৩৪তম বিসিএস

প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস পরীক্ষার আবেদনপত্র পূরণের সময় শেষ হয়ে গেল। বিসিএস পরীক্ষার প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। সরকারি কর্ম কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য হাতে আর সময় রয়েছে দেড় মাসের মতো। নির্ধারিত সিলেবাস না থাকায় এই পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে অনেক ধরনের সংশয় কাজ করে প্রার্থীদের মধ্যে। অথচ ১০০ নম্বরের এই নৈর্বক্তিক পরীক্ষাই হচ্ছে বিসিএস-এর স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ। প্রিলিমিনারী পরীক্ষার সাধারণ তথ্য বিসিএস পরীক্ষার প্রাথমিক বাছাই পর্ব এই প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। লক্ষাধিক আবেদনকারী থেকে হাজার দশেক পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ করা হয় এই পরীক্ষায়। ১০০ নম্বরের এমসিকিউ পদ্ধতির এ পরীক্ষায় মোট ১০০টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়। প্রতিটি প্রশ্নের সঠিক উত্তরের জন্য রয়েছে ১ নম্বর। আর কোনো প্রশ্নের ভুল উত্তর দিলে কাটা যাবে ০.৫ নম্বর। অতএব, প্রশ্নের উত্তর দিতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সব প্রশ্ন উত্তর করার চেয়ে নিজের জানা প্রশ্নগুলো উত্তর করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। অনুমান নির্ভর উত্তর করলে যদি তা ভুল হয়, তবে আপনার সঠিক উত্তরের জন্য প্রাপ্ত নম্বর থেকে কাটা যাবে নম্বর। ফিফটি-ফিফটি চান্সের উপর উত্তর করার চাইতে তাই ছেড়ে আসা অনেক উত্তম সিদ্ধান্ত হতে পারে। পরীক্ষার বিষয়সূচি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার জন্য নির্দিষ্ট কোনো পাঠ্যসূচি না থাকলেও বিগত বছরের প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সাধারণত ৫টি বিষয়ের উপরই প্রিলিমিনারি পরীক্ষার প্রশ্ন হয়ে থাকে। এগুলো হলো—বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং গাণিতিক ও মানসিক দক্ষতা। প্রশ্নপত্রের বিষয়গুলো মোটামুটি নির্দিষ্ট করা গেলেও কোন বিষয়ে কতগুলো প্রশ্ন থাকবে, তার ঠিক নেই। তাই সব বিষয়েই সমান গুরুত্ব নিয়ে প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে নিজ নিজ একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে পরিচিত বিষয়গুলোতে একটু বেশি গুরুত্ব দিলে তা সার্বিক প্রস্তুতিকে অনেকটাই এগিয়ে দেয়। বাংলা বিসিএস প্রিলিমিনারিতে বাংলা নিয়ে ভয়ে থাকেন, এমন মানুষের অভাব নেই। মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের পর থেকেই বাংলার সাথে সম্পর্কটা দূর হতে থাকে বেশিরভাগ প্রার্থীর। তবে একে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই বলেই সেই ভয়কে জয় করতে হবে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং ব্যাকরণ—সব বিভাগের প্রশ্নই থাকে পরীক্ষায়। ভাষা ও সাহিত্য অংশ থেকে বাংলা ভাষার ইতিহাস, সাহিত্যের ইতিহাস, বিখ্যাত সাহিত্যিকদের সাহিত্যজীবন ও কর্ম প্রভৃতি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। সাহিত্যনির্ভর উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী, সংবাদপত্র প্রভৃতি বিষয়ও থাকে। ব্যাকরণ অংশে বাংলা ব্যাকরণের ইতিহাস, ধ্বনিতত্ত্ব, রূপতত্ত্ব, শব্দতত্ত্ব, বাক্যতত্ত্ব—সকল বিষয় থেকেই থাকতে পারে প্রশ্ন। বিশেষত শব্দের উত্স, প্রকারভেদ, সন্ধি, সমাস, কারক ও বিভক্তি, শব্দের প্রকারভেদ, পারিভাষিক শব্দ, সমার্থক শব্দ প্রভৃতি বিষয়গুলো থেকে প্রশ্ন আসার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায়। বাংলায় প্রস্তুতির জন্য সাহিত্যিকদের জীবনী ও ভালো ব্যাকরণ বই পাঠের বিকল্প নেই। বোর্ডের মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক বই থেকে সাহিত্যিকদের জীবন ও জীবনকর্মের প্রস্ততি ভালো হতে পারে। ইংরেজি প্রিলিমিনারি পরীক্ষার আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইংরেজি। বাংলার মতো অবশ্য ইংরেজিতে ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে খুব বেশি প্রশ্ন থাকে না। ইংরেজি প্রশ্নের মূল গুরুত্ব থাকে ব্যাকরণ অংশে। ইংরেজি ব্যাকরণের মৌলিক জায়গাগুলো থেকেই এসব প্রশ্ন হয়ে থাকে। ক্রিয়াপদের ব্যবহার, অব্যয়-এর প্রয়োগ (বিশেষত প্রিপোজিশন), সঠিক শব্দের মাধ্যমে শূণ্যস্থান পূরণ, বাক্য শুদ্ধি, সমার্থক শব্দ, বিপরীত শব্দ, অনুবাদ—প্রভৃতি বিষয় থেকে বেশি প্রশ্ন থাকে এই পরীক্ষায়। তবে ভাষা ও সাহিত্য থেকে একেবারেই প্রশ্ন থাকে না, এমনটি নয়। বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিকদের উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম বা উক্তিগুলো থেকেও প্রশ্ন থাকতে পারে এই অংশে। ইংরেজির প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য পুরোনো বছরের প্রশ্নগুলো ভালো করে দেখে নিন। ভালো ব্যাকরণ বই হতে পারে আপনার সহায়। সাধারণ জ্ঞান অনেকেই বলে থাকেন, যেকোনো পরীক্ষার সবচেয়ে অসাধারণ অংশই হচ্ছে সাধারণ জ্ঞানের অংশ। কথাটি শতভাগ মিথ্যা নয়। আসলে সাধারণ জ্ঞানের নেই কোনো বাঁধাধরা সিলেবাস। ফলে বিপুল পরিধির সাধারণ জ্ঞান বেশিরভাগ প্রার্থীর কাছেই বোঝা মনে হয়। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক উভয় বিষয়েই প্রশ্ন থাকে। এর মধ্যে বাংলাদেশ বিষয়ক প্রশ্নের মধ্যে ভূ-প্রকৃতি, মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা ও স্বাধিকারের ইতিহাস, প্রাচীন বাংলার জনপদ ও তাদের ইতিহাস, কৃষি, শিল্প, ব্যক্তিত্ব, সমসাময়িক ঘটনাবলী, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, উল্লেখযোগ্য স্থাপনা, ভাস্কর্য, শিল্প-সাহিত্য, গুরুত্বপূর্ণ স্থান, নদ-নদী—কোনো বিষয়েই বাদ থাকে না। আবার আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীতেও পৃথিবীর ইতিহাস, ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যুদ্ধ, চুক্তি, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, স্থাপনা, ভাস্কর্য, শিল্প সাহিত্য, মানবাধিকার, দেশ ও রাজধানী, গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক স্থান, সমসাময়িক ঘটনাবলী—সব বিষয়েই প্রশ্ন থাকে। সাধারণ জ্ঞান বিষয়ে ভালো প্রস্তুতির জন্য ভালো সাধারণ জ্ঞানের বইয়ের উপর নির্ভর করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সঠিক তথ্যগুলোর জন্য ইন্টারনেটও হতে পারে সাধারণ জ্ঞানের জন্য উত্তম একটি মাধ্যম। আর দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সমসাময়িক ঘটনাবলীর জন্য দৈনিক সংবাদপত্রগুলো দিতে পারে প্রচুর তথ্য। তাছাড়া বর্তমানে সব সংবাদপত্রেই থাকে বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং সাধারণ জ্ঞানের অন্যান্য তথ্যের বিশেষ বিশেষ বিভাগ। তাই সংবাদপত্র পাঠ ও বিসিএস প্রিলিমিনারি প্রস্তুতির ভালো একটি অংশ হয়ে উঠতে পারে। তবে একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, সাধারণ জ্ঞানে ভালো করার জন্য দীর্ঘদিনের চর্চা প্রয়োজন। স্বল্প সময়ে সাধারণ জ্ঞানে ভালো করাটা মুশকিল। বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় এখন সাধারণ বিজ্ঞান এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে প্রশ্ন থাকে। এ ক্ষেত্রে পদার্থ, রসায়ন কিংবা জীববিজ্ঞানের প্রায় সব শাখা থেকেই প্রশ্ন আসার সুযোগ রয়েছে। তবে পদার্থ ও রাসয়ন বিজ্ঞানের মৌলিক সব তথ্য, মানবশরীর, খাদ্য ও পুষ্টি, দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় বিজ্ঞান, সৌরজগত ও মহাকাশ বিজ্ঞান, জীব ও জড়জগত্, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি শিক্ষা, মোবাইল, কম্পিউটার, ইন্টারনেট প্রভৃতি বিষয়ে প্রশ্ন বেশি থাকে এ অংশে। সে হিসেবে বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ের পাঠ্যসূচিও বেশ বড়। আলাদা করে এসব বিষয়ে সমন্বিত তথ্যের মৌলিক কোনো বই বাজারে নেই বললেই চলে। সে ক্ষেত্রে মাধ্যমিক-নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন সাধারণ বিজ্ঞান বই আপনার তথ্যের গুরুত্বপূর্ণ উত্স হয়ে উঠতে পারে। আর যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে, তারা ইন্টারনেট থেকেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মৌলিক বিষয়গুলোর তথ্যগুলো পেয়ে যেতে পারেন। গাণিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতা সাধারণ গণিত ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন বিষয়ের উপর বেশ কিছু প্রশ্ন থাকে প্রতি বছরের বিসিএস পরীক্ষায়। সাধারণ গণিতের ক্ষেত্রে সাধারণত খুব উচ্চ পর্যায়ের জটিল গাণিতিক সমস্যা থাকে না। নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের পাটিগণিত, বীজগণিত এবং জ্যামিতির মৌলিক অংশগুলো থেকেই সাধারণ প্রশ্ন থাকে এ অংশে। সেক্ষেত্রে ৬ষ্ঠ, ৭ম ও অষ্টম শ্রেণীর গণিতগুলো নতুন করে একবার দেখে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। মানসিক দক্ষতা অংশে মূলতই আইকিউধর্মী প্রশ্নগুলোই বেশি থাকে। বাজারে এখন আইকিউ বা পাজল বিষয়ে অনেক বই পাওয়া যায়। সেগুলোও দেখতে পারেন প্রস্তুতির জন্য। প্রস্তুতি নিন এখনই প্রিলিমিনারি পরীক্ষার বিশাল পাঠ্যসূচি দেখে ঘাবড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে একটা কথা অনেক প্রার্থীই বলে থাকেন পরীক্ষা শেষে, আরেকটু মনোযোগ আর সময় দিলেই পরীক্ষাটা ভালো হতো। সে ক্ষেত্রে বেশিরভাগ প্রার্থীই এই পরীক্ষার প্রশ্নের সাথে নিজেদের পরিচিত না থাকাকে দায়ী করে থাকে। কাজেই পুরোনো প্রশ্নগুলো বারবার মনোযোগ দিয়ে দেখে নিন। তাহলে আপনার প্রস্তুতি নেওয়ার ধারাটি ঠিক করে নিতে পারবেন সহজে। আর অনলাইনেও নানা ধরনের ওয়েবসাইট এবং ফেসবুকে কমিউনিটি পেজ রয়েছে বিসিএস প্রস্তুতি নিয়ে। সেগুলোও আপনার সহায় হতে পারে। কাজেই আর বসে থাকা নয়, শুরু হোক সিরিয়াস প্রস্তুতি। ০০০০০০০০০০০ প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় লক্ষাধিক পরীক্ষার্থীর অল্প কিছু প্রার্থীই সুযোগ পান পরবর্তীতে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার। কাজেই খুব সচেতন থাকতে হবে এই পরীক্ষায়। যেসব প্রশ্নের উত্তর জানা নেই, সেসব প্রশ্নও অনুমানের ভিত্তিতে উত্তর করে আসেন অনেক প্রার্থী। কেবল জানা প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিয়ে আসতে পারলেই প্রিলিমিনারি উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রশ্ন উত্তর করার চাইতে ছেড়ে আসার কৌশলটা রপ্ত করতে হবে। প্রস্তুতির জন্য নিজে যে বিষয়টিতে দক্ষ বেশি, তাতে মনোযোগী হলেই ভালো হবে। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা গণিত এবং বিজ্ঞানে নিজেদের চর্চা থাকায় প্রস্তুতির সময় এই দুই বিষয়ে মনোযোগ কম দেন। বরং এগুলোতে প্রস্তুতিটা ভালো হলে পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু বেশি থাকবে। একই কথা অন্যদের জন্যও প্রযোজ্য। বিসিএস প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে বন্ধুদের সাথে গ্রুপ স্টাডি। যাদের প্রস্তুতি একটু বেশি ভালো, তাদের নিয়ে একসাথে প্রস্তুতি নিলে আপনার প্রস্তুতিও ভালো হবে। মো. মেহেদী হাসান সহকারি কমিশনার, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, হবিগঞ্জ ৩০তম বিসিএস (প্রশাসন)