পশ্চিম সাহারা কি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য উপযুক্ত
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ২০:০৬
পশ্চিম সাহারা আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত আটলান্টিক মহাসাগর উপকূলবর্তী একটি বিস্তীর্ণ মরু অঞ্চল। উত্তরে মরক্কো, উত্তর-পূর্বে আলজেরিয়া, পূর্ব-দক্ষিণে মৌরিতানিয়া এবং পশ্চিমে এক হাজার কিলোমিটারের অধিক দীর্ঘ আটলান্টিক মহাসাগর উপকূল পরিবেষ্টিত এই মরু অঞ্চলটির আয়তন ২ লাখ ৬৭ হাজার বর্গকিলোমিটার।
মরক্কো থেকে আগত জনগোষ্ঠী এবং সাহারা আদিবাসী মিলে পশ্চিম সাহারার জনসংখ্যা তিন লক্ষাধিক। সাহারা আদিবাসী জনগোষ্ঠী সাধারণত বেদুঈন নামেই বেশি পরিচিত। আদি সাহারাবাসী বা বেদুঈন জনসংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার (২০০০ সালের হিসাব) যার মধ্যে প্রায় ৬০ হাজার লোক মরক্কোর ব্যবস্থাপনায় সাহারা মরুভূমিতে গড়ে ওঠা চারটি প্রধান উপশহরে বাস করে। অবশিষ্ট প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার লোক যুদ্ধ অব্দি আলজেরিয়ার টিনডুফ এলাকায় স্থাপিত শরণার্থী শিবিরে বাস করে। পশ্চিম সাহারার রাজধানী বা প্রধান প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের নাম লাইয়ুন। লাইয়ুন শহরের জনসংখ্যার অধিকাংশই মরক্কো থেকে আগত, তবে বেদুঈনদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।
স্পেন ১৯৭৫ সালে মরক্কো এবং মৌরিতানিয়ার সাথে মাদ্রিদে এক গোপন চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে পশ্চিম সাহারার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার কাছে হস্তান্তর করে এবং ১৯৭৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম সাহারা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেয়। পশ্চিম সাহারা থেকে স্পেনের প্রত্যাহারের আগেই মরক্কো ও মৌরিতানিয়া তাদের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির আওতায় নির্ধারিত অংশসমূহ নিয়ন্ত্রণের জন্য পশ্চিম সাহারা ভূখন্ডে তাদের সামরিকবাহিনী প্রেরণ করে সম্পূর্ণ পশ্চিম সাহারার দখল গ্রহণ করে নেয়। তাত্ক্ষণিক সাহারা আদিবাসীদের পক্ষে গঠিত পলিজারিও গেরিলাবাহিনী মৌরিতানিয়া এবং মরক্কোবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
পলিজারিও গেরিলাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ হাজার। বাহিনীর সদর দফতর আলজেরিয়ার রাবুনীতে। তাদের বেশিরভাগ অস্ত্র তদানীন্তন সোভিয়েত রাশিয়ার তৈরি এবং কিছু অস্ত্র মরক্কো সেনাবাহিনী থেকে জব্দকৃত। এদের বেশিরভাগ অস্ত্র যেমন মেশিনগান, বিমান বিধ্বংসী হালকা কামান, ট্যাংক বিধ্বংসী গান ও মর্টার ল্যান্ডরোভার বা টয়োটা জিপ ও পিকআপের উপর নিজস্ব প্রযুক্তিতে সংযোজিত। তাদের ভান্ডারে অন্যান্য অস্ত্রের মধ্যে টি-৫৪/৫৫ সাঁজোয়া যান, বিএমপি-১, বিএম-২১ এবং এসএ-৬, এসএ-৮, জেডএমইউ-২৩-৪ বিমান বিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে।
মরোক্কোবাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড পশ্চিম সাহারা এবং দক্ষিণ মরোক্কোর কিছু অংশের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে। মরোক্কোর প্রায় এক লাখ বিশ হাজার সৈন্য পশ্চিম সাহারায় অবস্থান করছে। সাউদার্ন কমান্ডের অধীনে তিনটি ল্যান্ড সেক্টর, একটি এয়ার সেক্টর এবং একটি নেভাল সেক্টর রয়েছে। সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী প্রতিটি ল্যান্ড সেক্টর সাবসেক্টরে বিভক্ত। প্রতিটি সেক্টর একটি ডিভিশন এবং প্রতিটি সাবসেক্টর সাধারণত একটি ব্রিগেড আকৃতির ফোর্স এবং প্রতিটি সাবসেক্টরে তিন থেকে চারটি ব্যাটালিয়ন রয়েছে। সাবসেক্টরের অধিনায়ক একজন কর্নেল পদবির সামরিক কর্মকতা। পশ্চিম সাহারায় মোতায়েন রয়েল মরক্কোবাহিনীর দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেক্টরসমূহ যথাক্রমে রয়েল মরক্কো এয়ার এবং রয়েল মরক্কো নেভাল সেক্টর। রয়েল মরক্কো বিমানবাহিনী এ অঞ্চলের একটি শক্তিশালী বিমানবাহিনী। ব্যাটল ফিল্ড ইন্টারডিকশনের জন্য ইউ এফ-১ যুদ্ধ বিমান এবং ক্লোজ এয়ার সাপোর্ট এর জন্য আধুনিক এই-৫ই যুদ্ধ বিমান রয়েল মরক্কো বিমানবাহিনীতে মজুদ রয়েছে। এছাড়া কার্গো ও সেনা পরিবহনের জন্য সি-১৩০ বিমান এবং হেলিকপ্টার ফ্লিটে পিউমা, গেজেলস, ইউ এইচ-১ এইচ এবং আমেরিকার বিখ্যাত চিনুক-৪৭ হেলিকপ্টার রয়েছে। পশ্চিম সাহারায় সাউদার্ন কমান্ডের আওতাধীন নেভাল সেক্টরের শক্তি মধ্যম পর্যায়ের। ছোট ছোট উপদলে কোস্ট লাইন বরাবর মোতায়েনকৃত মেরিন ফোর্সের মাধ্যমে নেভাল কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
প্রথমদিকে মরক্কোবাহিনীপলিজারিও বাহিনীর বিরুদ্ধে মোবাইল অপারেশন পরিচালনার কৌশল বেছে নিয়েছিল। কিন্তু এই কৌশল পলিজারিওবাহিনীর বিরুদ্ধে সফলতা অর্জনে ব্যর্থ হয়। পলিজারিওবাহিনীর ঘন ঘন আক্রমণের প্রেক্ষাপটে মরক্কো সেনাবাহিনী তাদের নিজস্ব অবস্থানের চারদিকে প্রতিরক্ষা বুহ্য তৈরি করে পলিজারিওবাহিনীর আক্রমণ নত্স্যাতের কৌশল গ্রহণ করে। কৌশলটি কার্যকর প্রমাণিত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৮০ ইং সালে মরক্কো সেনাবাহিনী ২৪শ’ কিলোমিটার লম্বা একটি প্রতিরক্ষা বাঁধ তৈরি করে যা মরক্কো ওয়াল নামে পরিচিত। বাঁধ তৈরির পর মরক্কোবাহিনী পশ্চিম সাহারায় তাদের ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট সেনা অবস্থান পরিত্যাগ করে বার্মের ভিতরে নিজস্ব অবস্থানের পুনঃ বিন্যাস করে। মরুভূমির বালু ও পাথরে তৈরি একটি বিশাল প্রতিরক্ষা বাঁধ বস্তুত পশ্চিম সাহারায় একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতির জন্ম দেয়। যুদ্ধের গতি মরোক্কো সেনাবাহিনীর পক্ষে চলে যায়। পলিজারিওবাহিনী বাঁধ অতিক্রম করে মরক্কোবাহিনীর ভিতরে ঢুকে আক্রমণ পরিচালনায় যথেষ্ট অকার্যকর হয়ে পড়ে।
মরক্কোবাহিনী এবং পলিজারিওবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধে মরক্কোবাহিনীর ৭ থেকে ১৫ হাজার সৈন্য এবং পলিজারিওবাহিনীর প্রায় ১ হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। এছাড়া মরক্কোবাহিনীর ২ হাজারের অধিক সৈন্য এবং পলিজারিওবাহিনীর প্রায় দুইশ’ যোদ্ধা বন্দী হয়। মৌরিতানিয়ার প্রায় ২ হাজার সৈন্য এ যুদ্ধে প্রাণ হারায়। যুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার বেসামরিক লোক প্রাণ হারায় এবং ৬৫০ জনের মত বেসামরিক ব্যক্তি নিখোঁজ হয়। এ ছাড়া যুদ্ধকালীন ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ভূমি মাইনের আঘাতে প্রায় আড়াই হাজার লোক পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েছে।
২০১০ সাল হতে মরক্কো নিয়ন্ত্রিত সাহারা জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানা ধরনের আন্দোলন, প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হচ্ছে। বিশৃংখলা, সামরিক পরিকল্পনার অভিযোগে ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে পশ্চিম সাহারার প্রধান শহর লাইয়ুনের নিকটবর্তী সাহারা আদিবাসী শরণার্থী ক্যাম্পে মরক্কোবাহিনী হেলিকপ্টার ও জলকামান ব্যবহার করে।
একটি মরু অঞ্চল যেখানে কোন কৃষি কার্যক্রম নেই বা অন্য কোন বড় অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও ক্ষীণ, তেমন একটি ভূমির জন্য এত যুদ্ধ কেন? কিংবা পশ্চিম সাহারা কি আদৌ একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত? এই অবস্থায় পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশন সুষ্ঠু গণভোট অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাহারা সমস্যার একটি স্থায়ী সমাধানের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে পশ্চিম সাহারায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সামরিক অংশের প্রধান বা ফোর্স কমান্ডার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন মেজর জেনারেল পদবির কর্মকর্তা।