালবাগান এলাকায় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর আলমের (৫৮) মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশ ইট দিয়ে থেঁতলে দিয়েছে। এ সময় তারা ওই পুলিশ কর্মকর্তার মাথার হেলমেট, মাথার টুপি এবং পিস্তল কেড়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পুলিশের কনস্টেবল সফিকুল ইসলাম, লতিফুর ও জাকির হোসেন আহত হন। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম ও সফিকুল ইসলামকে প্রথমে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে গতকাল সন্ধ্যায় জাহাঙ্গীরকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে পুলিশ সদর দফতর সূত্রে জানানো হয়। চিকিত্সকরা জানান, জাহাঙ্গীর আলমের অবস্থা আশঙ্কাজনক। এছাড়া কনস্টেবল লতিফুর ও জাকির রাজশাহী পুলিশ লাইন্স হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। প্রসঙ্গত গত রবিবার সকালে শিবিরের ককটেল বিস্ফোরণে পুলিশের পিএসআই মকবুল হোসেনের হাতের কব্জি উড়ে যাবার ঘটনায় ওইদিন রাতে নগরীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় ৩৩ জনের নামোল্লেখ করে শিবিরের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছে তার বাদী হয়েছিলেন এসআই জাহাঙ্গীর আলম। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল বেলা সাড়ে ১০টার দিকে সংগঠনের নেতাকর্মীরা নগরীর শালবাগান এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করে এবং উপর্যুপরি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এসময় রাস্তার পাশে কর্তব্যরত এসআই জাহাঙ্গীর আলম, কনস্টেবল সফিকুল ও লতিফুরের ওপর মিছিল থেকে শিবির নেতাকর্মীরা ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে বাঁচার জন্য পুলিশের তিন সদস্য দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পেছন থেকে শিবির কর্মীরা এসআই জাহাঙ্গীরকে ধরে টেনে-হিঁচড়ে রাস্তার উপর নিয়ে যায়। তারা ওই পুলিশ কর্মকর্তার মাথার হেলমেট ও টুপি কেড়ে নিয়ে ইট দিয়ে তার মাথা, নাক-মুখ, পিঠ, পাসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ উপর্যুপরি আঘাত করে থেঁতলে দেয়। এ সময় দুই কনস্টেবল এগিয়ে গেলে শিবির কর্মীরা তাদের উপরও আক্রমণ করে। তারা এসআই জাহাঙ্গীরের সরকারি পিস্তলটি ছিনিয়ে নেয়। হামলার সময় হলুদ ডোরাকাটা গেঞ্জি পরিহিত এক শিবির কর্মীকে এসআই জাহাঙ্গীরকে আঘাতকারী অপরাপর শিবির কর্মীদের সরিয়ে দিতে দেখা যায়। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে শিবির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। এ সময় শিবির নেতাকর্মীদের ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপের জবাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে শিবির কর্মীরা পিছু হটে বিভিন্ন গলিপথে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই দক্ষিণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনের রাস্তা থেকে সশস্ত্র শিবির কর্মীরা আবারো পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ শুরু করে। এ সময় শিবির কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী ব্যবসায়ী জানান। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে টিয়ারসেল, রাবার বুলেট এবং সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পুলিশের প্রবল প্রতিরোধের মুখে শিবির কর্মীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এসময় পুলিশ অস্ত্রসহ একজন শিবির কর্মীকে আটক করে। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, এসআই জাহাঙ্গীরকে স্থানীয় লোকজন ও সাংবাদিকরা রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিত্সা কর্মকর্তা রুখসানা পারভীন বলেন, তার সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে তার মাথা ও চোখের ওপরের দিকের আঘাত গুরুতর। গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় এসআই জাহাঙ্গীরকে উন্নত চিকিত্সার জন্য বিমান বাহিনীর হেলিকপ্টারে করে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তার বড় ছেলে ফয়সাল সিদ্দিক রনি জানান, চিকিত্সকরা তার বাবার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে তাদের কিছু বলছেন না। তবে তিনি যেটুকু দেখছেন, তা হলো তার বাবার রক্তক্ষরণ বন্ধ হচ্ছে না। রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার তাদের জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্তে তার বাবাকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, এ বছরই এসআই জাহাঙ্গীর আলমের অবসরে যাবার কথা ছিল। সরকার সরকারি চাকরির বয়স দুই বছর বাড়িয়ে দেয়ায় তার চাকরি আরো দুই বছর বেড়ে যায়। তিনি রাজশাহী আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন থেকে ডেপুটেশনে মহানগর পুলিশের বোয়ালিয়া মডেল থানার অধীনে উপ-শহর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জের দায়িত্বে ছিলেন। জামায়াত-শিবিরের নাশকতার আশঙ্কায় তাকে গতকাল সকালে নগরীর শালবাগান মোড়ে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়। ছেলে ফয়সাল সিদ্দিকী রনি জানান, তার দুই ভাই। ছোট ভাইটি প্রতিবন্ধী। তার দাদার নাম আলতাফ হোসেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সূর্যনারায়ণপুরে তাদের গ্রামের বাড়ি। তবে তারা রাজশাহী শহরের উপরভদ্রায় নিজস্ব বাড়িতে বসবাস করেন। বোয়ালিয়া মডেল থানার ওসি জিয়াউর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় ইত্তেফাককে জানান, ঘটনাস্থল থেকে চাপাতিসহ সোহান নামের একজনসহ মোট ছয়জনকে আটক করা হয়েছে। থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। রাতেই মামলা রেকর্ড হওয়ার কথা। এসআই জাহাঙ্গীরের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। ওসি জানান, অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযানের প্রস্তুতি চলছে। এ ব্যাপারে রাজশাহী মহানগর পুলিশের কমিশনার এসএম মনির-উজ-জামান জানান, সোমবার ঘটনাস্থল থেকে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। জামায়াত-শিবিরের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করা হবে। রাবিতে শিবিরের ককটেল বিস্ফোরণ আমাদের রাবি সংবাদদাতা জানান, সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতিকে আটকের প্রতিবাদে রবিবার রাত পৌনে ৮টায় ক্যাম্পাসের পরিবহন মার্কেট, শহীদুল্লাহ কলাভবন ও চারুকলায় ঝটিকা মিছিল থেকে শতাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছার আগেই তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক দিয়ে বেরিয়ে যায়। একই সময় কাজলা কেডি ক্লাব এলাকায় জামায়াত-শিবির বিক্ষোভ মিছিল করে। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন হত্যাকাণ্ডের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির কর্মীদের প্রকাশ্যে মহড়া এটাই প্রথম বলে জানা যায়। প্রক্টর তারিকুল হাসান বলেন, বর্তমানে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি শান্ত। ঘটনার পর মহানগর পুলিশ কমিশনার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এদিকে গতকাল দুপুরে শিবির কর্মী সন্দেহে দুই শিক্ষার্থীকে বেধড়ক পিটিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আটককৃতরা হলেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী বোরহান উদ্দিন এবং আলী হোসেন। এদের মধ্যে বোরহানের অবস্থা গুরুতর। তাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অটোরিকশায় আগুন-ভাংচুর রবিবার রাত ৮টায় নগরীর অক্ট্রয়মোড়ে শিবিরের মিছিল থেকে দু’টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ভাংচুর ও আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এসময় পুলিশ কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে শিবির কর্মীদের তাড়িয়ে দেয়। এরআগে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় শিবির কর্মীরা শাহ্ মখদুম বিমান বন্দরের সামনে সড়ক অবরোধ ও ট্রাক ভাংচুর করে। এসময় তারা প্রায় আধা ঘণ্টা বিমান বন্দর সড়ক অবরোধ করে রাখে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এর আগে বিকাল ৫টায় নগরীর বিনোদপুর ও কাজলায় শিবির নেতাকর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। রাত পৌনে ১১টায় খড়খড়ি বাইপাস সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ করে। এসময় একটি ট্রাক আটকে পড়লে শিবির কর্মীরা তাতে আগুন ধরিয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যাবার আগেই শিবির কর্মীরা পালিয়ে যায়। পরে দমকল বাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভায়। এ ঘটনার পর রাত ১১টায় শহরে দুই প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। বিজিবি-৩৭ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল শাম্মী ফিরোজ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।