শান্তিপূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল

প্রগতিশীল ২৩ সংগঠনের ডাকা দুদিনের ২৪ ঘণ্টার হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের ঢাকামুখী লংমার্চের প্রতিবাদে এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সারাদেশে হরতালের ডাক দেয় দেশের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল সংগঠনসমূহ। সম্মিলিত সাংস্কৃতিকজোট ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ ২৩ সংগঠনের ডাকে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। হরতালে দু’একটি ঘটনা ছাড়া কোথায় কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়নি। কোথাও ককটেল বিস্ফোরিত হয়নি, পোড়ানো হয়নি বাস। রিকসা ও সিএনজি চালিত অটোরিকসা ও কিছু প্রাইভেট যানবাহন ছাড়া কোন যানবাহন রাজধানীতে চলাচল করতে দেখা যায়নি। ঢাকা থেকে দূরপাল্লা বা স্বল্প দূরপাল্লার কোন গাড়ি ছেড়ে যেতে দেখা যায়নি। বাইরে থেকেও কোন গাড়ি ঢাকায় আসেনি। বিভিন্ন নৌবন্দরে চলাচলরত লঞ্চ স্টিমার বন্ধ ছিল। হরতালের কারণে রেল চলাচলও বন্ধ ছিল। হরতালে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে হরতালকারীদের সংঘর্ষ ও হামলা-পাল্টা হামলার ঘটনায় ফরিদপুরের ভাঙ্গায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা নিহত হয়েছেন। এছাড়া মহাখালীতে ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সমাবেশে হেফাজতে ইসলামীর মিছিল থেকে হামলা ও মঞ্চে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। এই হামলায় নির্মূল কমিটির বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হয়। এছাড়াও সারাদেশে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে হরতালকারীদের সঙ্গে। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ ২৩টি সংগঠন বৃহস্পতিবার এ হরতালের ডাক দেয়। বাম রাজনৈতিক দলগুলো, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, গণজাগরণ মঞ্চ এবং বেশ কিছু সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন এতে সমর্থন দেয়। তবে হরতালে কোন গণপরিবহন না থাকায় যাত্রীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গতকাল বিভিন্ন দাবীতে লংমার্চ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় হেফাজত ইসলামের পক্ষ থেকে। তাদের এ লংমার্চ উপলক্ষে ব্যাপক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে সরকার। বিশেষ করে জামায়াত শিবির এ লংমার্চের সুবিধা নিতে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটাতে পারে এ আশঙ্কায় সারাদিন রাজধানীবাসীর মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ উত্কণ্ঠা ছিল। আর নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের আশঙ্কায় শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে হরতাল আহ্বান করে ২৩টি সংগঠন। তা চলে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত। মূলত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে নগরীতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদিকে শান্তিপূর্ণ হরতালে কোথাও কোন পিকেটিং চোখে পড়েনি। গাড়ি ভাঙচুরের কোন ঘটনাও লক্ষ্য করা যায়নি। পুলিশকে টিয়ারসেল বা অন্য কোন কিছু ছুড়তে দেখা যায়নি। তবে লংমার্চকে কেন্দ করে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে দেখা গেছে। পুলিশের পাশাপাশি র্যাব ও অন্যান্য বাহিনীকে টহল দিতে দেখা গেছে। হরতালে কোন প্রকার যানবাহন না থাকায় হেফাজত ইসলামের অনেক কর্মী সমর্থককে পায়ে হেঁটে মতিঝিলের সমাবেশে অংশ নিতে দেখা গেছে। হেফাজতের কর্মীরা নগরীর বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে সমাবেশে অংশগ্রহণ করলেও পুলিশ বা হরতাল আহ্বানকারীদের পক্ষ থেকে তাদের কোথাও বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটেনি। বরং বিভিন্ন এলাকায় বড় বড় মিছিল নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে তারা সমাবেশে অংশগ্রহণ করছে। এসময় পুলিশকে হেফাজতে ইসলামের সদস্যদের সহায়তা করতে দেখা গেছে। রাজধানীর গাবতলী এলাকায় ঘুরে দেখা যায় সেখানে দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ ছিল। স্বল্প দূরপাল্লার যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়নি। অধিকাংশ দোকানপাট বন্ধ দেখা যায়। পায়ে হেঁটেই যাত্রীদের গন্তব্যস্থলে যেতে দেখা যায়। তবে হরতালে যাতে কোন প্রকার নাশকতা হতে না পারে সেজন্য আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে অবস্থান নিতে দেখা গেছে। গাবতলী ও মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের সামনে, শ্যামলী, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন স্থানে তাদেরকে সতর্ক পাহারায় দেখা গেছে। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে লঞ্চসহ সব ধরনের নৌযোগাযোগ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। লংমার্চ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা শুক্রবার থেকেই। ফলে সেদিন থেকেই মূলত যান চলাচল কমে আসে। শুক্রবার সকাল থেকেই রাজধানীর সঙ্গে বাইরের জেলাগুলোর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। শনিবারও সন্ধ্যা পর্যন্ত এ অবস্থা অব্যাহত থাকে। এদিকে শনিবার সকালে প্রগতিশীল ২৩ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। বিক্ষোভ মিছিলটি প্রেসক্লাবের দিকে এগুতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় হরতালকারীরা মত্স্য ভবনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয়। এখানে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চের বিরুদ্ধে এবং জামায়াত-শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে শ্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। এসময় বক্তৃতা দেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি নাসির উদ্দিন ইউসুফ, সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, কবি মুহাম্মদ সামাদ, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহকামউল্লাহ প্রমুখ। এছাড়া খণ্ড খণ্ড মিছিল এসে যোগ দেয় এ সমাবেশে। এছাড়া হরতালকারীরা রাজধানীর ৪০টি স্থানে অবস্থান নেন। এ সময় তারা দেশাত্ববোধক গান ও কবিতা আবৃত্তি করে।