রেল লাইনে ভয়াবহ নাশকতা

গতকাল মঙ্গলবার হরতাল শুরুর আগে ভোর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে ভয়াবহ নাশকতা চালিয়ে রেল লাইন উপড়ে ফেলেছে দুর্বৃত্তরা। এতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখি আন্তঃনগর তুর্ণা-নিশিথা এক্সপ্রেস টেনের ইঞ্জিন ও যাত্রীবাহী শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ৭টি বগি লাইনচ্যুত হয়েছে। ট্রেনের চালকসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৪০ জন। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার শ্রীমন্তপুর (তারাকুয়া) নামক স্থানে ভয়াবহ নাশকতার ঘটনা ঘটে। এতে চট্টগ্রামের সাথে ঢাকা ও সিলেটের রেলযোগাযোগ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রেলের মহাপরিচালিক আবু তাহের জানান, গতকালের ঘটনায় রেলের ২ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ঘটনার পর উদ্ধার তত্পরতা শুরু হয়। এ ঘটনা তদন্তের জন্য ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সোমবার শেষ রাতে কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন থেকে আনুমানিক ৭ কিলোমিটার দক্ষিণে পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ের অদূরে শ্রীমন্তপুর (তারাকুয়া) নামক স্থানে দুর্বৃত্তরা ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল লাইনের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকার ফিসপ্লেট খুলে প্রায় একশ’ ফুট রেল লাইন উপড়ে ফেলে। কুমিল্লা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার হোসেন মজুমদার জানান, ঢাকা থেকে সোমবার রাত আনুমানিক পৌনে ১২টায় ছেড়ে আসা যাত্রীবাহী তুর্ণা-নিশিথা এক্সপ্রেস ট্রেনটি কুমিল্লা স্টেশনে যাত্রাবিরতি শেষে সোমবার রাত ৪টা ২৫ মিনিটে চট্টগ্রামের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ট্রেনটি ভোর ৪টা ৩৫ মিনিটে শ্রীমন্তপুরে (তারাকুয়া) পৌঁছালে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এতে রেলের ইঞ্জিন ও এর পেছনের ৭টি বগি বিকট আওয়াজ করে লাইন থেকে দুই পাশের জমিনে ছিটকে পড়ে। দুর্ঘটনার পর সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রেনটির ইঞ্জিন নং- ২৯২৬ এবং যাত্রীবাহী বগি নং- ৬৫০১, ৬৫১০, ৬৪০২, ৬৪০৫, ৬৬০৩, ৬৩০৬ দু’পার্শ্বের ধানি জমি ও রেল লাইনের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। রেলের চালক তোফাজ্জল হক, অ্যাটেনডেন্ট মিলন ও রেলের ৪০ জন যাত্রী কমবেশি আহত হন। গুরুতর আহত চালক তোফাজ্জল হককে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্য আহতদেরকে বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিত্সা দেয়া হয়েছে। ওই ট্রেনের পাওয়ার কারের চালক বশির আহমেদ (৬০), অ্যাটেন্ডেন্ট মোঃ রফিক (২২), যাত্রী জাহিদুর রহমানসহ (২৮) জানান, ট্রেনটির ১৭টি বগিতে প্রায় দেড় হাজার যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার বিকট আওয়াজে ঘুমন্ত যাত্রীরা জেগে উঠে প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিগিক ছোটাছুটি শুরু করেন। লাইনচ্যুত বগিগুলোর সবগুলোই ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। দুর্ঘটনার পর যাত্রীরা সকালেই তাদের মালামাল মাথায়-হাতে নিয়ে দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে উঠে যানবাহনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। এতে নারী-শিশুসহ শত শত যাত্রীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে সদর দক্ষিণ থানা পুলিশ, কুমিল্লা জেলা পুলিশ, রেল পুলিশ, র্যাব, ফায়ার সার্ভিসসহ রেলের সংশ্লিষ্ট কমকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন এবং আহতদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করেন। ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে দুর্ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী শ্রীমন্তপুর, উত্তর রামপুর, চানপুর, শ্রীভল্লবপুর, কিসমত, শ্যাঁওড়াতলী, হোসেনপুরসহ আশপাশের গ্রাম ও জেলা শহরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হাজার হাজার লোক ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত কুমিল্লার জেলা প্রশাসক মো. রেজাউল আহসান, পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, হরতালের নামে জনমনে আতংক সৃষ্টি করতে এ অরাজকতা ও নাশকতা ঘটানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দুইদিকে নোয়াখালী এক্সপ্রেস ও টু ডাউন মেইল আটকা পড়ে। এছাড়া সুবর্ণা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতী, পাহাড়িকা এক্সপ্রেস, উপকূল এক্সপ্রেস, কর্ণফুলী, চট্টলাসহ ওই লাইনে বিভিন্ন ট্রেনের যাত্রা সাময়িকভাবে বাতিল করা হয়। দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী (এইএন) ইরফান হোসেন জানান, দুর্বৃত্তরা দুর্ঘটনা কবলিত স্থানে রেল লাইনের ফিসপ্লেট খুলে প্রায় একশ’ ফুট রেল লাইন উপড়ে ফেলে। দুর্ঘটনায় প্রায় তিনশ’ ফুট রেল লাইন সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত হয়েছে। এদিকে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় কুমিল্লা থেকে একটি ইঞ্জিনের মাধ্যমে দুর্ঘটনা কবলিত ট্রেনের অক্ষত বগিগুলোকে আলাদা করে কুমিল্লা রেল স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সোয়া ৮টায় আখাউড়া ও লাকসাম থেকে দু’টি রিলিফ ট্রেন দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকার্য শুরু করে। পরে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী থেকে আরো একটি রিলিফ ট্রেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জিএম তফাজ্জল হোসেন জানান, ঘটনা তদন্তে রেলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (সিওপিএস) বেলাল উদ্দিনকে প্রধান করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য কর্মকর্তা হলেন প্রধান প্রকৌশলী এ.কে.এম মাহবুবুল আলম, চিফ মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার মোঃ আক্তারুজ্জামান হায়দার ও চিফ সিগনাল এণ্ড টেলিকমিউনিকেশনাল ইঞ্জিনিয়ার চন্দন কান্তি দাস। কমিটিকে আগামী ৪ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে। এ ঘটনায় লাকসাম জিআরপি থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। শিবিরের ১৭ নেতা-কর্মী গ্রেফতার এই নাশকতার সাথে জড়িত সন্দেহে শিবিরের ১৭ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার কোটবাড়ি এলাকার চাঙ্গিনী গ্রামের মাস্টার মেসে (ছাত্রাবাস) গতকাল বিকালে অভিযান চালিয়ে পুলিশ তাদেরকে গ্রেফতার করে। এসময় পুলিশ বিপুল পরিমাণ জেহাদি বইও উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, মঙ্গলবার ভোর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল লাইনের ফিসপ্লেট খুলে রেল নাশকতা ঘটিয়ে নতুন করে আরো নাশকতার পরিকল্পনায় গোপন বৈঠকের সময় সদর দক্ষিণ মডেল থানার ওসি আইনুল হকের নেতৃত্বে পুলিশ উপজেলার চাঙ্গিনী গ্রামের মাস্টার মেসে (ছাত্রাবাস) অভিযান চালায়। এসময় পুলিশ ওই মেস থেকে শিবিরের ১৭ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করে। কুমিল্লা সদর-এ-সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার জাহাঙ্গীর আলম ও সদর দক্ষিণ থানার ওসি আইনুল হক জানান, ওই মেস থেকে প্রায় দেড়শ’ জেহাদি বইসহ জামায়াত-শিবিরের সাংগঠনিক বইপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। কুমিল্লার পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান জানান, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ১১ জন সাথী ও ৬ জন শিবিরের সদস্য। তাদেরকে রেল নাশকতার সাথে জড়িত সন্দেহে এবং আরো নাশকতার উদ্দেশ্যে পরিকল্পনা বৈঠকের সময় গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বিষয়ে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। ১৬ ঘণ্টা পর রেলযোগাযোগ শুরু তূর্ণা-নিশিথা এক্সপ্রেস ট্রেন দুর্ঘটনার পর গতকাল ভোর ৪টা ৩৫ মিনিট থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-নোয়াখালী-চাঁদপুর পথে রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রেলওয়ের কর্মকর্তা ও উদ্ধারকর্মীসহ সংশ্লিষ্টরা এ দুর্ঘটনার পর থেকে বিরামহীনভাবে সাড়ে ১৫ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে গতকাল রাত ৮টা ৫ মিনিটের দিকে রেলপথ মেরামত কাজ সম্পন্ন করেন। এরপর রেল যোগাযোগ শুরু হয়। ঘটনাস্থলে উপস্থিত রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী ইরফানুল ইসলাম গতরাতে সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার হোসেন মজুমদার রাত ৮টা ১০ মিনিটে জানান, লাইন মেরামতের পর বিভিন্ন স্থানে আটকেপড়া ট্রেনগুলো আবার চলাচল শুরু করে এবং ধীরগতিতে দুর্ঘটনাস্থল অতিক্রম করে। এদিকে রেলের সিডিউল বিপর্যয়ের কারণে ওইপথে মঙ্গলবারের আন্তঃনগর ট্রেনগুলো বাতিল করা হয়।