কৃষিকে আরো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে

সারণী: বিভিন্ন ফসলের উত্পাদন (লক্ষ টনে) ফসলের নাম ২০০৯ ২০১০ ২০১১ ২০১২ চাল ৩১৭ ৩৩৩ ৩৩৭.৫ ৩৪০.৫ গম ৮.৫ ৯.৭ ৯.৭ ১০ ভুট্টা ৬.৫ ১৩.৭ ১৫.৫ ১৯.৫ আলু ৬৭.৫ ৮৪ ৮৩.৩ ৮২.১ ডাল ৫.৯ ৬.৫ ৭.২ ৬.৭ পেঁয়াজ ৮.৫ ১৪.২ ১৫.৯ ১৯ পাট (লক্ষ বেল) ৪৯.৪ ৮৪.৬ ৮০ ৭৪.৪ বাঙালি জাতির গর্ব করার অনেক বিষয় আছে। মাঝে মাঝে বিশ্ব তা স্বীকার করে। যেমন গত দেড়-দুই বছর ধরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি নিয়ে প্রশংসাসূচক আলোচনা অব্যাহত আছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার ২০১৩ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনেও বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো বলেছে যে ব্রিকস- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা- উদীয়মান এ পঞ্চরত্নের পর অগ্রসরমান ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। অপরদিকে বাংলাদেশ বিশ্বের গুটিকয়েক দেশের একটি যার অর্থনৈতিক গতিশীলতা শুধু দেশীয় কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল নয়। জনশক্তি রপ্তানি ও রেমিটেন্স প্রাপ্তিতে উত্তরোত্তর প্রসার ঘটায় অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এই নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে। যা হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও বা নাশকতার মাধ্যমে বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হিসেবে হরতাল ও সহিংস কর্মসূচীতে গত পাঁচ মাসে চার শতাধিক বাস-ট্রাকে আগুন এবং তিন সহস্রাধিক যানবাহন ভাঙচুর করা হয়েছে। হরতালকারীরা বেইলী ব্রীজ ভেঙ্গে, রাস্তা কেটে, রাস্তার পাশে কালো ধোঁয়া শোষক গাছ করাতকল দিয়ে কেটে রাস্তায় ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করেছে। অর্থনীতির চাকাকে স্থিমিত করেছে। কিন্তু এর কোনো কিছুই জনশক্তি রপ্তানিতে ছন্দপতন ঘটাতে পারেনি। তবে নৈরাজ্য সৃষ্টিতে যেভাবে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া হচ্ছে তাতে কোনো কোনো দেশ বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি আমদানি করতে অনাগ্রহ দেখাতেও পারে। এর আগে রোহিঙ্গারা দলে দলে বিদেশে গেছে বাংলাদেশের নাগরিক সেজে। অর্থের বিনিময়ে পাসপোর্ট যোগাড় করেছে। আর বিদেশে গিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে। ইমেজ নষ্ট হয়েছে বাংলাদেশের। জঙ্গী সংশ্লিষ্টতা থাকলে এর চেয়েও বড় ক্ষতি হবে। জঙ্গী উত্পাদনের কারখানায় আঘাত করতে না পারলে সুযোগ পেলেই তারা মাথাচারা দিয়ে উঠবে। আফগানিস্তান, পাকিস্তান, দক্ষিণ সুদান, ইয়েমেনের প্রমাণ। অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একটি নির্ভরযোগ্য খাত আছে। যার অগ্রযাত্রা জঙ্গী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড দিয়ে তেমন বিঘ্নিত করা যাবে না। এমনকি সেনাবাহিনীকে সরকারের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে, সংবিধানের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়েও এর অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। সেটি হচ্ছে, বাঙালির ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে থাকা কৃষিখাত। এর মধ্যে ফসল উপখাতই মুখ্য। যদিও সাম্প্রতিককালে মত্স্য, পোলট্রি, গবাদিপশু পালন এবং দুগ্ধ উত্পাদনে দেশ অনেক এগিয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা এ দেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এই ফসল। যা সাধারণভাবে কৃষিখাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ষাটের দশকে বিশ্বের কৃষিপ্রধান দেশগুলোতে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয়। রাসায়নিক সার, উচ্চ ফলনশীল বীজ ও সেচ প্রয়োগ করে অধিক ফসল উত্পাদনের এ কৌশল খুব দ্রুতই বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশেও এর ছোঁয়া লাগে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু দেশে সবুজ বিপ্লব বাস্তবায়ন শুরু করেন। এর মাধ্যমে তিনি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্য পূরণে ব্রতী হন। পঁচাত্তরের পর দেশ যে শুধু রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তা-চেতনায় পাকিস্তানমুখী হয়েছে তা নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণেও আমূল পরিবর্তন আনা হয়। সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে কৃষির চেয়ে শিল্পখাতকে বেশী গুরুত্ব দেয়। অথচ তখন বাঙালি উদ্যোক্তাও ছিল না বললেই চলে। মূলধন যোগানের সামর্থ্যও ব্যাংকগুলোর ছিল না। বঙ্গবন্ধু শিল্প বিকাশ ও আমদানি বিকল্প হিসেবে দেশের বন্ধ ও ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প-কলকারখানাগুলোকে জাতীয়করণ করেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এগুলোকে সচল করার উদ্যোগ নেন। অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা পরিবর্তীত হওয়ায় আশির দশকের শুরুতে রাষ্ট্রায়ত্ব অধিকাংশ শিল্প আবার বেসরকারি মালিকানায় ছেড়ে দেয়া হয়। যার অধিকাংশই পরবর্তীকালে উদ্যোক্তা ও মূলধনের অভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে সরকার কৃষিখাতে বিনিয়োগ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে যেখানে মোট বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর প্রায় ১৪ শতাংশ ছিল কৃষি উন্নয়নে সেখানে ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে তা দুই শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। এই মারাত্মক অবহেলার মধ্যেও কৃষি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়েছে কৃষকের একক প্রচেষ্টায়। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে সরকার আবার কৃষি উন্নয়নে নজর দেয়। এর ফলও পায়। ২০০১ সালে বাংলাদেশ চাল উত্পাদনে স্বয়ংসস্পূর্ণ হয়। গম, ভুট্টা, আলু, শাকসবজির উত্পাদনও বাড়ে। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছর কৃষি উত্পাদনে তেমন প্রবৃদ্ধি হয়নি। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে পাল্লা দিয়ে ধান উত্পাদন বাড়েনি। ফলে খাদ্য আমদানি বেড়ে যায়। দামও নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আজকের উন্নত বিশ্বের প্রায় সবগুলো দেশেই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে। তাই তারা এখনও কৃষিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আলোচনায় শিল্প ও সেবাখাতের বাণিজ্য উদারিকরণে সবাই ঐকমত্য পোষণ করলেও কৃষির ক্ষেত্রে উন্নত, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত প্রতিটি দেশই রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে। ফলে ১২ বছরেও ডব্লিউটিও’র দোহা রাউন্ডে কোনো অগ্রগতি হয়নি। কোনো পক্ষই কৃষিপণ্যের বাজার পুরোপুরি উন্মুক্তকরণের পক্ষে নয়। উত্পাদন ও রপ্তানিতে ভর্তুকি বন্ধ করতেও কেউ রাজী নয়। সবাই নিজ দেশের কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ অটুট রাখতে বদ্ধপরিকর। কৃষি শুধু বাঙালি জাতির মেরুদণ্ডই নয় বিশ্বের প্রাণশক্তি। খাদ্যের অভাব দেখা দিলে কোনো ঘোষণা ও উস্কানি ছাড়াই সহিংসতা শুরু হয়। ২০০৮ সালেও বিশ্ব এমন পরিণতি দেখেছে। প্রকৃতি অনুকূল না থাকায় ২০০৭ ও ২০০৮ সালে বিশ্বে খাদ্য উত্পাদন কম হয়েছে। জ্বালানি তেলের দামও তখন প্রতি ব্যারেল ১৪৭ ডলার পর্যন্ত উঠে। এতে উত্পাদন ব্যয় বাড়ে। যা কৃষিপণ্যের মূল্য বৃদ্ধিতে ইন্দন যোগায়। সেবছর খাদ্যের দাবীতে ৩৪টি দেশে দাঙ্গা-সংঘাত হয়। কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি ও তেলের দাম কমায় ২০০৯ সালে কৃষিপণ্যের বিশ্ববাজার আবার কমতে শুরু করে। কিন্তু ২০১০ সাল থেকে কৃষিপণ্যের বিশ্ববাজার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। বর্তমানে তা অনেক উপরে স্থিতি হয়েছে। ফলে প্রতিটি দেশই আবার কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধিতে মনোযোগী হয়েছে। বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন চাল, আটা, ভোজ্যতেল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দামই আকাশচুম্বী ছিল। বিশ্ববাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি মূল্যও বাড়ে। সরকার তাই শুরুতেই কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। টিএসপি, ডিএপি ও পটাশ সারের দাম কমায়। এতে কৃষকরা ইউরিয়া ছাড়াও অন্যান্য সার জমিতে দেয়ার সুযোগ পায়। কৃষক সময়মতো সুলভমূল্যে পর্যাপ্ত সার পায়। সরকার উপজেলা সার ডিলার ছাড়াও ইউনিয়ন পর্যায়ে খুচরা বিক্রেতার মাধ্যমে সারের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করে। এতে দুটো লাভ হয়েছে। কৃষক সুষম সার ব্যবহার করায় উত্পাদন বেড়েছে। সব ধরনের পুষ্টি পাওয়ায় মাটির উর্বরাশক্তি বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত ফসল উত্পাদনের সামর্থ্য ফিরে পেয়েছে। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে খাল খনন, নলকূপ স্থাপনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। ডিজেল ব্যয় মেটানোর জন্য কৃষকদেরকে ভর্তুকি দিচ্ছে। বিদ্যুত্চালিত সেচ পাম্পগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। বিএডিসি’র বীজ উত্পাদন সামর্থ্য বাড়িয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদেরকে বীজ উত্পাদন ও সংরক্ষণে সমর্থ করে তুলেছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের লক্ষ্যে আমদানিতে শুল্ক সুবিধা দিয়েছে। দেশে কৃষি যন্ত্রপাতি উত্পাদনের লক্ষ্যে উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দিচ্ছে। বছরে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করছে। বর্গাচাষীরাও কৃষিঋণ পাচ্ছে। ফলে সবাই পর্যাপ্ত কৃষি উপকরণ ব্যবহার করতে পারছে। প্রত্যেক কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড দিয়েছে। এর ফলে সার, বীজ, সেচ ও অন্যান্য উপকরণে সরকারের দেয়া ভর্তুকি মধ্যস্বত্বভোগীরা খেতে পারছে না। পুরোটাই কৃষক পাচ্ছে। কৃষক ফসল উত্পাদনে পূর্বপরিকল্পনা করতে পারছে। দেশের কৃষি উত্পাদন সম্পর্কেও একটা আগাম ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। কৃষককে ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছে। এর ফলে কৃষকের ব্যাংক ঋণ ও ভর্তুকির টাকা প্রাপ্তি এবং সঞ্চয় নিরাপদ হয়েছে। সার ও বীজ কেনার সামর্থ্য নেই এমন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে বিনামূল্যে সার ও বীজ দিচ্ছে। কৃষি উত্পাদন বহুমুখীকরণেও কৃষককে প্রণোদনা দিচ্ছে। ডাল, তৈলবীজ ও ভুট্টা চাষের জন্য ২ শতাংশ রেয়াতী সুদে ঋণ দিচ্ছে। এসব পদক্ষেপের ফলে কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধিতে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। সারণী অনুযায়ী, গত চার বছরে চাল, গম, ভুট্টা, আলু, ডাল, পেঁয়াজ, পাটসহ প্রতিটি ফসলের উত্পাদন বেড়েছে। চাল উত্পাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। আশির দশক থেকে গত তিন যুগ ধরেই বছরে ৪২ লক্ষ থেকে ৪৪ লক্ষ বেল পাট উত্পাদিত হয়েছে। কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়নি। বাংলাদেশ পাট ও পাটজাত পণ্যের বিশ্ববাজার হারিয়েছে। বর্তমান সরকার পাটের সেই হারানো বাজার পুনরুদ্ধার করেছে। ফলে কৃষক আবার পাট উত্পাদনে আগ্রহী হয়েছে। চার বছরে উত্পাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। বিশ্ববাজারে দেশের পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বন্ধ পাটকলগুলো চালুর ব্যবস্থা করেছে। বেরসকারি খাতের অনেক বন্ধ পাটকল চালু হয়েছে। দেশ এখন বছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশী পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করতে পারছে। আলু উত্পাদনে দেশ এখন উদ্বৃত্ত। ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে পেঁয়াজ উত্পাদনে। শাক-সবজি উত্পাদন যথেষ্ট বেড়েছে। এখন প্রায় সব সবজিই বারো মাস পাওয়া যায়। সবজি রপ্তানি করে দেশ বছরে ৪০ কোটি ডলার আয় করছে। ফলে উত্পাদনও অনেক বেড়েছে। ফলও রপ্তানি হচ্ছে। ভুট্টার উত্পাদন বাড়ায় পোল্ট্রি খাবার আমদানি অনেক কমেছে। কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণ সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ আদমশুমারী অনুযায়ী বছরে ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বাড়ছে। খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর বসবাস, নতুন নতুন শিল্প-কল-কারখানা স্থাপন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণ এবং মানুষের আর্থিক অবস্থার উন্নতির সাথে সাথে পরিবার ও আবাসনের সংখ্যা বৃদ্ধির পুরো চাপ পড়ছে কৃষিজমির ওপর। কমছে কৃষিজমি। কম জমিতে বেশী ফসল উত্পাদনের জন্য মাটির পূর্ণ উত্পাদনশীলতা ধরে রাখতে হবে। এজন্য প্রতিটি মাঠের মাটি নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। উচ্চ ফলনশীল, হাইব্রিড ও কৌলিপ্রযুক্তিজাত বীজ ব্যবহার বাড়াতে হবে। সেচ ব্যবস্থা আরো সম্প্রসারণ করতে হবে। সেচ পানির কার্যকারিতা বর্তমানের ৪০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এজন্য উদ্যোক্তা সৃজনে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। যাতে কৃষক সস্তায় যন্ত্রপাতি কিনতে পারে। এতে ফসল অপচয়ও অনেকাংশে কমবে। দু-ফসলী জমি তিন ফসলীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে কৃষককে উত্সাহিত করতে হবে। সাথী ফসলের ধারণা দেশের সর্বত্র কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকার কৃষির দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন নিশ্চিতে কৃষি গবেষণার ওপর জোর দিয়েছে। গবেষণার জন্য পৃথক বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে গবেষকরা পাট ও ফসল নষ্টকারী ছত্রাকের জীবন-রহস্য আবিষ্কার করেছেন। এই গবেষণা ফলাফল কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রয়োগে উদ্যোগ নিয়েছে। লবণাক্ততা, খরা ও বন্যা সহিষ্ণু ধানের জাত উদ্ভাবন করেছেন। এগুলো অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক খবর। গবেষণালব্ধ ফলাফল মাঠে প্রয়োগ নিশ্চিতে কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। পতিত ও অনাবাদী জমিকে আবাদী জমিতে পরিণত করতে হবে। সরকার নদী খননের মাধ্যমে একসময় নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া কৃষিজমি পুনরুদ্ধার করছে। এ উদ্যোগটি আরো সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা হলে ফসলী জমির পরিমাণ বাড়বে। ভর্তুকি ও কৃষিঋণ বিতরণের পরিমাণ এখনকার মতোই প্রতি বছর বাড়াতে হবে। শুধু জীবিকার জন্য নয়। কৃষিকে লাভজনক বিনিয়োগে পরিণত করতে হবে। তাহলে শিক্ষিত বেকাররা কৃষিকাজে আরো আগ্রহী হবে। এতে জমির উত্পাদনশীলতা বাড়বে। এজন্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প স্থাপনকে ব্যাপকভাবে উত্সাহিত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে শিল্প স্থাপিত হলে উত্পাদনের ভরা মৌসুমেও কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাবে। উত্পাদন বাড়াতে আগ্রহী হবে। সরকার কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নগদ সহায়তা দিচ্ছে। রপ্তানিমুখী প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বাড়ানোর লক্ষ্যে এ প্রণোদনা অব্যাহত রাখতে হবে। এ প্রচেষ্টা আরো জোরদার করতে হবে। কৃষিখাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার পুরোটা আহরণ করতে হবে। জনগণের খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিতে এর কোনো বিকল্প নেই।