ভাঙ্গায় হেফাজতের লংমার্চে বাধা

সংঘর্ষে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি খুন, আহত ২০

ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলায় গতকাল শনিবার হরতাল সমর্থনকারী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উপজেলার নাসিরাবাদ ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নওশের খান নিহত হন। এ ঘটনায় পুলিশসহ কমপক্ষে আরো ২০ জন আহত হয়েছে। আহতদের ফরিদপুর জেলা হাসপাতাল ও ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সংঘর্ষ থামাতে পুলিশ রাবার বুলেট এবং টিয়ারশেল ছোঁড়ে। বর্তমানে ওই এলাকায় তিন প্লাটুন পুলিশ সদস্য ও র্যাব মোতায়েন রাখা হয়েছে। জানা গেছে, শুক্রবার রাত থেকেই ভাঙ্গা ও এর আশপাশ এলাকা থেকে স্থানীয় মাদানীনগর মাদ্রাসায় অবস্থান নেয় হেফাজতের নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে নগরকান্দাসহ আশপাশ এলাকার হেফাজতের কর্মীরা নগরকান্দা এলাকায় অবস্থান নেয়। গতকাল সকালে হেফাজতের এই নেতা-কর্মীরা মাদানীনগর মাদ্রাসায় আগে থেকে জড়ো হওয়া অন্যান্য কর্মীর সাথে একত্রিত হতে নগরকান্দা থেকে রওনা দেয়। তারা মনসুরাবাদ-কান্দি সড়ক হয়ে ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক দিয়ে নসিমন যোগে ভাঙ্গার ওই মাদ্রাসার সামনে আসলে প্রথমে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পুলিশের সাথে বাক বিতণ্ডা চলাকালে সকাল ৮ টার দিকে আওয়ামী লীগ ও হরতাল সমর্থনকারীরা হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের উপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করলে হেফাজতের কর্মীরাও পাল্টা ইট পাটকেল নিক্ষেপ শুরু করে। এতে দুই পক্ষের অন্তত ১০ জন আহত হয়। এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও এর অংঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মী এবং হরতাল সমর্থনকারীরা পিছু হটে যায়। এরপরই ঢাকা-খুলনা মহাসড়কে মাদানীনগর মাদ্রাসার সামনে অবস্থান নিয়ে জায়নামাজ বিছিয়ে বসে জিকির শুরু করে মুসল্লীরা। অন্যদিকে ভাঙ্গা বিশ্বরোড মোড় সংলগ্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও হরতাল সমর্থনকারীরা অবস্থান নেন। এ অবস্থায় মুখোমুখি হয়ে পড়েন হেফাজত ইসলাম ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। উভয়পক্ষের মাঝখানে পুলিশ অবস্থান নিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসলেও আওয়ামী লীগের প্রায় ৫০ জনের মতো নেতা-কর্মী দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ফের সংগঠিত হয়ে রাস্তায় জায়নামাজ বিছিয়ে বসে থাকা হেফাজত কর্মীদের ওপর হামলা করে বেলা ১১ টার দিকে। এ সময় আওয়ামী লীগ কর্মীরা মাদানীনগর মাদ্রাসায় প্রবেশ করতে চাইলে বাধা দেয় হেফাজতের কর্মীরা। শুরু হয় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও হেফাজতের ত্রিমুখী সংঘর্ষ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, সংঘর্ষ চলাকালে নওশের খানসহ কয়েকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাদানীনগর মাদ্রাসায় ঢোকার চেষ্টা করে। এ সময় মাদ্রাসায় থাকা হেফাজত কর্মীরা তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করে। উভয়পক্ষের সংঘর্ষে নওশেরের মাথায় গুরুতর জখম হয়। তাকে মাদ্রাসা সংলগ্ন ফসলের ক্ষেত থেকে পুলিশ উদ্ধার করে ভাঙ্গা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় দফার ওই সংঘর্ষে পুলিশের এএসআই আবুল কালাম আজাদ, জিটিভির ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি শেখ মনির হোসেনসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের ১০-১২ জন আহত হন। আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলায় মাদানীনগর মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রও আহত হয়। সংঘর্ষের পর হেফাজতের কর্মীরা মাদানীনগর মাদ্রাসা ও ভাঙ্গা বিশ্বরোডস্থ পেট্রোল পাম্পের সামনে রাস্তায় ব্যারিকেড দেয়। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিপুল সংখ্যক পুলিশ-র্যাব সদস্য তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেয়। পরে হেফাজত কর্মীরা যার যার এলাকায় ফিরে যায়। পুলিশ মাদানীনগর মাদ্রাসা থেকে তিন ছাত্রসহ ভাঙ্গার বিভিন্ন স্থান থেকে ১২ জনকে আটক করেছে। আটকদের মধ্যে যাদের নাম জানা গেছে তারা হলেন ভাঙ্গার ইমদাদুল হক, হাবিবুর রহমান, সালথার তৈয়বুর রহমান, নিজামউদ্দিন, ইমাম হোসেন, কাশিয়ানীর পিয়ার আলী। গোটা এলাকায় র্যাব-পুলিশের টহল অব্যাহত রয়েছে। হামলা সম্পর্কে হেফাজতে ইসলামের ফরিদপুর জেলা শাখার আমীর মুফতি মোহাম্মদ ইছমতউল্যাহ বলেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণ লংমার্চে আওয়ামী লীগ ঢাল-সড়কি নিয়ে হামলা চালায়। আমাদের বেশ কয়েকজন ছাত্রকে কুপিয়ে মারাত্মকভাবে আহত করা হয়েছে।’ আওয়ামী লীগ নেতার নিহতের ঘটনাটি পরিকল্পিত বলে তিনি দাবি করেন। ভাঙ্গা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী হেদায়তুল্লাহ স্াকলাইন ইত্তেফাককে বলেন, ‘এটা আসলে হেফাজতে ইসলাম নয়, জামায়াতে ইসলামী। জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা আগে থেকেই মাদানীনগর মাদ্রাসায় লাঠি সোটা ও বড় বড় ছোরা নিয়ে অবস্থান করছিল। আমরা সকাল থেকেই অবস্থান নিয়েছিলাম যাতে জামায়াত-শিবির কোনো নাশকতা ঘটাতে না পারে। এক পর্যায়ে পাশের নগরকান্দা উপজেলা থেকে হাজার পাঁচেক লোক আসলে ওরা একত্রিত হয়ে আমাদের উপর চড়াও হয়। এ সময় সবাই দৌড়ে পালাতে পারলেও নওশের বালিতে পা আটকে পড়ে যায়। জামায়াত-শিবিরের ওই কর্মীরা তাকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে। ভাঙ্গা থানার অফিসার ইন চার্জ মো. দাদন ফকির ইত্তেফাককে বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ শটগানের ১১১টি গুলি ও ১২টি টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। ওসি জানান, আহত পুলিশ আবুল কালাম আজাদের অবস্থা গুরুতর। নিহত নওশের খান নাসিরাবাদ ইউনিয়নের শিকদারকান্দা গ্রামের চান মিয়া খানের ছেলে। সংসারে তার স্ত্রী ও তিন শিশু সন্তান রয়েছে। নওশেরের মৃত্যুতে তার বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। ময়নাতদন্তের জন্য তার লাশ ফরিদপুর জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় গতকাল রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত থানায় কোনো মামলা হয়নি।