কোরীয় উপদ্বীপে অস্ত্র সমাবেশের নতুন স্নায়ু যুদ্ধ
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০১৩, ২০:০৭
এতদিন পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার রণহুঙ্কারের কোনো যোগ্য জবাব দিতে পারেনি দক্ষিণ কোরিয়া। এবার আর সেই খামতি রাখলেন না দেশটির প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন হাই। আর এভাবেই কোরীয় উপদ্বীপে অস্ত্র সমাবেশের স্নায়ু যুদ্ধ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
২০১০ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকারে থাকা একটি দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। বিনা উস্কানির সেই হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার চার নাগরিক। কিন্তু তখন সিউল প্রশাসনের তরফে কঠোর সমালোচনা ছাড়া বেশি কিছু শোনা যায়নি। কিন্তু এবার উত্তর কোরিয়ার রণহুঙ্কারের পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে সরাসরি যুদ্ধজাহাজ নামিয়ে প্রতি আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। হুমকির এ ধরন থেকে বোঝা যায়, এই তিন বছরে প্রস্তুতি বেশ ভালোমতোই নিয়ে ফেলেছে তারা। অন্তত দেশটির সংবাদ সংস্থা ‘ইওনহাপ’ বারবার আশ্বস্ত করছে দেশের বাসিন্দাদের, হামলা হলে প্রতিরোধ করতে পারবে দক্ষিণ কোরিয়া। গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়ার সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ প্রতিরোধ করতে দক্ষিণ কোরিয়া সাত হাজার ছয়শ’ টন ওজনের দু’টি সিজং ডেস্ট্রয়ার যুদ্ধজাহাজ পাঠিয়েছে। নৌ-পথ ছাড়াও উত্তর কোরিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্ত বরাবর ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ নির্ণায়ক রাডার ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে। ‘গ্রিন পাইন’ নামের এই ব্যবস্থায় অনেকটা এলাকাজুড়ে পর পর বসানো থাকে শক্তিশালী রাডারগুলো। ‘গ্রিন পাইন’ ছাড়াও ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের আগাম সতর্ক বার্তা দিতে তৈরি রাখা হয়েছে ‘পিস আই’ বিমান। মাটির বহু ওপর দিয়ে উড়তে থাকা এই বিমানের রাডার ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের সঙ্গে সঙ্গেই কম্পাঙ্কের পরিবর্তন ‘অনুভব’ করে খবর পাঠিয়ে দিতে পারে। এর ফলে হামলা আর অতর্কিত থাকে না। মাঝ-আকাশেই ধ্বংস করা যায় এগোতে থাকা ক্ষেপণাস্ত্রকে। এর আগে গত সপ্তাহেই দেশের পূর্ব উপকূলে মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সমাবেশ শুরু করেছে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধপরিস্থিতি ঘোষণা, হটলাইন যোগাযোগ ছিন্ন করা, পরিত্যক্ত পরমাণু চুল্লিকে নতুন করে চালু করার চেষ্টা— কোনো কিছুতেই ফল না হওয়ায় সত্যি সত্যি ক্ষেপণাস্ত্র সমাবেশের পথে এগিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার শাসক উন। বিদেশি কূটনীতিকরা উত্তর কোরিয়া ছেড়ে চলে যেতে চাইলেও সহায়তা করার কথাও বলে দিয়েছে সতর্ক করে দিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তাদের আর নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব হবে না।
দেশের পূর্ব উপকূলের একটি ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ কেন্দ্রে যে ক্ষেপণাস্ত্রকে তৈরি করতে দেখা গেছে সেটি ‘মুসুদান’। কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশনের তথ্য অনুযায়ী উত্তর কোরীয় এই ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। ক্ষেপণাস্ত্র সমাবেশের সঙ্গে সঙ্গেই প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়াম দ্বীপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্ত পোক্ত করার তোড়জোড় শুরু করে দিয়েছে মার্কিন সেনারাও। গুয়ামের ‘অ্যান্ডারসন বেস’ এই এলাকায় আমেরিকার সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি। গুয়ামের পাশাপাশি আলাস্কাতেও ১৪টি ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী ব্যবস্থাকে ‘তৈরি থাকার’ নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
যদিও এখনও পর্যন্ত ‘মুসুদান’ ক্ষেপণাস্ত্রর কোনো পরীক্ষামূলক উেক্ষপণ উত্তর কোরিয়া করেছে বলে জানা যায়নি, তবু সতর্কতার কোনো ঘাটতি রাখতে চায় না মার্কিন প্রশাসন ও তার ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ জাপান আর দক্ষিণ কোরিয়া। দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের দেখা গেছে সীমান্ত এলাকায় উত্তরের আক্রমণের মোকাবিলায় তৈরি হতে। সেখানে মোতায়েন মার্কিন সেনারাও রাসায়নিক যুদ্ধের মহড়া শুরু করে দিয়েছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে গুয়াম দ্বীপের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন জানিয়েছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই সেখানে ‘টার্মিনাল হাই অল্টিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ সিস্টেম বসিয়ে ফেলবে আমেরিকা। তবে পরিস্থিতি গরম হওয়ার পর থেকে উত্তর কোরিয়াকে নিজেদের ক্ষমতা দেখাতে দেরি করেনি আমেরিকা। আইজেনহাওয়ারের আমলে ব্যবহূত বি-৫২, রোনাল্ড রিগানের আমলের বি-২ এবং হালের জর্জ বুশের আমলের এফ-২২— সবই পাক খেয়েছে কোরীয় উপদ্বীপের ওপর। পিয়ংইয়ংকে চমকে দেয়ার মতো আর কোনো বিমান নেই আমেরিকার।
উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতা আসলে কতটুকু: এই ক্ষমতার আস্ফাালন নিয়ে কৌতূহল সবার। সেই ২০০৬ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত দাবি করছে— পরমাণু অস্ত্র তৈরি করে ফেলেছে তারা। সঙ্গে দূরপাল্লার এমন ক্ষেপণাস্ত্র, যা নাকি অনায়াসে পার করে ফেলতে পারে অর্ধেক পৃথিবী। আদৌ কি এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে পেরেছে উত্তর কোরিয়া? কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশনস-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, পাল্লার নিরিখে উত্তর কোরিয়ার হাতে এখন মাঝারি থেকে দূরের লক্ষ্যে আঘাত করার মতো চার ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত আঘাত করতে পারে নদং ক্ষেপণাস্ত্র। গোটা দক্ষিণ কোরিয়া তো বটেই, এমনকি জাপানের বেশ কিছুটা এলাকাও এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লার আওতায় পড়ে। তাপোদং-১ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার পর্যন্ত। অর্ধেক মঙ্গোলিয়া আর জাপানের সম্পূর্ণ এলাকায় আঘাত হানতে সক্ষম উত্তর কোরিয়ার এই ক্ষেপণাস্ত্র। ক্ষেপণাস্ত্র ‘মুসুদান’-এর পাল্লা চার হাজার কিলোমিটার। অর্ধেক রাশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছুটা অংশে (মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কাম্বোডিয়া) এই ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানতে পারে। তাপোদং-২ হলো উত্তর কোরিয়ার হাতে থাকা সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র। পাল্লা ছয় হাজার কিলোমিটার। গোটা ভারত-পাকিস্তান পার করে পশ্চিমে ইরান সীমান্ত পর্যন্ত এবং পূর্বে আমেরিকার মূল ভূখণ্ডে আলাস্কা পর্যন্ত পৌঁছে যেতে পারে এই ক্ষেপণাস্ত্র। তবে ১০ হাজার কিলোমিটার পাল্লা বিশিষ্ট যে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির দাবি করেছেন কিম জং উন, তা সত্যি বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। কাজেই সরাসরি মার্কিন ভূখণ্ডে আঘাত করার জায়গায় এখনও নেই পিয়ংইয়ং। তবু সাবধানের মার নেই। কখন কী করে বসেন অস্থিরমতি কিম জম উন, তা বলতে পারেন না কেউই। কেননা উত্তর কেরিয়ার ‘রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট’ যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। রাষ্ট্রের সর্বময় নেতা কিম জং উনের নির্দেশ সেখানে শেষ কথা। সে কারণে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার কাছে উত্তর কোরিয়ার সংসদের পরিচয় ‘রাবার স্ট্যাম্প পার্লামেন্ট’ নামে। সিদ্ধান্ত যা নেয়ার তা নেন পিয়ংইয়ংয়ের একমাত্র শাসক কিম জং উন। তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা তাতে সহমত পোষণ করেন মাত্র। সব শেষে সেই সিদ্ধান্তে পড়ে সরকারি সিলমোহর। ভয়টা সে কারণে সবচেয়ে বেশি।