চট্টগ্রামে বন্ধ হয়ে গেছে অসংখ্য গার্মেন্ট এক্সেসরিজ কারখানা

হলমার্ক জালিয়াতির প্রভাব পড়েছে দেশের বিশেষ করে চট্টগ্রামের গার্মেন্ট এক্সেসরিজ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর। জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকের বিশাল অংকের টাকা বকেয়া পড়ে থাকার অজুহাত দেখিয়ে এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় ঋণপত্র বা এলসি’র টাকা ছাড় করছে না বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক। সারাদেশে এমন দেড় শতাধিক কোটি টাকার এলসি ব্যাংকগুলোতে আটকে রয়েছে। এতে এক্সেসরিজ কোম্পানিসমূহ বিদেশ থেকে কাঁচামাল আনতে ঋণপত্র খুলতে পারছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া শুল্ক বিভাগের হয়রানির কারণেও এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো বিপাকে পড়ছে বলে মালিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট এক্সেসরিজ এন্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোটার্স এসোসিয়েশন (বিজিএপিএমইএ) সূত্রে জানা যায়, সারাদেশে ১ হাজার ৩৪৩টি এক্সেসরিজ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে রয়েছে ১৫৬টি। তবে এর মধ্যে বর্তমানে ১২২টি চালু রয়েছে। বাকি ৩৪টি কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। চালুগুলোর মধ্যেও মাত্র ১৫/২০টি ছাড়া বাকিগুলোর অবস্থা খুবই করুণ। তবে ঢাকার প্রতিষ্ঠানসমূহ এ অবস্থা থেকে মুক্ত রয়েছে। প্রসঙ্গত, দেশের বিকাশমান গার্মেন্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ সকল এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু কিছুসংখ্যক অসাধু এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানের কারণে বিপুল সংখ্যক প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানের মালিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানসমূহ সাধারণত বন্ড কমিশনারেটের নিয়ন্ত্রণে কর্মকাণ্ড চালিয়ে থাকে। বন্ডের নির্দিষ্ট পরিদর্শকের অধীনে প্রতিটি এক্সেসরিজ কোম্পানির গুদামের স্টক ও রপ্তানির হিসাবসহ সার্বিক কর্মকাণ্ড তদারকি হয়ে থাকে। তারা জানান, স্থানীয় কোন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানকে পণ্য দেয়া হলে অনেক ক্ষেত্রে সাথে সাথে এলসি পাওয়া যায় না। এভাবে কিছু পণ্য চলমান থাকে। তবে কিছুদিনের মধ্যে এলসি পাওয়া যায়। শুল্ক গোয়েন্দাদের তাত্ক্ষণিক গুদাম বা স্টক পরিদর্শনের সময় অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের সঠিক হিসাব দেয়া যায় না। এই কারণে এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ মামলা, জরিমানাসহ নানা হয়রানির শিকার হয়। আবার বন্ড কমিশনারেটের পরিদর্শকরাও কারখানা পরিদর্শন করেন। এভাবে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে বার বার তল্লাশী কিংবা পরিদর্শনের কারণে সারাক্ষণ তাদেরকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে কারখানা মালিকদের। মালিকরা জানান, বিভিন্ন ব্যাংক লোকাল এলসি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ক্লিয়ার না করায় তাদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে। দেখা যায়, অনেক তদ্বির ও দেন দরবার করার পরও ৫/৬ মাস পেরিয়ে যায়, তবুও টাকা ছাড় করা হয় না। অন্য ব্যাংক থেকে ক্লিয়ারিং-এর টাকা পায়নি, পণ্য রপ্তানি হয়নিসহ বিভিন্ন ধরনের অজুহাত দেখানো হয়। ‘একসেপটেন্স’ থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়ে টাকা ছাড় না করা ব্যাংক আইনে অপরাধ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক থেকে টাকা কেটে নেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক তা করছে না বলে ভুক্তভোগী এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানের মালিকরা অভিযোগ করেছেন। এদিকে জানা গেছে, চট্টগ্রামে বিভিন্ন ব্যাংকে এক্সেসরিজ কারখানাগুলোর বর্তমানে ১২২টি লোকাল এলসি’র বিল আটকা রয়েছে। যার পরিমাণ প্রায় ৮৬ কোটি টাকা। একইভাবে ঢাকায় ১২০টি বিলের বিপরীতে ৯০ কোটি টাকা আটকা পড়ে আছে। বিজিএপিএমইএ-এর কাস্টমস এবং শিপিং বিষয়ক কমিটির কনভেনার লতিফুর রহমান আজিম ইত্তেফাককে বলেন, একদিকে ব্যাংকের হয়রানি। অপরদিকে কাস্টমসের হয়রানিতে পড়ে তাদের শিল্প প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে সব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে পূর্বের ন্যায় গার্মেন্ট এক্সেসরিজসমূহ আবার বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। ফলে আর্থিক ও সময় দুই ক্ষেত্রেই গার্মেন্ট মালিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বিজিএপিএমইএ-এর পরিচালক এম এ সবুর বলেন, কাস্টমস বন্ড কিংবা শুল্ক গোয়েন্দা যে কোন একটি প্রতিষ্ঠানকে তদারকিতে রাখা হোক। এতে হয়রানি কমবে। আবার প্রয়োজনে তিন মাস অন্তর অন্তর স্টক পরীক্ষা করার বিধান চালু করা যেতে পারে। এর মাধ্যমেও স্বচ্ছতা রক্ষা করা সম্ভব বলে তিনি জানান।