চট্টগ্রামে হেফাজতে নেতৃবৃন্দের ঘোষণা

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত টানা আন্দোলন

চট্টগ্রামে হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সরকার মুরতাদ নাস্তিকদের লালন পালন করছে। সরকার বাস, ট্রাকসহ যানবাহন বন্ধ করে দিয়ে নাস্তিকদের পক্ষ নিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত তৌহিদী জনতাকে ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করা না হবে ততক্ষণ তারা ঘোষিত ‘ইসলামী গণজাগরণ চত্বরে’ অবস্থান করবে। হেফাজতে ইসলাম নেতৃবৃন্দ নগরীর জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের সামনের ওয়াসা মোড় এলাকাকে ‘ইসলামী গণজাগরণ চত্বর’ হিসেবে ঘোষণা দেন। তারা বলেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই চত্বরে তাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। পুরো চট্টগ্রামকে অচল করে দেয়া হবে। কোনো গাড়ি চলবে না। দোকানপাট ও অফিস আদালত খুলবে না। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটিসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হেফাজতে ইসলামের কর্মী সমর্থকরা ওয়াসা মোড় এলাকায় সমবেত হতে থাকে। এখান থেকেই বাসে করে তাদের ঢাকায় যাওয়ার কথা। কিন্তু বাস মালিকরা বাসের জন্য দেয়া অগ্রিম টাকা ফেরত দেয়ায় তারা আটকা পড়েন। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঢাকায় লংমার্চ কাফেলায় গত বৃহস্পতিবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে ২৫০টি বাস রওয়ানা হয়েছে। গতকাল ফজরের নামাজের আগে ও পরে ২৩টি বাস রওয়ানা করে। সকাল ১০টা নাগাদ ওয়াসা মোড় এলাকা থেকে ৫৮টি বাস ছেড়ে যায়। ফটিকছড়ি থেকে ৩৭টি বাস ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়ে। গত বৃহস্পতিবার রাতে চকরিয়া এলাকায় হেফাজতের ১১টি বাস আটকে দেয়া হয়। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ১৮৪টি বাসের মালিক অগ্রিম বাবদ তিন লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ জানান, এরপরও চট্টগ্রাম থেকে গত কয়েকদিনে বিপুল সংখ্যক হেফাজত কর্মী ও সমর্থক ঢাকায় পৌঁছেছেন। হেফাজত কর্মী ও সমর্থকদের কাঁধে ব্যাগ ও মাথায় লংমার্চ ও হেফাজতে ইসলাম লেখা সম্বলিত কাপড়ের ব্যান্ড এবং হাতে লংমার্চের প্ল্যাকার্ড ছিল। কারো কারো হাতে ছিল জাতীয় পতাকা। তাদের ব্যাগে রয়েছে-পানি, শুকনো খাবার, চিড়া, মুড়ি, ধর্মীয় বই এবং কিছু কাপড়। হেফাজতে ইসলামের কর্মী সমর্থকদের জমায়েতের কারণে জুম্মার নামাজের সময় জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ উপচে ওয়াসা মোড়ের বিশাল এলাকায় নামাজ পড়তে হয়। মাথায় সাদা হেলমেট, হাতে লাঠি ও সাদা পোশাকধারী হেফাজতে ইসলামের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী সুশৃঙ্খলভাবে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে রাখেন। নগরীর লালখান বাজার থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত হাইওয়ে লেভেল সড়ক এবং ওয়াসা থেকে আলমাস সিনেমা মোড় পর্যন্ত পুরো এলাকায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মী সমর্থকদের সরব উপস্থিতি। এতে করে নগরীর প্রধান সড়কের মধ্যবর্তী স্থান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আশ-পাশ এলাকায় ব্যাপকভাবে যানজটের সৃষ্টি হয়। নগরীর একপ্রাপ্ত থেকে অন্য প্রান্তে পৌঁছাতে যানবাহনসহ লোকজনকে অলি-গলিতে ঘুরে যেতে হচ্ছে। সকাল থেকে হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের অবস্থান স্থলের পাশে পুলিশ ও র্যাব অবস্থান নেয়। তবে দুপুরে ইসলামী চত্বর সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের উপস্থিতিতে কর্মী সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। এ সময় তাদের ছোঁড়া পানি ভর্তি বোতলের আঘাতে এক পুলিশ সদস্য নাকে মুখে আঘাত লেগে আহত হন। হেফাজতে ইসলাম সমর্থক কর্তৃক বেসরকারি ’৭১ টেলিভিশনের স্থানীয় ও ঢাকার সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান লাঞ্ছিত হন। সকাল থেকেই জমিয়তুল ফালাহ মসজিদসহ ওয়াসা মোড় এলাকায় হেফাজতের কর্মী-সমর্থকদের জমায়েত শুরু হলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে লোকজনের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে মিছিল সহকারেও লোকজনকে আসতে দেখা যায়। এর মধ্যে হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে জামায়াত-শিবিরসহ সাধারণ লোকজনও আসে। জুমার নামাজের পর জমিয়তুল মসজিদ থেকেও লোকজন ওয়াসা মোড়ের ইসলামী চত্বরে জমায়েত হয়। হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। তারা মুরতাদ-নাস্তিকদের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিতে থাকে। তারা গণজাগরণ মঞ্চ ও সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ওয়াসার ইসলামী চত্বরে বিশাল সমাবেশস্থলে নেতৃবৃন্দ চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বাস-ট্রাক বন্ধ করে দেয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। নেতৃবৃন্দ বলেন, আল্লাহ-রসুলের বিরুদ্ধে অবমাননার জন্য শাস্তির বিধান সম্বলিত ধারা সংবিধানে সংযোজন না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবো। একই সাথে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস সংক্রান্ত ধারা সংবিধানে পুনঃসংযোজন করতে হবে। নেতৃবৃন্দ হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা বাস্তবায়নের দাবি জানান। নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন নয়। আল্লাহ-রসুলের প্রতি অবমাননাকারীদের শাস্তির দাবিতে আমাদের আন্দোলন। অথচ সরকার নিজেই দেশে অচলাবস্থার সৃষ্টি করেছে। নেতৃবৃন্দ সরকারকে তৌহিদী জনতার বিরুদ্ধে অবস্থান না করার আহ্বান জানান। একই সাথে চট্টগ্রামের মন্ত্রী, এমপি, সাবেক মেয়র, এবং কিছু কিছু ইসলামী দলকে হেফাজতে ইসলাম এবং এর আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক বক্তব্য দেয়া বন্ধের দাবি জানান। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র নায়েবে আমীর আল্লামা মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী, আল্লামা সুলতান জউখ নদভী, মাওলানা আল্লামা শাহ মো. তৈয়ব, মাওলানা ইলিয়াস ওসমানী, নূর মোহাম্মদ ইদ্রিস, মুফতি জসিম উদ্দিন, মাও. ইসমাইল জেহাদী, মাওলানা লোকমান ষোলকবহর ও আসিফ ফোরকান। গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ইসলামী চত্বরসহ তত্সংলগ্ন এলাকায় সমাবেশ চলতে থাকে। সমাবেশ চলার সময় বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও আয়োজকদের পক্ষ থেকে শুকনা ও প্যাকেটজাত খাবার, পানি সরবরাহ করা হয়। ওয়াসার পক্ষ থেকেও পানি সরবরাহ করা হয়।