মানিকগঞ্জের মিত্রবাড়ি
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:১৯
নদী মেখলা সবুজ-শ্যামলিমায় ভরপুর মানিকগঞ্জ। এই রূপময় মানিকগঞ্জের বুক চিরে বয়ে গেছে কালিগঙ্গা নদী। নদীর দু’পাড় শাদা শাদা কাশবনে ঘেরা। নদীর বাঁকে বাঁকে ছুটে চলে পালতোলা নাও। ঝিরিঝিরি দখিনা বাতাসে ভেসে আসে মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান—‘মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে... ।’ মানিকগঞ্জ শহরের দক্ষিণ প্রান্তে তরুবীথি শোভায় শোভিত তেজেন্দ্র মিত্রের বাড়ি। ঘাসফুল আর রঙ-বেরঙের চিরল চিরল পাতাবাহারের বর্ণচ্ছটায় সজ্জিত মিত্রবাড়ির আঙিনা। গাছের শাখায় শাখায় ফুলের সমাহার। ‘কুটুম আয়, ‘কুটুম আয়, “ফুট্টি দাও’ পাখির গান। নৈসর্গিক প্রকৃতি মানুষের হূদয়-মন আকুল করে তোলে।
মিত্রবাড়ির আঙিনায় দাঁড়ালে ছবির মতো চোখে ভাসে নদীর বাঁকে বাঁকে কাশবনের ফাঁকে ফাঁকে পালতোলা নাও। মাঝি ভাটিয়ালি গান গেয়ে ছলাত্ ছলাত্ বৈঠা বেয়ে ছুটে চলেছে ভাটির পানে। আবার কোন মহাজনী নায়ের মাঝি গুন টেনে চলেছে উজান পথে। কালিগঙার ফটিক জলে রক্তরাঙা রবি অস্তরাগের প্রচ্ছায়ায় গড়ে তোলে গোধূলি বেলাকার রক্তিম জলছবি।
ষড়ঋতুর বৈচিত্র্যময় বাংলাদেশ। এ যেন প্রকৃতির এক লীলানিকেতন। কালের পরিক্রমায় প্রকৃতির রূপ-রসে রঞ্জিত হয়ে ওঠে এই সবুজ-শ্যামলিমা বাংলাদেশ। কখনও শীত আবার কখনও বসন্তের আমেজে জেগে ওঠে প্রকৃতি। শীতের নরম শিশির কখনও দুর্বাঘাসে মুক্তো হয়ে ঝরে আবার কখনও রুদ্র গ্রীষ্মের দাবদাহে তেতে ওটে ধরণী। কালবৈশাখীর ঘূর্ণি ঝড়োহাওয়ায় দুলে ওঠে বিদ্রোহী বাংলা। প্রকৃতির সঙ্গে একাকার হয়ে সংগ্রামী চেতনায় স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ারে ঢেউয়ের দোলায় দুলে ওঠে বিদ্রোহী বাঙালি।
সে সংগ্রামী চেতনা নাড়া দিয়ে যায় মানিকগঞ্জবাসীর মনে-প্রাণে। মানিকগঞ্জ মডেল স্কুলের শিক্ষক তেজেন্দ্র মিত্র ও তাঁর বড় ভাই এডভোকেট নলিনী মিত্র এবং আরও অনেকেই ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের দীক্ষায় দীক্ষিত।
১৯৩৯ সালের এপ্রিলে এডভোকেট অরুণ কুমার রায়ের নেতৃত্বে মানিকগঞ্জ শহরে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ দলের এক জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই জনসভায় নেতাজী সুভাষ বসুর সঙ্গে কবি কাজী নজরুল ইসলাম এসেছিলেন মানিকগঞ্জে। জনসভা শেষে কবি নজরুল অবস্থান করেন তেজেন্দ্র মিত্র মাস্টার মহাশয়ের বাড়িতে।
মিত্রবাড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে কবির চিত্ত ব্যাকুল হয়ে ওঠে। সেই সাথে প্রথম দর্শনে মিত্রবাড়ির বধূর পরনে নতুন রাঙাশাড়ি, কপালে লাল টিপ, মাথায় সিথির সিঁদুর, হাতে শাদা শাঁখা, পায়ে নূপুরের রুমঝুম ছন্দ সুর কবির মনে জাগিয়েছিল দোলা। বিমুগ্ধ হন মিত্রবাড়ি অতিথি আপ্যায়নে। পান খাওয়া গান গাওয়া আর তার সঙ্গে ছোটে কবির বাঁধভাঙা হাসির ফোয়ারা। কবির উদ্দীপ্ত প্রাণের ছোঁয়ায় মানুষ ফিরে পায় উদ্দাম শক্তি।
পাখি ডাকা ভোরে কবি ঘুম থেকে জেগে ওঠে বড়শির ছিপ হাতে বসে পড়েন মিত্রবাড়ির পুকুর ঘাটে। পুকুর থেকে বড়শিতে মাছ ধরে উল্লাসে মেতে ওঠেন কবি। সাত সকালে কবির অট্টহাসিতে জেগে ওঠে পড়শীজনেরা। আর ভোর বিহানে ছেলেমেয়েরা ফুল কুড়াতে এসে উচ্ছল হাসি শোনে ঘিরে ধরল কবিকে। কবির কথার ফুলঝুরিতে অল্প সময়ের মধ্যে ছোটদের সঙ্গে গড়ে ওঠে সখ্যতা।
এক সময় কবি বড়শিতে মাছ ধরা ছিপ হাতে হই-চই করে চলে আসেন মিত্রবাড়ির অন্দর মহলে। কবির হাতে বড়শিতে মাছ দেখে মিত্রবাড়ির বউ-ঝিরা সবাই আনন্দে আটখানা।
দুপুর বেলা । কবিকে ঘিরে খাবারের নানারকম আয়োজন। সরু চালের ভাত, মৌরলা মাছের চচ্চড়ি, চিংড়ি মাছের দোপেঁয়াজা, রুই মাছের ঝোল ছাড়াও পঞ্চব্যঞ্জনে খাবার পরিবেশন করা হয় কবিকে। কিন্তু খাবেন না বলে বাদ সাধলেন কবি। হঠাত্ করে মিত্রবাড়িতে কবির আড়ি। যে কবির পাষাণভেদী অট্টহাসি, মনে যাঁর অফুরন্ত উদ্দীপনা, সেই উচ্ছল কবি একেবারে নিশ্চল নিশ্চুপ। যেন ভারাক্রান্ত মন, গুরুগম্ভীর বিষণ্ন মুখ। কবির এমন অভিমান দেখে মিত্রবাড়ির সবাই উদ্বিগ্ন। কবিকে আদর-আপ্যায়নে কোন ভুল-ত্রুটি হয়েছে কিনা—এসব কথা ভেবে সবাই অস্থির। সারা বাড়িতে কবিকে ঘিরে যত জল্পনা-কল্পনা, শুরু হলো গুঞ্জরণ!
কবি ছিলেন অনুভূতিশীল। তিনি তাঁর সুন্দর মন দিয়ে মিত্রবাড়ির ছোট-বড় সবার মনের অবস্থা অনুভব করলেন মরমে-দরদে। তিনি বুঝতে পারলেন যে, তাঁর অনাহত অভিমানে মিত্রবাড়ির সবাই উদ্বিগ্ন। তাই কবি সবার জল্পনা-কল্পনার জাল ছিন্ন করে সারা বাড়ি ভরিয়ে তুললেন শিশুসুলভ হাসিতে।
দুপুরের খাবারের পর কবি কিছুক্ষণ বিশ্রামে যান পাশের ঘরে। তারপর বিশ্রাম শেষে মিত্রবাড়ির দক্ষিণ প্রান্তে পুকুর পাড়ে জাম গাছের ছায়ায় বসে কবি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান ধরেন: ‘রুমুঝুমু রুমুঝুমু কে এল নূপুর পায়’ এবং ‘শুকনো পাতার নূপুর পায়ে’... গান দু’টি অপূর্ব ভঙ্গিমায় পরিবেশন করেন কবি। সবাই আনন্দে উত্ফুল্ল হয়ে ওঠেন। কবির দরাজ কণ্ঠে গান শোনে।
কবি নজরুল মানিকগঞ্জে এসেছিলেন, গান গেয়েছিলেন, অকাতরে হেসেছিলেন। আর কথার খই ফুটিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাসিয়েছিলেন। সেসব স্মৃতি আজও অম্লান। রূপ কথার এক উপাখ্যানের মতো মানিকগঞ্জবাসীর মনের আয়নায় আজও ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল-কবি কাজী নজরুল ইসলাম।