রাজনৈতিক অস্থিরতায় বাড়ছে খেলাপি ঋণ

দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হওয়ায় ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ছে। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, গতবছর (২০১২) ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ আগের বছরের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে চলতি বছরের (২০১৩) প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরো বেড়েছে। তারা জানান, ইতিমধ্যে অনেক উদ্যোক্তা রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রসংগ টেনে ঋণের সুদ মওকুফের আবেদন জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ঋণকে ব্লক একাউন্টে রেখে দেয়ারও আবেদন করেছেন। এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় চলতি প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়বে বলে তারা জানান। একবছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে ২০১২ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৭২৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে শ্রেণীকৃত ঋণ বেড়ে যায় ১৯ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকের প্রভিশন ঘাটতি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত প্রভিশন রাখতে গিয়ে ব্যাংকের নিট আয়ও কমে যায়। ব্যাংকাররা জানান, বিদ্যুত্ ও গ্যাসসহ অবকাঠামো সুবিধার অভাবে এমনিতেই শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হয়। এর ওপর হরতালসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে শিল্প উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকে পণ্য প্রস্তুত করে তা রপ্তানি করতে পারেননি। বিশেষ করে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে না পারার কারণে স্টক লটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। আবার হল-মার্ক, ডেসটিনি, বিসমিল্লাহ গ্রুপ প্রভৃতি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ ঋণ আটকে যাওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে। তাদের মতে, গতবছর গ্যাস-বিদ্যুত্ সংকট ও হল-মার্ক কেলেঙ্কারির সাথে সাম্প্রতিক সময়ে যোগ হয়েছে ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট। এছাড়া বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পাশাপাশি ছিল টাকার অতিমূল্যায়ন। এসবের কারণে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে অনেকেই হিমশিম খেয়েছেন। ক্ষুদ্র এবং মাঝারি উদ্যোক্তাদের অনেকেই ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছেন। কোনো উদ্যোক্তা যদি পর পর দুইমাস ঋণের কিস্তি দিতে ব্যর্থ হন তখন সে ঋণকে ব্যাংকের ভাষায় স্পেশাল ম্যানশন একাউন্ট বা এসএমএ বলা হয়। তিন কিস্তি দিতে ব্যর্থ হলে তাকে নিম্নমানের এবং ৬ মাস কিস্তি না দিলে তা সন্দেহজনক ঋণ হিসেবে শ্রেণীকরণ করা হয়। ব্যাংকারদের সাথে কথা বললে তারা জানান, গত একবছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের হার দ্বিগুণ হলেও এবার তা আরো বেড়ে যাবে। ব্যাংকগুলো সদ্য শেষ হওয়া প্রান্তিকের হিসাব এখনো প্রকাশ না করলেও মনে করা হচ্ছে, এটি অনেকটা বাড়তির দিকে। এদিকে, ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক ব্যবস্থায় প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে ৫ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। একই বছরের সেপ্টেম্বর শেষে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৬৯৭ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৩ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা। যা ২১০ শতাংশ বেশি। সেপ্টেম্বরে ঘাটতি ছিল ছয়টি ব্যাংকে। গত ডিসেম্বরে তা বেড়ে আটটিতে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার সোনালী ব্যাংকে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশন নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। সর্বশেষ গত ডিসেম্বরের প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে ব্যাংকগুলোয় ২৪ হাজার ২৩৭ কোটি টাকা প্রভিশন সংরক্ষণের প্রয়োজন ছিল। সংরক্ষণ করা হয়েছে ১৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। এতে ব্যাংক খাতে সামগ্রিক ঘাটতি ৫ হাজার ২৬২ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে ২০ হাজার ৩৭৬ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যাংকগুলো ১৮ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকা সংরক্ষণ করেছিল। এদিকে, পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুত্ সুবিধা না পাওয়ায় নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে না। এর পাশাপাশি যেগুলো চালু আছে সেগুলোরও শতভাগ উত্পাদন ক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অনেক শিল্পকারখানার উত্পাদন অর্ধেকে নেমে গেছে। কেউবা ব্যবসায় টিকে থাকার জন্য বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ফার্নেস ওয়েল ও ডিজেল ব্যবহার করছে। কেউ জেনারেটর চালিয়ে মিল সচল রাখছেন। এতে উত্পাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্তিরতার কারণেও ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। এসব কারণে তারা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। নাম লেখাচ্ছেন ঋণখেলাপির তালিকায়। এদিকে ঋণ আদায় করতে না পারায় ব্যাংকেরও খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ঋণ আটকে পড়ায় ব্যাংকও নতুন করে ঋণ দিতে পারছে না। এতে ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।