‘বাঙালির বাংলা’প্রবন্ধের শ্রেণিশিক্ষা

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী বন্ধুরা, কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধটি বুঝানোর জন্য শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে যেভাবে বক্তব্য দিতে পারেন এবং তোমরা কবিতাটির মূলভাব অনুধাবন করতে পার, সেভাবে তোমাদের জন্য শ্রেণিশিক্ষা পর্বে প্রবন্ধটির মর্মকথা তুলে ধরেছেন স্কর্লাসহোম স্কুল এন্ড কলেজ সিলেট’র বাংলা বিষয়ের শিক্ষক রোমানা আফরোজ। লেখক পরিচিতি: বাংলা সাহিত্যের বিপ্লবী কবি ও প্রতিবাদী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই মে (বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ই জ্যৈষ্ঠ) বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে পারেন নি। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি স্কুল ছেড়ে দেন। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালে বাঙালি পল্টনে যোগ দেন। যুদ্ধ শেষ হলে ১৯১৯ খ্রি: বাঙালি পল্টন ভেঙে দেয়া হয়। সেখান থেকে ফিরে এসে নজরুল সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এ সময় সাপ্তাহিক ‘বিজলী’ পত্রিকায় তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে চারদিকে সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর লেখায় পরাধীনতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ ও বিদ্রোহ উচ্চারিত হয়েছে। এজন্য তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলা হয়। সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি ইসলামি গান ও গজল লেখে প্রশংসা পেয়েছেন। এছাড়া তিনি তাঁর রচনায় আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারে কুশলতা দেখিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে, ‘অগ্নিবীণা’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘সিন্ধু-হিন্দোল’, ‘রিক্তের বেদন’, ‘চক্রবাক’ ইত্যাদি। মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হন এবং বাক্শক্তি হারান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কবিকে ঢাকায় এনে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। এরপর তাঁকে আমাদের জাতীয় কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। নির্বাক কবি নজরুল ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। পাঠ পরিচিতি: কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধটি ‘নবযুগ’ পত্রিকায় ১৩৪৯ বঙ্গাব্দের ৩রা বৈশাখ প্রকাশিত হয়। ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধটি বাংলার ঝিমিয়ে পড়া মানুষকে জাগিয়ে তোলার এক অনবদ্য প্রয়াস। জ্ঞান-গরিমা আর প্রেম শক্তিতে বলীয়ান বাঙালি জাতি আজ চরম দুর্দশার মুখোমুখি। তাদের আলস্য, কর্মবিমুখতা আর জড়তা তাদেরকে অস্তিত্বহীন করে তুলেছে। মাকে ভুলে বহিঃশক্তির লোভাতুর বিজ্ঞাপনে আজ বাঙালি আকৃষ্ট। অথচ তাদেরও ছিল এমন ঐশ্বর্য আর প্রাচুর্য। সারা পৃথিবীর লোককে দিনের পর দিন খাওয়ানো তাদের কোন ব্যাপার ছিল না। বাংলা ছিল অপার রূপবৈচিত্র্যে মোড়ানো এক চিত্রপুরী। ঋতুবৈচিত্র্যের উন্মাদনায় মেতে উঠত সারা দেশ। এ দেশ ছিল মুনি, ঋষি, যোগী, ফকির, দরবেশ, অলি, গাজিদের পীঠস্থান। এখানকার মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি ও ধর্মবোধ নিয়ে সবাই সমপ্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ ছিল। মানুষে মানুষে এমন গভীর আত্মীয়তা পৃথিবীর আর কোথাও নেই। বাংলার মাটি ছিল সোনার বাড়া, মধুময় ছিল এর প্রাকৃতিক পরিবেশ। মাটির গভীরে কয়লাসহ নানান খনিজ সম্পদের অফুরন্ত সম্ভার ছিল। বাংলার নদ-নদীর স্বচ্ছ ধারা উদাস করে দিত পথিককে। বাংলার বৃক্ষের সুশীতল ছায়া সকল ক্লান্তি ভুলিয়ে দিতে পারে। এ কারণে বার বার বিদেশিরা এদেশ আক্রমণ করেছে। এদেশের মানুষ জ্ঞান শক্তি ও প্রেম শক্তিতে পৃথিবী খ্যাত। ঐশ্বর্যে অফুরন্ত, জাতিতে সম্ভ্রান্ত, সম্পদে শ্রেষ্ঠ ছিল এক সময় বাঙালিরা। সাহসে, সমরে, আত্মদানে বাঙালি ছিল অগ্রগামী। কিন্তু আজ সেই বাংলা, সেই বাঙালি দীন-দরিদ্র হয়ে দিনাতিপাত করে। অতি প্রাচুর্য বাঙালিকে কেবল ভোগ বিলাসের দিকেই ঠেলে দেয় নি, অলস জাতিতে পরিণত করেছে। বাঙালির আজকের দুরবস্থার জন্য প্রধানত তাদের কর্মবিমুখতা ও আলস্যকেই দায়ী করা হয়। বাঙালির এত ঐশ্বর্য হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের জড়ত্ব, মৃত্যুভয় আর তন্দ্রার কারণে। সৌন্দর্য, ঐশ্বর্য আর মাধুর্যের লীলা নিকেতন এই বাংলা ভীরু কাপুরুষ সেই লোকদের কারণে আজ হয়ে গেছে প্রায় মরুভূমি। তারা বিদেশিদের দাসে পরিণত হয়েছে, বিদেশি চক্র নিয়ে যাচ্ছে বাংলার সম্পদ। বাংলা মায়ের সম্পদ লুট হচ্ছে, নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে প্রিয় বাংলা অথচ এতেও বাঙালিদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। একসময় কেউ কেউ প্রবল পরাক্রমে তা প্রতিহত করার চেষ্টা করলেও এখন সেরকম দেখা যায় না। কোন প্রতিবাদ তো করেই না বরং চুর, লুটেরাদের দালালি করে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য কাজী নজরুল ইসলাম বাঙালিকে জেগে ওঠার আহবান জানিয়েছেন, আলস্য পরিহার করে কর্মে আত্মনিয়োগের জন্য বলেছেন, বাঙালির প্রাচুর্য যারা লুট করতে চায় তাদের প্রতিহত করার জন্য বলেছেন। বাংলাকে রক্ষার জন্য বাঙালির মন-মননে যাতে সংগ্রামের বীজ রোপিত হয়। কবি বাংলার জনগণকে আহবান করেছেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে জেগে ওঠার জন্য। ‘বাঙালির বাংলা’ প্রবন্ধে এরকম জাগ্রত এক জনতার কথা বলা হয়েছে, যারা সংহারে উন্মত্ত ছিল, যারা প্রতিহত করত বিদেশি দস্যুদের। সেই সব বীর সেনানীর আত্মদান ইতিহাস হয়ে আছে। বাংলার সোনালি অতীত হয়ত এখন আর নেই কিন্তু রয়ে গেছে তাদের আত্মত্যাগের প্রদীপশিখা। সে প্রদীপের আলোয় ঐশ্বর্য রক্ষার সংগ্রামে অবতীর্ণ মানুষদের আবার জেগে ওঠতে হবে। বাংলার জাগ্রত জনতা আবার জেগে ওঠবে। তাই আজ থেকে বাঙালির প্রত্যয় হয় যেন এমন—“ বিনা যুদ্ধে নাহি দেব সুচগ্র মেদিনী।” তবেই বাঙালির জয় হবে। বিদেশি যে শক্তি বাঙালির সম্পদ ও ঐশ্বর্য চুরি করতে চায় সে শক্তিকে প্রতিরোধ করতে পারলেই বাঙালি প্রকৃত অর্থে ‘বাঙালি’ হয়ে ওঠবে।