চলচ্চিত্রের ‘ইতরীকরণ’ ও ইত্যাদির ‘মামা-ভাগ্নে’ প্রসঙ্গ

চলচ্চিত্রের দুটি মাধ্যম। এটা সবাই এক বাক্যে বলেন আজকাল। একটি ‘ভালো ছবি’ আরেকটি ‘মন্দ ছবি’। সংক্ষেপে বিজ্ঞজনদের এমনই মন্তব্য করতে দেখা যায়। কিন্তু এখন বিভাজনেরও যেন অনেক আয়োজন বিয়োজন শুরু হয়েছে। এখনকার চলচ্চিত্রে তাই দুটি বিচিত্র ধারা। একটি ধারায় ছবিটি রিলিজের আগেই জনপ্রিয় (!) বা আলোচিত করা এবং ছবিটি দেশে রিলিজের আগেই বিভিন্ন পুরস্কার অর্জন করে নিজেকে জাহির করা। যদিও সংখ্যায় এদের পরিমাণ একেবারেই কম। কিন্তু বিতর্কিত ও নেতিবাচক বিষয় যে খুব দ্রুত দুর্গন্ধ ছড়ায়, তা তো সবাই জানে। এখানেও হয়েছে ঠিক একই রকম। দেশীয় কালচারকে বিতর্কিত করে ছবি রিলিজের আগেই বিভিন্ন অখ্যাত বা ঈষত্ খ্যাত প্লাটফর্ম থেকে পাওয়া পুরস্কারগুলো নিয়ে এরা জাহির করছে নিজেদের। অথচ ছবি রিলিজের পর দেখা যায় হাতে গোনা মাত্র ৩/৪টি সিনেমা হলে মুক্তি পাচ্ছে। সেগুলোও কোনোটি হাউজফুল হচ্ছে না। কিন্তু তাতে নির্মাতা বা প্রযোজকের কোনো ‘রা’ নেই। কারণ চলচ্চিত্র এখন আর দর্শকবান্ধব না হলেও চলে! চলচ্চিত্র যেন এখন হতে হবে মিডিয়া বান্ধব। প্রিন্ট মিডিয়া বা একটি চ্যানেল মিডিয়া পার্টনার অথবা চ্যানেল নিজেই অনেক সময় প্রযোজকের আসনে যখন থাকেন, তখন তো কথায় নেই! চলচ্চিত্র কে দেখল, কয়টা শো হাউজফুল হয়ে গেল। এগুলো গোল্লায় যাক। এতসব ভেবে কাজ কী? আলোচনায় থাকাটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। এখন সিনেমা বিষয়ক টকশোতে এমন অনেক চলচ্চিত্রকারদের দেখা যায়, যিনি হয়তো একটি চলচ্চিত্রের মহরত করেছেন মাত্র। বা তার আদৌ কোনো চলচ্চিত্রই রিলিজ হয়নি। কিন্তু বিজ্ঞের মতো করে বলতে থাকেন চলচ্চিত্রে কী হওয়া উচিত বা উচিত না। আমাদের চলচ্চিত্রে মোস্তফা সারওয়ার ফারুকীর হাত ধরেই এক ধরনের অবক্ষয়ের চূড়ান্ত শুরু হয়। শুরু হয় ভাষা বিকৃতির মতো বিতর্ক। যা নিয়ে দেশ বরেণ্য কথা সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামসহ একাধিক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব তাদের একাধিক লেখায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ নির্মাতার ‘ব্যাচেলর’ চলচ্চিত্রের ফোনে প্রেম ও পরকীয়ার বিষয় আসে, ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’-এ আসে লিভ টুগেদার। এইসব চলচ্চিত্র বা সুড়সুড়ি প্রসঙ্গে গুণী নির্মাতা শহীদুল ইসলাম খোকন তার এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘আমাদের সমাজকে নতুন দিকনির্দেশনা না দিয়ে বিভ্রান্তির দিকে ঠেলে দেওয়ার নাম নিশ্চয়ই চলচ্চিত্র না।’ বারবার বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের এই কালো অধ্যায়কে নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই আসে তাই এই নির্মাতার নাম। একটি টক শোতে দেশের বরেণ্য নির্মাতা তারেক মাসুদকে ওই নির্মাতার চলচ্চিত্র ও ভাষা বিকৃতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘এইসকল চর্চাকে আমি বলব চলচ্চিত্রের ইতরীকরণ। কারণ সমাজকে কোনো কিছু মেসেজ না দিয়ে বিভ্রান্ত করলেই তো তা চলচ্চিত্র হয় না।’ সেই অনুষ্ঠানের ভিডিও টেপটিও রয়েছে আমার কাছে। প্রয়াত এই গুণী নির্মাতা তারেক মাসুদ নিজের চলচ্চিত্রকে দর্শকবান্ধব করে তুলতে অমানুষিক পরিশ্রম করে প্রত্যন্ত এলাকায় নিজে গিয়ে প্রজেকশন করেছেন। ঘুরে বেড়িয়েছেন সারাদেশ। আর এখনকার প্রচারপ্রিয় নির্মাতারা সারাদেশ না তারা পছন্দ করেন চ্যানেলগুলোতেই নিজের ফুটেজ! মিডিয়ার জোরে বা এত এত স্যাটেলাইট চ্যানেলের কল্যাণ বা অকল্যাণেই বিভিন্ন হল রিপোর্ট আর টকশোর গলাবাজি নিজেদের নাম জাহির করার চেষ্টা চলছে। অথচ ছবিগুলোর একটিও ১০টি সিনেমা হলে একযোগে হাউজফুল হওয়ার কোনো রেকর্ড নেই! তাই আপাতদৃষ্টে আমাদের মিডিয়া এ ক্ষেত্রে অনেকাংশেই দায়ী। রাজধানীতেই যেহেতু সব কটি মিডিয়া সেন্টার তাই চ্যানেলেগুলোও উপাত্ত খোঁজে তার আশপাশ থেকেই। কিন্তু একটি সিনেপ্লেক্সই তো পুরো দেশ নয়। আর যেহেতু আমাদের চলচ্চিত্রে আজ অবধি স্বচ্ছ বক্স অফিসের কোনো প্রক্রিয়া চালু হয়নি, তাই যে যার ইচ্ছেমতো বাজানো ঢোলকেই নিজের সাফল্য মনে করছে। কিন্তু নিজেদের ঢোল অতিমাত্রায় না পিটিয়েও যে দর্শকদের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায় তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘মাটির ময়না’ বা সর্বশেষ ‘গেরিলা’র মতো অসাধারণ চলচ্চিত্র, যা সত্যিকার অর্থেই মানুষকে যেমন একদিকে মুগ্ধ করছে, তেমনি দর্শকদের ভাবনার জায়গাটা প্রসারিত করছে, চলচ্চিত্রের জন্য পুরস্কার বয়ে নিয়ে এসেছে। কিন্তু দেশের কলুষিত দিকগুলো তুলে, তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করে কিছু চলচ্চিত্র নামের দীর্ঘ নাটক দর্শকদের কাছে পৌঁছানোর আগেই হাস্যকরভাবে পুরস্কৃত হচ্ছে। আর কিছু মিডিয়া তার ফলাও প্রচার করে সেই নথির যৌক্তিকতাও পূর্ণ করছে। এভাবেই দুই ধারার চলচ্চিত্রে আজ তাই বহমান। একটি দর্শকবিমুখ পুরস্কার পাওয়ার ফন্দির চলচ্চিত্র। অন্যটি দর্শকদের জন্য চলচ্চিত্র হচ্ছে যা দর্শকদেরই জন্য নির্মিত। এবং যে চলচ্চিত্রের মুন্সিয়ানায় পুরস্কার প্রাপ্তিযোগ হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই ‘সঠিক’ ও ‘ভ্রষ্ট’ দুটি ধারাকে আমরা মিডিয়াই যেন গুলিয়ে ফেলছি। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে দেশ বরেণ্য মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত সম্প্রতি এই ছবি রিলিজের আগেই পুরস্কার নিয়ে একটি বিশেষ স্কিড প্রচার করেছেন। যা একেবারেই সময়োপযোগী। ‘ইত্যাদি’র নিয়মিত সেগমেন্ট ‘মামা-ভাগ্নে’তে তিনি দেখিয়েছেন ভাগ্নে কীভাবে চ্যানেল আর মিডিয়ার ওপরে ভর করে ছবি রিলিজের আগেই আলোচিত হতে চায়। অন্যদিকে মামা ধমকিয়ে বলেন ‘তুই প্রতারক! তোরাই এই সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছিস।’ সবচেয়ে বড় পরিতাপের বিষয় হলো, আমাদের ভেতর এখনকার এইসব অপকর্মকে ধরিয়ে দেওয়ার লোকজনও যেন কমে আসছে। মন্দকে মন্দ বলার সাহসকে ঘরের পাপোশের নিচে চেপে বাইরে বেরিয়ে সুশীল চলচ্চিত্র বোদ্ধার লেবাস পরে আমরা চলছি প্রতিদিন। সবকিছুই যেন গা সওয়া আমাদের। হানিফ সংকেত বা এমন দুয়েকজন মিডিয়াব্যক্তিত্ব প্রতিবাদের সুরে হয়তো বলছেন। কিন্তু সিনিয়র অনেক পরিচালকরায় বিষয়গুলো নিয়ে সোচ্চার হচ্ছেন না। আঙুল উঁচিয়ে বলছেন না ‘তুই প্রতারক... তোরাই আমাদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছিস।’ আর প্রমোশনাল বিনোদন সাংবাদিকতা আর নীরব দর্শকের মতো আমরা চলচ্চিত্র নিয়ে শুধু গা বাঁচানো রিপোর্ট কিংবা মিডিয়া পার্টনারের দায়িত্ব পালন করছি মাত্র। তাই এ লজ্জা আমাদের। এ ব্যর্থতাও আমাদের নিজেদেরই। (বি.দ্র. বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সংকট ও পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক এই প্রতিবেদন নিয়ে কোনো ধরনের আপত্তি বা বিশ্লেষণ থাকলে তা লিখিত আকারে আমাদের আপনার যৌক্তিক মতামতসহ পাঠাতে পারেন। আমরা প্রতিবেদকের বক্তব্য ও যুক্তিসহ তা ছাপব। এ ছাড়াও পাঠকদের কাছেও আপনাদের উন্মুক্ত মতামত প্রত্যাশা করছি।)