বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালা

জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর অধ্যায় ২৮, অনুচ্ছেদ-১৩ অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত ৮ জানুয়ারি, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা)-এর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালা-২০১২ প্রণয়ন করেছে। বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবি পূরণে কর্মচারীদের এ চাকরি বিধিমালা মাইল ফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আশা করা যায় অচিরেই বেসরকারি শিক্ষকদের জন্যও চাকরি বিধিমালা প্রণীত হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক ইতোপূর্বে বিভিন্ন সময়ে জারি করা পরিপত্র বা বিধিমালার অসঙ্গতি বা অস্পষ্টতা নিয়ে ৩ নভেম্বর, ২০১২ তারিখে পত্রিকায় ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামপ্রতিক পরিপত্র : একটি পর্যালোচনা’ শিরোনামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। আশা করেছিলাম যে, কোনো বিধিমালা বা পরিপত্র জারির আগেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অসঙ্গতি ও অস্পষ্টতা নিরসনে সজাগ হবেন। এতে প্রণীত যে কোনো বিধিমালা বা পরিপত্র গ্রহণযোগ্য বা যুগোপযোগী হবে। সদ্য প্রণীত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিধিমালার ২ (ঙ) অনুচ্ছেদে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের যে কাঠামো দেওয়া হয়েছে তা অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শাখা ১০-এর ১৯ আগস্ট, ২০০৮ তারিখে শিম/ শা:১০/ ৪(২)২০০৭/৯১৫ সংখ্যক স্মারকে জারিকৃত আদেশের ৪-এর গ(৬) অনুচ্ছেদ এবং ৪ ডিসেম্বর, ২০১২ তারিখে ৩৭.০০.০০০০. ০৭১.০৪. ০০২ -১০০১ সংখ্যক স্মারকে জারিকৃত আদেশের ২-এর গ (৬) নম্বর অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে যে, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (নিম্ন মাধ্যমিক/ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, দাখিল মাদরাসা ও মাধ্যমিক পর্যায়ের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ কমিটিতে সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অথচ সদ্য প্রণীত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা)-এর তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালায় এর প্রতিফলন ঘটেনি। অনুচ্ছেদ ২ (ঙ)-এর iii-এ মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধিকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে এ প্রতিনিধি কে মনোনয়ন দেবেন তার উল্লেখ নেই। আবার অনুচ্ছেদ ২ (ঙ)-এর v-এ জেলা শিক্ষা অফিসার মনোনীত প্রতিনিধি (প্রধানশিক্ষক/ প্রধানশিক্ষিকা, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়) সদস্য হিসেবে থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৮ তারিখে ওএম/৬৬-ম/১১৯০১ সংখ্যক স্মারকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষমতা জেলা শিক্ষা অফিসারদের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ২ (ঙ)-এর v. অনুচ্ছেদটি তারই আলোকে করা হলেও ২ (ঙ)-এর iii অনুচ্ছেদটি নিষপ্রয়োজন বলে মনে হয়। তবে এর পরিবর্তে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার সদস্য থাকবেন এটি উল্লেখ করাই যুক্তিযুক্ত। যেখানে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগ কমিটির সদস্য সেখানে কর্মচারী নিয়োগ কমিটির সদস্য থাকবেন না তা বোধগম্য নয়। আবার এ কমিটিকে বিধিমালায় ‘নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ’ বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি। এটি শুধু বাছাই কমিটি মাত্র। অধ্যায় ৩-এর (ক) অনুচ্ছেদে পেশাগত অসদাচরণ ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গঠিত তদন্ত কমিটিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিনিধি থাকা আবশ্যিক হলেও প্রতিনিধি মনোনয়নের ক্ষমতা কার ওপর ন্যস্ত তার উল্লেখ নেই। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ)-এর শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতনভাতাদির সরকারি অংশ প্রদান এবং জনবল কাঠামো সম্পর্কিত ২০১০ (আগস্ট ২০১২ পর্যন্ত সংশোধিত) নির্দেশিকায় দাখিল মাদ্রাসার ক্ষেত্রে সহকারী গ্রন্থাগারিক ও অফিস সহকারী কাম হিসাব সহকারীর পদ না থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালায় এ দুটো পদকে সংযোজন করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে জনবল কাঠামো সংশোধন না করে চাকরি বিধিমালায় অন্তর্ভুক্ত এ দুটো পদে নিয়োগ দেওয়া যাবে কিনা? কর্মচারীদের সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩০ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে— বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যেখানে বয়সের কোনো সীমা নেই, এমনকি শিক্ষক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও যেখানে বয়সসীমা উল্লেখ নেই সেখানে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা ৩০ বছর করা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? তাছাড়া সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য বয়সসীমা ৩২ বছর পর্যন্ত শিথিল থাকলেও এ ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। হঠাত্ করে এ ধরনের সিদ্ধান্তে চাকরি প্রত্যাশী বেকার যুবদের মাঝে হতাশা নেমে এসেছে। বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা (গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি) প্রবিধিমালা-২০০৯ অনুযায়ী দাখিল মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটিতে অভিভাবক সদস্যের সংখ্যা ৫ জন (১ জন মহিলাসহ) হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের চাকরি বিধিমালায় তফসিল ২-এর গ-তে বেসরকারি মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদে অভিভাবক প্রতিনিধির সংখ্যা ১ জন উল্লেখ করা হয়েছে। ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধিমালা ২০০৯-এর সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক বলে মনে হয়। তাছাড়া কলেজ, বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদে তৃতীয়/চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ১ জন প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বোর্ড/ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধিমালা সংশোধন না করলে এটি সংশ্লিষ্ট বোর্ড/ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক অনুমোদিত হবে কিনা তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। সংশ্লিষ্ট বিভাগের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতামত নিয়ে এটি পরিমার্জন করে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বিধিমালাটি গ্রহণযোগ্য ও যুগোপযোগী হতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়