রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে শিবিরের হরতাল পালিত

রেল লাইনের স্লিপার ক্লিপ খুলে নাশকতা, ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতংক ছড়ানো, গাড়ি ভাঙচুর ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ছাত্রশিবিরের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। তবে অনেক জায়গাতেই জনজীবনে হরতালের প্রভাব পড়েনি। সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসাইনকে গ্রেফতারের প্রতিবাদে শিবির এই হরতালের ডাক দেয়। রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহীতে ছাত্রশিবিরের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ঢিলেঢালাভাবে পালিত হয়েছে। দুপুরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের বিনোদপুর বাজারে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রশিবির কর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রশিবির রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে এই হরতাল আহ্বান করে। নগরীর মতিহার থানার ওসি অসিত কুমার ঘোষ জানান, দুপুর ১২টার দিকে ছাত্রশিবির কর্মীরা বিনোদপুরের রাজশাহী-নাটোর মহাসড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধের চেষ্টা করে। এতে পুলিশ বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপর ইটপাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারসেল ও রাবার বুলেট ছোঁড়ে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে ছাত্রশিবির বিনোদপুরে ৮/৯টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক মহসিন আলম সাইমুম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, বিনোদপুরের সংঘর্ষে তাদের তিনজন কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে রাবি সংবাদদাতা জানান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামী ছাত্রশিবিরের তিন কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার রাতে সৈয়দ আমীর আলী হল থেকে তাদের আটক করা হয়। রংপুর প্রতিনিধি জানান, রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল চলাকালে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বৈরীগঞ্জ, গড়েরমাঠ ও পীরগাছা উপজেলার কদমতলী এলাকায় ৩টি ট্রাকে অগ্নিসংযোগ এবং মিঠাপুকুরে ২০/২৫টি যানবাহন ভাঙচুর করে শিবিরকর্মীরা। এছাড়া হরতাল সমর্থনকারীরা পীরগাছা উপজেলার শুকানপুকুর এলাকায় রেল লাইনে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে এলাকাবাসী ও রেলওয়ের লোকজন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিকে বিকালে কোতয়ালী থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ ১৮ দলের হরতাল চলাকালে দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে শিবিরের হামলায় আহত এসআই আব্দুস সবুরের ওপর হামলার হোতা ও রংপুর কোতয়ালী থানার সাবেক ওসি আলতাফ হোসেনকে হত্যা প্রচেষ্টা মামলার চার্জশিটভুক্ত অন্যতম আসামি মহানগর ছাত্রশিবিরের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক দুর্ধর্ষ শিবির ক্যাডার রাজীবুর রহমান পলাশসহ ৬ শিবির ক্যাডারকে গ্রেফতার করেছে। অপরদিকে হরতালের আগের রাতে মঙ্গলবার রাত ও গতকাল হরতাল চলাকালে ২২ জন শিবির ক্যাডারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। হরতাল চলাকালে দূরপাল্লার বাস ও ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলেও অন্য সকল যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। স্কুল-কলেজ, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান খোলা ছিল। বগুড়া প্রতিনিধি জানান, রেল লাইনের স্লিপার ক্লিপ খুলে নাশকতার চেষ্টা, সড়ক-মহাসড়কে বিদ্যুতের পোল ও গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ, শহরতলীতে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতংক ছড়ানোর চেষ্টা, পিকেটিংকালে পুলিশের সাথে মৃদু ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং হরতাল বিরোধী মিছিলসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যে দিয়ে বগুড়ায় ছাত্রশিবিরের ডাকা সকাল-সন্ধা হরতাল পালিত হয়েছে। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে ডাকা গতকালের হরতালের শুরুতেই ভোররাতে বগুড়ায় শিবির নেতাকর্মীরা কৈচড় শহরদীঘি এলাকায় রেল লাইনের স্লিপার ক্লিপ খুলে ফেলে। এতে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। পরে রেলওয়ে কর্মীরা মেরামত শুরু করলে প্রায় ৩ ঘণ্টা পর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ট্রেন চলাচল আবার স্বাভাবিক হয়। তবে আইন-শৃংখলা বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতি এবং নজরদারির কারণে শহরতলীতে বিছিন্নভাবে খণ্ড মিছিল ও পিকেটিং করলেও হরতালকারীদের শহরে দেখা যায়নি। দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল না করলেও শহরে রিকশা ভ্যান, আটোবাইক চলাচল করতে দেখা গেছে। এদিকে হরতালের কারণে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন। ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলোয়ার হোসেনের মুক্তি ও নির্যাতনের প্রতিবাদে নিজ জেলা ঠাকুরগাঁওয়ে হরতালের তেমন কোন প্রভাব পড়েনি। সকাল থেকে শিবিরের কোন নেতাকর্মীকে মাঠে ও পিকেটিং করতে দেখা যায়নি। শহরের সকল প্রকার যানবাহন স্বাভাবিক ছিল। তবে জেলা শহর থেকে দূরপাল্লার কোন গাড়ি ছেড়ে যায়নি। হরতালে বেশিরভাগ দোকান খোলা দেখা গেছে। অফিস-আদালত ও ব্যাংক পাড়ায় উপস্থিতির সংখ্যা ছিল স্বাভাবিক। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ট্রাকে অগ্নিসংযোগ, মটর সাইকেল ও প্রাইভেটকার ভাঙচুরসহ বিচ্ছিন্ন ঘটনার মধ্যদিয়ে ছাত্রশিবিরের ডাকা হরতাল পালিত হয়েছে। এদিকে নাশকতার আশংকায় উল্ল¬াপাড়ায় বিজিবি মোতায়েন করে জেলা প্রশাসন। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিমপাড় থানার উপ-সহকারী পরিদর্শক আল-মামুন জানান, একটি খালি ট্রাক ঢাকা থেকে রাজশাহী যাবার পথে ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদিকে উল্লাপাড়ায় পিকেটাররা ২টি মটর সাইকেল ও একটি প্রাইভেটকার ভাঙচুর করেছে। এছাড়াও সকালে চালা এলাকায় জামায়াত কর্মীদের সাথে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, জেলার আদিতমারী উপজেলার খাতাপাড়া এলাকায় গতকাল বুধবার সকালে হরতালের সমর্থনে পিকেটিং করার সময় ২ শিবিরকর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। পুলিশ জানায়, আটককৃত শিবিরকর্মীদ্বয় হরতালের সমর্থনে টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ ও গাড়ি ভাঙচুরের চেষ্টা করছিল। নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, জামায়াত-শিবিরের হরতালে সাড়া মেলেনি। তবে নীলফামারী-জলঢাকা সড়কের বাদিয়ার মোড়, দুহুলি, টেংগনমারী ও রাজারহাট এলাকায় পিকেটিং করে বেশকিছু শিবিরকর্মী। অপরদিকে হরতালের সময় শহরের দোকানপাট, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত খোলা ছিল। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। শহরজুড়ে চলে সাইকেল-রিকশাসহ সব যানবাহন। পাবনা প্রতিনিধি জানান, শিবিরের ডাকা হরতাল চলাকালে শহরের বড়বাজার এলাকায় শিবির-পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ শিবিরকে ছত্রভঙ্গ করতে বেশ কয়েক রাউন্ড ফাকা গুলিবর্ষণ করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৫ শিবির ক্যাডারকে আটক করে। একটি মিছিল শহর প্রদক্ষিণকালে বেশ কয়েকটি দোকানপাট ও যানবাহন ভাঙচুর করে এবং তারা শহরের বড়বাজার এলাকায় গিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে ৬ রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। শহরে অধিকাংশ দোকানপাট খোলা ছিল। দূরপাল্লার যানবাহন ব্যতীত সকল যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। পঞ্চগড় প্রতিনিধি জানান, জামায়াত-শিবিরের ডাকা হরতাল পঞ্চগড়ে শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। অধিকাংশ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। আন্তঃজেলা ও দূরপাল্লার বাস-মিনিবাস চলাচল করেনি। অন্যসব যানবাহন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে। কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে শহরের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। হরতালে মাঠে কোন শিবিরের নেতাকর্মীদের পিকেটিং করতে দেখা যায়নি। নাটোর প্রতিনিধি জানান, নাটোরে ছাত্রশিবিরের ডাকা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালিত হয়েছে। হরতালের সময় ছোট-বড় প্রায় সবধরনের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ছিল বন্ধ। হরতালের সময় সরকারি অফিস-আদালত খোলা থাকলেও সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ব্যাংক-বীমাও নামমাত্র খোলা ছিল। হরতালের সময় শহরে সামান্য কয়েকটি অটোরিকশা ও রিকশা ছাড়া অন্য কোন ধরনের যানবাহন চলতে দেখা যায়নি। তবে ট্রেন চলাচল ছিল স্বাভাবিক ছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় শহরের বিভিন্ন মোড়ে পুলিশ মোতায়েন ছাড়াও র্যাবের ভ্রাম্যমাণ টিমের টহল অব্যাহত ছিল। কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, কুড়িগ্রামে কোন পিকেটিং বা অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই ঢিলেঢালাভাবে হরতাল পালিত হয়েছে। রাস্তায় জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী বা পিকেটার ছিল না। শহরের চামড়ার গোলা এলাকায় অবস্থিত কুড়িগ্রাম জেলা জামায়াতের কার্যালয় ছিল তালাবদ্ধ। হরতালে দূরপাল্লার ও অভ্যন্তরীণ রুটের যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও ব্যাটারি চালিত অটো, ভটভটি, থ্রি-হুইলার, নছিমন-করিমন চলাচল করেছে স্বাভাবিকভাবেই। জলঢাকা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, জলঢাকায় সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়েছে। চলমান এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা হরতালের আওতার বাইরে থাকলেও শহরের দোকানপাট, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান আংশিক খোলা ছিল, অফিস ও ব্যাংক খোলা থাকলেও লোকসমাগম ছিল কম। দূরপাল্লার কোন যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। হরতালের সমর্থনে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের পৌর শহরে পিকেটিং করতে দেখা না গেলেও উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে টায়ারে আগুন দিয়ে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে শিবিরকর্মীরা। সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) সংবাদদাতা জানান, উপজেলায় রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ছাত্রশিবিরের ডাকা হরতাল পালিত হয়নি। হরতাল উপজেলায় কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। দূরপাল্লার যানবাহন ছেড়ে না গেলেও দোকানপাট, অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি অফিস খোল ছিল। সকাল থেকে কোথাও কোন পিকেটার দেখা যায়নি। জীবনযাত্রা ছিল স্বাভাবিক।