মওদুদ ফখরুলসহ বিএনপির শীর্ষ ৮ নেতা কারাগারে

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসসহ বিএনপির শীর্ষ ১০ কেন্দ্রীয় নেতার জামিনের আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আমান উল্লাহ আমান ও রিজভী আহমেদ এই দুইজন আগে থেকেই কারাগারে ছিলেন। তারা কারাগারে থেকেই পুনরায় জামিন আবেদন করেন। গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের মামলায় এর আগে ১৫১ জন কেন্দ্রীয় নেতাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিলো। ফলে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় প্রায় সব নেতাই এখন কারা অন্তরীণ। ফলে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দেবে। এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের কারাগারে পাঠানোর প্রতিবাদে আদালত পাড়ায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। বিএনপি এ ঘটনার প্রতিবাদে আগামী ৯ ও ১০ এপ্রিল সারাদেশে সকাল সন্ধ্যা হরতালের ডাক দিয়েছে। বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন শীর্ষ নেতাদের কারাগারে প্রেরণের ঘটনাকে গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতির মাধ্যমে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে থাকায় বিএনপি নেতারা জামিন পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গতকাল রবিবার সকালে গাড়ি ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা ইত্যাদি অভিযোগে দায়েরকৃত সাতটি মামলায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে জামিনের আবেদন করেন বিএনপির ১০ জন কেন্দ্রীয় নেতা। এরা হলেন সাবেক উপরাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, বরকত উল্লাহ বুলু, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, আমানউল্লাহ আমান, রিজভী আহমেদ প্রমুখ। এর মধ্যে শেষোক্ত দুইজন কারাগারে থেকে জামিন আবেদন করেন। এদের মধ্যে কয়েকজন ছয়টি মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিলেন। দায়েরকৃত সাতটি মামলার মধ্যে তিনটিতে ইতিমধ্যে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ। মামলা তিনটির মধ্যে দুটি পল্টন থানার এবং একটি শাহজাহানপুর থানার। গত ২ মার্চ বিক্ষোভ মিছিলের সময় সংঘর্ষ এবং গাড়িতে আগুন ও ভাংচুরের অভিযোগে মামলাগুলো দায়ের করা হয়। পল্টন থানায় করা মামলায় ফখরুল, মওদুদ, গয়েশ্বর, আমান, নোমান, আলালসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। একই থানার অন্য মামলায় মওদুদ, গয়েশ্বর, আব্বাস, আমান, আলালসহ ৪৪ বিএনপি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। শাহজাহানপুর থানায় দায়ের করা মামলায় মওদুদ, ফখরুল, আব্বাস, নোমান, আলালসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে দেয়া হয় অভিযোগপত্র। গতকাল তারা মহানগর হাকিম শাহরিয়ার মাহমুদ আদনান, মোহাম্মদ সাইফুর রহমান ও আসাদুজ্জামান নূরের আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন জানান। আদালতে শুনানি হওয়া সাতটি মামলার মধ্যে পল্টন থানার ৪টি, রমনা থানার ২টি ও শাহজাহানপুর থানার ১টি মামলা রয়েছে। প্রথমে পল্টন থানার ২টি এবং শাহজাহানপুর থানার ১টি দ্রুত বিচার আইনের মামলায় শুনানি গ্রহণ করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শাহরিয়ার মাহমুদ আদনান। এ মামলাগুলোর অভিযোগপত্রগুলো আমলে নেয় আদালত। এরপর ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ সাইফুর রহমান পল্টন থানার ২টি ও আসাদুজ্জামান নূর রমনা থানার ২টি মামলায় আত্মসমর্পণপূর্বক জামিন আবেদনের শুনানি গ্র্রহণ করেন। আসামিদের পক্ষে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি, এডভোকেট আবদুর রেজ্জাক খান, এডভোকেট জয়নুল আবেদিন, এডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, এডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, এডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, এডভোকেট খোরশেদ আলম, এডভোকেট বোরহান উদ্দিন, এডভোকেট খোরশেদ মিয়া আলম প্রমুখ শুনানি করেন। শুনানিতে ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বলেন, গত ১০ মার্চ হাইকোর্ট আসামিদের ৪ সপ্তাহের জামিন মঞ্জুর করে। তারা সবাই হাইকোর্ট থেকে জামিনে আছেন। তারা জামিনের কোন অপব্যবহার করেননি। তিনি বলেন, আসামিদের মধ্যে ৩ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এছাড়া এরা দলের শীর্ষ নেতা এবং বয়স্ক। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ আদালতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে চিকিত্সারত থাকা অবস্থায় লন্ডন থেকে সরাসরি আদালতে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করেছেন। তাই তাকে জামিন দেয়া হোক। ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, এইসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। এসব মামলায় অপরাধের কোন উপাদান নেই। শীর্ষ নেতাদের হয়রানি করার জন্যই এইসব মামলায় আসামি করা হয়েছে। তিনি বলেন, আসামিরা বিএনপির শীর্ষ নেতা। তাদের অধিকাংশই বয়স্ক। জামিন পেলে তারা পলাতক হবেন না। রেজ্জাক খান বলেন, একদিনে একই ঘটনা নিয়ে একাধিক মামলা হতে পারে না। এটা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৮২ ধারায় এ ব্যাপারে বিধিনিষেধ রয়েছে। কিন্তু তা উপেক্ষা করে এই নেতাদের বিরুদ্ধে একই ঘটনায় একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে। তাই এই মামলা চলতে পারে না। তাদের জামিন মঞ্জুর করা হোক। সানাউল্লাহ মিয়া বলেন, বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা মিথ্যা ও বানোয়াট। এই মিথ্যা মামলায় বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এটা অন্যায়। মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, দ্রুত বিচার আইনের ৪ ও ৫ ধারায় যেসব অপরাধের কথা বলা হয়েছে সেটা এইসব মামলার আসামিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দ্রুত বিচার আইনের অধীনে দায়ের করা মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানোর চেষ্টা চলছে। আসামিদের জামিনের বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষে মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আবদুল্লাহ আবু ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শাহআলম তালুকদার, তাপস কুমার, মাহফুজুুর রহমান লিখনসহ প্রমুখ। তারা বলেন, তিনটি মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। এসব মামলার ঘটনার সঙ্গে আসামিদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তাই জামিন মঞ্জুরের কোন সুযোগ নেই। উভয়পক্ষের শুনানি গ্রহণ করে পৃথক তিনটি আদালত আসামিদের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে তাদেরকে প্রয়োজনীয় চিকিত্সা সেবা প্রদানের জন্য কারাকর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত। উল্লেখ্য, গত ২ মার্চ ও ৬ মার্চের ঘটনায় ঢাকার নয়া পল্টন, শান্তিনগর মোড়, মালিবাগ, বেইলি রোড, ভিকারুন-নিসা স্কুলের রাস্তায় ও শাহজাহানপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের কর্তব্য কাজে বাধা, হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর, গাড়ি ভাংচুরসহ ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় এ মামলাগুলো দায়ের করা হয়। বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বিক্ষোভ জামিন আবেদন খারিজ হওয়ার পর বিএনপিপন্থি শতাধিক আইনজীবী আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ মিছিল করেন। তারা এ সময় সরকার বিরোধী শ্লোগান দেন। আইনজীবীরা বলেন, মিথ্যা ও বানোয়াট মামলায় বিএনপি নেতাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এটা অন্যায়।