‘আমাদের পিছে ঠেলে দিও না’
প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৬
‘আমরা জয়ী হবোই! আমরা তোমাদের মতই, আমাদের পিছনে ঠেলে দিও না।’ গতকাল সোমবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অটিজম চিকিত্সা সেবা ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসা কয়েকজন অটিস্টিক শিশুকে গানে গানে এভাবেই নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতে দেখা গেল। তারা বেশ কয়েক মাস ধরে এ কেন্দ্রে চিকিত্সা সেবা পেয়ে বর্তমানে অনেকটাই সুস্থ। সঠিক ও সমন্বিত চিকিত্সা পেলে এসব শিশুর অনেকেই সমাজের মূলধারায় ফিরে আসতে পারে বলে বিশ্বাস চিকিত্সকদের।
তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে নানা কারণে দেশে অটিস্টিক শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু এই সংখ্যা প্রকৃতপক্ষে কত তা কেউই বলতে পারেন না। সরকারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, দেশে ১০ শতাংশ মানুষ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী, আর এর মাত্র এক শতাংশ অটিজমে আক্রান্ত। তবে এর সঠিক কোন পরিসংখ্যান নেই। তবে আশার কথা এসব শিশুর সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য ইতিমধ্যে জরিপ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। দেশের সাত বিভাগের আট উপজেলায় প্রাথমিক ভাবে এ জরিপ চালানো হচ্ছে। শিগগিরই এই কার্যক্রম দেশব্যাপী শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের দুই শীর্ষ কর্মকর্তা ।
এমন পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার ‘বিশ্ব অটিজম দিবস’ পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হবে। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আজ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন। এছাড়া দিবসটি উপলক্ষে গতকাল পৃথক বাণী দিয়েছেন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ অ্যাডভোকেট, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ।
এদিকে বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, দেশে অটিস্টিক শিশুদের সংখ্যা বেড়েই চলছে। তবে এ রোগ প্রতিরোধে দেশে সমন্বিত চিকিত্সার সুযোগ খুবই সীমিত। তারা বলেছেন, অটিজম কোন নিরাময়যোগ্য রোগ নয়। এ জন্য দরকার একটি সমষ্টিগত চিকিত্সা ব্যবস্থা। যা শিশুদের যথাসম্ভব বিকাশে সাহায্য করবে। যে সব শিশুর সমস্যা কম, তারা যথাসময়ে চিকিত্সাসেবা পেলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারে। যে সব শিশু গুরুতর সমস্যায় ভুগছে, তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে অনেক সময় লাগে কিংবা অনেকের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা থাকে অনেক কম। চিকিত্সকরা জানান, প্রত্যেক অটিস্টিক শিশুই মননগত দিক দিয়ে সম্ভাবনাময়। এ ক্ষেত্রে বাবা মায়ের মানসিক শক্তির অধিকারী হতে হবে। কোনভাবে হতাশ হওয়া যাবে না। ধৈর্য ধরলে এ ক্ষেত্রে সফলতা নিশ্চিত বলে জানিয়েছেন দেশের প্রখ্যাত নিউরোলজিস্টরা ।
প্রসঙ্গত, বিশ্বখ্যাত ফুটবল তারকা লিওনেল মেসিও অটিস্টিক শিশু ছিলেন। বার্সেলোনা ক্লাবের সহযোগিতায় তাকে চিকিত্সা সেবা দেয়া হয়। তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে ধীরে ধীরে বিখ্যাত ফুটবলার হয়ে ওঠেন। এমন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব আছেন যারা শিশু বয়সে অটিজমে ভুগতেন। উপযুক্ত চিকিত্সা ও সহযোগিতা পেয়ে তারা সমাজের মূলধারায় ফিরে এসেছেন।
অটিজম রোগের লক্ষণ
অটিজম জন্মগত রোগ। শিশু যখন মায়ের গর্ভে থাকে তখন তার মস্তিষ্কের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হলে শিশুর মধ্যে অটিজম দেখা দেয়। সাধারণত জন্মের তিন বছরের মধ্যে অটিজম ধরা পড়ে। এ শিশুরা অন্যদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান, সামাজিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে না। সাধারণত মেয়েদের তুলনায় ছেলেরা অটিজমে বেশি আক্রান্ত হয়। অটিস্টিক শিশুদের জন্মের পর প্রথম কয়েক বছর পর্যন্ত মস্তিষ্কের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে। অটিজম নির্ণয় করার জন্য কোন মেডিক্যাল টেস্ট নেই। শিশুর যোগাযোগ ক্ষমতা, আচরণের বিকাশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এবং ‘আইকিউ টেস্ট’ এর মাধ্যমে অটিজম নির্ণয় করা হয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানান।
নিউরোলজিস্টরা বলেছেন, বিষাক্ত রঙ ও বিভিন্ন কেমিক্যালে তৈরি খাদ্যসামগ্রীর কারণে গর্ভবতী মা ও শিশু নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ কারণে দেশে অটিজম ও বিকলাঙ্গ শিশুর সংখ্যাও আশংকাজনক হারে বাড়ছে।
মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি হস্তক্ষেপে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অটিজম শিশুদের চিকিত্সাসেবা ও পুনর্বাসনে একটি পূর্ণাঙ্গ সেন্টার চালু করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে অটিজম বিষয়ক জাতীয় কমিটির চেয়ারপারসন ও আন্তর্জাতিক শিশু মনোবিজ্ঞানী সায়মা হোসেন পুতুলের একান্ত প্রচেষ্টার কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন। তিনি জানান, এই কেন্দ্রে প্রতিদিন দুই শতাধিক অটিজম শিশুকে চিকিত্সাসেবা ও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। এ ধরনের শিশুর পুনর্বাসনে সচেতনতা থাকা অত্যাবশ্যকীয়। অটিজম শিশুকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অভিভাবকদের সচেতনতাই প্রধান। সচেতনতার অভাবে অটিজম শিশুদের হাবাগোবা ও পাগল বলে অবহেলা করে পরিবারচ্যুত করা হয় বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০০৬ সালে ‘প্রয়াস’ নামে অটিস্টিক শিশুদের জন্য চিকিত্সাসেবা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র চালু করে। এছাড়া ‘অটিজম ফাউন্ডেশন’ ২০০৮ সাল থেকে দেশে কার্যক্রম শুরু করেছে। ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শিশুদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি অভিভাবকদের অটিজম সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হয় বলে জানিয়েছেন এর সভাপতি গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) সলিম উল্যা ।