২৩ সংগঠনের ২৪ ঘণ্টা হরতাল আজ সন্ধ্যা থেকে

হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালের প্রতিবাদে ২৪ ঘন্টার হরতালের ডাক দিয়েছে দেশের ২৩টি সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে শনিবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এ হরতাল সফল করতে জনগণের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ডাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) অভ্যন্তরীণ ক্রীড়া কক্ষে এক যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে এ হরতালের ঘোষণা দেয়া হয়। সাংবাদিক সম্মেলনে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দীন ইউসুফ লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। সংবাদ সম্মেলনে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, যদিও আমরা হরতালের সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করি না, তবু জামায়াত-শিবিরের বেড়াজালে জড়িয়ে পড়া হেফাজতে ইসলামী নামের সংগঠন কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আয়োজিত ঢাকা অভিমুখে যে লংমার্চের ডাক দিয়েছে, এর প্রতিবাদে ৫ এপ্রিল সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ৬ এপ্রিল সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ হরতাল পালনের জন্য আমরা দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, হেফাজতে ইসলাম গণজাগরণ মঞ্চ সম্পর্কে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ৬ এপ্রিল ঢাকা অভিমুখে হরতাল লংমার্চের ঘোষণা দিয়েছে। কোন ধরনের তথ্য প্রমাণ ছাড়া তারা জামায়াত-শিবিরের সাথে সুর মিলিয়ে গণজাগরণ মঞ্চের উদ্যোক্তাদের নাস্তিক ও ধর্মবিরোধী আখ্যা দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য ও নানা ধরনের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। তাদের কর্মসূচি আপাতঃদৃষ্টিতে দলনিরপেক্ষ মনে হলেও এর পিছনে জামায়াত-শিবিরের প্রত্যক্ষ ইন্ধন ও অংশগ্রহণ স্পষ্ট। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে ১৮ দলীয় ঐক্যজোট হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচিকে সমর্থন দেয়ায় এটিকে আর নির্দলীয় কর্মসূচি বলার সুযোগ নেই। জামায়াত-শিবির ও তার জঙ্গি গোষ্ঠী লংমার্চের সাথে মিশে গিয়ে হত্যাকাণ্ডসহ নানাধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে পারে। এ ধরনের লংমার্চ দেশে নৈরাজ্য ও হানাহানি উস্কে দেয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করে দিতে পারে। সাংবাদিক সম্মেলনে হরতালসহ দুই দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির। তিনি বলেন, আমরা হরতালের পক্ষে নই। তবে অনন্যোপায় হয়ে আমরা এ কর্মসূচি দিয়েছি। জামায়াত হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ কর্মসূচিতে সমর্থন দিয়েছে এবং এতে আর্থিকভাবেও সহযোগিতা করছে। জামায়াত সমর্থন দেয়ায় লংমার্চে সহিংসতা হতে পারে। তিনি বলেন, আমরা শান্তিপূর্ণভাবে হরতাল পালন করবো। কোনো হামলা করব না। যদি কোনো সহিংসতা হয় তবে সেটি হবে জামায়াত-শিবিরের তত্ত্বাবধানে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করতে তারা নানা কৌশল গ্রহণ করছে। হেফাজতের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ হবে, এটি আমরা বিশ্বাস করি না। তাদের সাথে জামায়াত ঢুকেছে। তারা তান্ডব ঘটাবে। সরকারকে এটি প্রতিহত করতে হবে। আমাদেরও ধৈর্যের সীমা আছে। শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘ব্লগারদের তথ্যপ্রমাণ ছাড়া যেভাবে নাস্তিক ঘোষণা করা হচ্ছে ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। অন্যদিকে, সাঈদীকে চাঁদে দেখানোসহ জামায়াতের যেসব ব্লগার ইসলামের প্রতি অবমাননাকর তত্পরতা চালাচ্ছে, তাদের আটকের ব্যাপারে সরকারের কোনো পদক্ষেপ নেই। শাহরিয়ার কবির আরও বলেন, পরিবহন শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁরা আলোচনা করেছেন। তাঁরা আশ্বস্ত করেছেন, লংমার্চে তাঁরা তাঁদের যানবাহন ব্যবহার করতে দেবেন না। তিনি দুই দিনের কর্মসূচি জানিয়ে বলেন, ২৪ ঘণ্টার হরতালে সারা দেশের রাজপথ, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট, মহাসড়কে অবস্থান নেয়া হবে। কর্মসূচির অংশহিসেবে গতকাল সন্ধ্যা ছয়টায় হরতালের সমর্থনে শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব মশাল মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। আজ সারা দেশের জেলা, উপজেলা, ইউনিয়নে সন্ধ্যায় মশাল মিছিল হবে। শনিবার সন্ধ্যায় টিএসসিতে সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। হরতাল আহবানকারী ২৭সংগঠনের মধ্যে রয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, প্রজন্ম-৭১, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি, জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্ট, স্বাধীনতা চিকিত্সক পরিষদ, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ, হাক্কানী খানকা শরীফ, বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ, বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, সম্মিলিত ইসলামী জোট, জাতীয় কবিতা পরিষদ, পথনাটক পরিষদ, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। হরতালে সমর্থন জানিয়েছে সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (সিপিবি), গণতন্ত্রী পার্টি, গণঐক্য, বাসদ (বিএসডি), জনসংহতি সমিতি, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, ন্যাপ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বাংলাদেশ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, বঙ্গবন্ধু শিল্পী গোষ্ঠী, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক ঐক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠন। ‘লংমার্চ প্রতিরোধ করা গণতান্ত্রিক শক্তির কর্তব্য’ হেফাজতে ইসলামের আগামীকাল শনিবারের লংমার্চের প্রতিবাদে ও জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদসহ ২৭টি প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আজ শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ২৪ ঘণ্টার ডাকা হরতালে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে ১০টি বাম প্রগতিশীল দল। এ দলগুলো হলো—বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, গণতন্ত্রী পার্টি, গণঐক্য, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল, গণআজাদী লীগ, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টি, কমিউনিস্ট কেন্দ্র, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, পার্বত্য জনসংহতি সমিতি ও বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। ওয়ার্কার্স পার্টির কার্যালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে এক বৈঠকে ১০ বাম দল হরতালের সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয়। সভায় বক্তারা বলেন, এই লংমার্চ প্রতিরোধ করা গণতান্ত্রিক শক্তির কর্তব্য। হেফাজতে ইসলামের লংমার্চ কার্যত দেশের অসামপ্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিনাশ সাধনের উদ্দেশ্য প্রণোদিত। এই লংমার্চ সংগঠন ও পরিচালনায় জামায়াত ইসলামী মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এর সাথে বিএনপির সমর্থন যুক্ত হওয়ায় একে কোন নির্দলীয় কর্মসূচি বলা যাবে না। সভায় হেফাজতে ইসলামের কর্মসূচি সম্পর্কে সরকারের আপোষমুখী ভূমিকার সমালোচনা করে বলা হয়—গণজাগরণ মঞ্চ বন্ধ করে দেয়া, ব্লগারদের গ্রেফতার সরকারের এই ভূমিকাকে স্পষ্ট করেছে। সভায় জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা সম্পর্কে সরকারের ভূমিকাকে স্পষ্ট করার দাবি জানানো হয়। একই সাথে আটক ব্লগারদের মুক্তি, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গ্রেফতার ও জামায়াত-শিবির পরিচালিত ধর্মের অপব্যবহারকারী পত্রিকা ও ব্লগসমূহ বন্ধ করার দাবি জানানো হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। সভায় উপস্থিত ছিলেন—ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান মল্লিক, কেন্দ্রীয় নেতা আবু হানিফ, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক নুরুর রহমান সেলিম, কেন্দ্রীয় নেতা কামরুল আহসান খান পারভেজ, গণঐক্যের আহবায়ক পঙ্কজ ভট্টাচার্য, গণআজাদী লীগের সভাপতি হাজী আব্দুস সামাদ, সাম্যবাদী দলের পলিটব্যুরো সদস্য লুত্ফর রহমান, ধীরেন সিং, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) আহবায়ক রেজাউর রশীদ খান, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের আহবায়ক ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম খান, যুগ্ম আহবায়ক ডা. অসিত বরণ রায়, ন্যাপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা দীপায়ন খিসা, গণতান্ত্রিক মজদুর পার্টির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন প্রমুখ।