পাকিস্তানে আয়কর প্রদানে ব্যাপক অনীহা
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:২৫
পাকিস্তানের জাতীয় কবি মুহাম্মাদ ইকবাল বিশ্বাস করতেন, নিজেদের উন্নতির স্বার্থেই উপমহাদেশের মুসলমানদের একত্রিত হওয়া প্রয়োজন। জাতিসত্তার তীব্র অনুভূতি ছাড়া কী হতে পারে, সে সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘পর্বতও খড়কুটায় রূপ নিতে পারে এবং উড়ে যেতে পারে বাতাসে।’ কবিতা ও করের প্রসঙ্গ একসাথে বেমানান। কিন্তু এ দু’টির সম্পর্ক টানার চেষ্টা করেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্সের বিশ্লেষক এহতিশাম আহমাদ। পাকিস্তানে কর রাজস্ব ব্যবস্থা ধসে পড়েছে। দেশটির ঋণের পরিমাণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় অন্যদের সাহায্য ছাড়া। বিত্তবান রাজনীতিবিদ, শিল্পপতি, শহুরে ভদ্রলোক কিংবা কৃষিজীবী— সবার কথা ধরতে গেলে একটাই, অবশ্যই প্রত্যেকের আয়কর প্রদান করা উচিত কিন্তু আমার ওপর কর ধরো না। ওই পর্যায়ে আমি পড়ি না।
পাকিস্তানের কর কর্তৃপক্ষ ৭ লাখ ৬৮ হাজার লোককে চিহ্নিত করতে পেরেছে, যারা গতবছর আয়কর প্রদান করেছেন। কিন্তু বিস্ময়কর হলো— এমন লোকের সংখ্যা গত কয়েক বছর ধরেই কমছে। যে কারণে চলতি অর্থবছরে দেশটির প্রাক্কলিত কর রাজস্বের পরিমাণ জিডিপির মাত্র ৯.১ ভাগ। যা কিনা পৃথিবীর সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। পারমাণবিক অস্ত্র দখলে থাকা ১৮০ কোটি লোকের দেশ পাকিস্তানে আয়কর ফাঁকির প্রবণতা রয়েছে সব মহলেই। এমনকি অধিকাংশ সংসদ সদস্য পর্যন্ত ফন্দি-ফিকির করেন করের পরিমাণ কমিয়ে আনার জন্য। দেশের এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্বাধীন প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির সরকার গত ডিসেম্বরে বিতর্কিত একটি সংস্কারের উদ্যোগ নেন। একসঙ্গে চল্লিশ হাজার রুপি (৪০০ মার্কিন ডলার) দিলে কর ফাঁকি দেয়া লোকজনকে ক্ষমা করে দেয়ার প্রস্তাব দেয় সরকার। যুক্তি হচ্ছে, এর মাধ্যমে সরকারের তহবিল সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি বিস্তৃত হবে করের জাল। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন ভিন্ন কথা, ক্ষমা ঘোষণার মাধ্যমে জারদারি সরকার রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাচ্ছে। কর ফাঁকি দেয়া লোকদের ক্ষমা করে দেয়ার প্রকল্পটি কেন্দ্রীয় রাজস্ব বোর্ডের (এফবিআর) প্রধান আলি হাকিমের মস্তিষ্কপ্রসূত। কে কতো আয় করতে পারে, সে সস্পর্কে তার কম্পিউটারে খুব বেশি তথ্য নেই। এর বদলে খরচের ধরন ও লাইফস্টাইল সম্পর্কিত উপাত্ত নিয়েই তিনি বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করেন। এফবিআর ১৭০০ চলক নিয়ে কাজ করে, যেগুলো একজন ব্যক্তির কর দায় সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্লুই স্বচ্ছ নয়। কিছু জিনিস সুনিশ্চিত, যেমন— বিদেশ ভ্রমণ, বাড়ি কোন এলাকায়, গাড়ি ক্রয় ইত্যাদি। এফবিআর-এর বিশ্লেষণে দেখানো হয়, অবিবাহিতদের চেয়ে বিবাহিতরা ধনী। দুই স্ত্রীর পুরুষেরা এখনো বেশি ধনী। আবার চার স্ত্রীর পুরুষেরা (পাকিস্তানে মুসলমানরা সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে করতে পারে) এক স্ত্রীর পুরুষদের তুলনায় গরীব।
আলি হাকিম স্বীকার করেছেন, পাকিস্তানে অধিকাংশ লোকই আয়কর ফাঁকি দেয় কর পরিদর্শকদের ঘুষ দেয়ার মাধ্যমে। তিনি কম্পিউটারকে আয়কর পরিশোধের ব্যাপারে বলপ্রয়োগকারী হিসেবে দেখতে চান। তার মতে, পাকিস্তানের অন্তত ৩০ লাখ লোকের আয়কর প্রদান করা উচিত। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, কর পরিশোধ করে নির্দায় সনদ নেয়ার জন্য ৭৫ দিনের সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। অন্যথায় তাদেরকে আইনের হাতে সোপর্দ করা হবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এফবিআর সব কর পরিহারকারীদের চিহ্নিত করে পুরো অর্থ পরিশোধের কথা বলছে না কেনো? এ প্রশ্নের উত্তর তারা সরাসরি না দিয়ে বলছে, এফবিআর নতুন উপাত্ত নিয়ে কাজ করতে চায়। কার কাছে কতো পাওনা, সে হিসেবের সময় এখন নয়। কেউ কেউ বলছেন, পিপিপির অনুসারী তেলবাজ ব্যবসায়ীরাই সরকারকে ৪০ হাজার রুপির সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাধ্য করেছে। সাবেক অর্থমন্ত্রী হাফিজ পাশার অভিমত, নতুন সিদ্ধান্ত অবৈধ সম্পদকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।
আলি হাকিম ও আজিজ পাশা দু’জনেই বলেছেন, পাকিস্তানে কর ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। পাকিস্তানে এমন অনেকেই রয়েছেন, যারা কর দিতে চান কিন্তু দিতে পারছেন না আইনগতভাবে বাধ্য নন বলে। তাছাড়া কৃষি কেন্দ্রীয় করের আওতাধীন নয়। কৃষিকে কেন্দ্রীয় করের আওতায় না আনার কারণ অধিকাংশ সংসদ সদস্যই হয় জমিদার শ্রেণীর নয়তো গ্রামীণ ভোটের ওপর নির্ভরশীল। আয়কর না দেয়ার পেছনে আরো কিছু কারণ রয়েছে। লোকজন করের বিনিময়ে সরকারের কাছ থেকেও অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। কিন্তু পাকিস্তানী সরকার প্রতিবেশী ভারতের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে সামরিক খাতে অত্যধিক ব্যয় করে। ফলশ্রুতিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে পারে না যথাযথভাবে। দেশটির বড় এক সমস্যা বিদ্যুত্ ঘাটতি। দেশের অনেক স্থানেই দিনে প্রায় ১৮ ঘন্টা বিদ্যুত্ থাকে না। যে কারণে বিদেশি বিনিয়োগও ঘটছে না প্রত্যাশিতহারে। বিদ্যুত্ সমস্যাসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগের অনেক শিল্প-কারখানা স্থানান্তরিত হচ্ছে অন্যান্য দেশে।
গত অর্থবছরে পাকিস্তানে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ছিলো জিডিপির ৮ শতাংশেরও বেশি। সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘাটতি দূর করার চেষ্টা করে। এতে উসকে যায় মুদ্রাস্ফীতি। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরের মাঝামাঝি সময়ে মুদ্রাস্ফীতির হার দু্ই অংকের ঘরে পৌঁছুবে। সবাই কর পরিশোধ করলে হয়তো পাকিস্তানে বাজেট ঘাটতি থাকতো না।
—দ্য ইকোনোমিস্ট অনুসরণে