শুভ নববর্ষ ১৪২০
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:২২
নববর্ষ মানে নতুন বছর। বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি। আর মাস হলো নির্দিষ্ট কিছু দিনের সমষ্টি- কখনো ত্রিশ, কখনো একত্রিশ, আটাশ বা ঊনত্রিশ দিন; এমনকি বাংলা মাস কখনো বত্রিশ দিনেও আছে। তো, এই দিন-মাস বছরের হিসেবেই আমাদের সব কাজকর্ম চলে। আমাদের উত্সব-অনুষ্ঠান, হিসাব-নিকাশ চলে। দিন-মাস বছরের এই চলা যেন নদীর স্রোতের মতো। আমরা সবাই যেন এই স্রোতধারা বেয়ে এগিয়ে চলেছি সামনের দিকে। নতুন লক্ষ্যের দিকে।
নতুন বছর আমাদের সামনে অনেক আশা আর আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। মানুষের মন এমন যে, সেসব সময় নতুনের আগমনে খুশি হয়। নতুন আশায় বুক বাঁধে। ভবিষ্যতের জন্য শক্তি সঞ্চয় করে। তাইতো পুরো একটি বছর পর যখন নতুন বছরের নির্ধারিত দিনটি আসে তখন আমরা আনন্দে উদ্বেলিত হই। আমাদের মনকে জাগিয়ে তুলতে চাই নানামাত্রিক আনন্দ আর খুশির উপলক্ষ দিয়ে। দীর্ঘ একঘেয়েমির ক্লান্তি ও অবসাদের মধ্যে খুঁজে পেতে চাই বৈচিত্র্য আর নতুনত্বের আস্বাদ। এ রকম বৈচিত্র্য এবং আনন্দের উপলক্ষ আছে বলেই মানুষ নতুন উত্সাহ, শক্তি আর ক্রমাগত এগিয়ে চলার প্রেরণা পায়; যান্ত্রিক হয়ে যায় না তার জীবন।
বিভিন্ন দেশে নববর্ষ বা নতুন বছর পালনের প্রথা আছে। কিন্তু তা একই দিনে হয় না। দেশীয় রীতিনীতি, ধর্ম, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ইত্যাদির কারণে নববর্ষের দিন ভিন্ন ভিন্ন হয়; যদিও প্রতিটি দেশের নববর্ষকে ঘিরেই রয়েছে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আর তা হলো আনন্দ, উত্সব, গান-বাজনা, খাওয়া-দাওয়া, খেলাধূলা, উপহার প্রদান এসবই সেই আনন্দ প্রকাশের এক একটি মাধ্যম। এসব আনন্দের স্রোতধারায় তারা ধুয়ে-মুছে ফেলতে চায় পুরনো বছরের সব ব্যর্থতা, গ্লানি আর দুঃখ-কষ্টকে। ইউরোপ আমেরিকার দেশগুলোসহ পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, জাপান, কোরিয়া প্রভৃতি দেশে নববর্ষ উদযাপিত হয় পয়লা জানুয়ারি। চীন ও ভিয়েতনামের নববর্ষ ২০ জানুয়ারি ও ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে। সিংহলি ভাষায় শ্রীলঙ্কার নববর্ষের নাম বাক-১৩ ও ১৪ এপ্রিলের মধ্যে। ভারতের তামিলনাড়ুতে নববর্ষকে বলা হয় পুঠানদু, উদযাপনের তারিখ ১৩ বা ১৪ এপ্রিল। দেশটির আসাম, কেরালা, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব প্রভৃতি রাজ্যে এবং নেপাল ও থাইল্যান্ডের নববর্ষও ১৩ বা ১৪ এপ্রিল। একই রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও ভারতের অনেক এলাকায় নববর্ষ পালিত হয় ২৩-২৪ মার্চ। ইথিওপিয়ার নববর্ষ ১১ অথবা ১২ সেপ্টেম্বর। ইরানের নববর্ষের নাম নওরোজ, তারিখ ২১ মার্চ। তিন হাজার বছর আগে থেকে নওরোজ বা ইরানি নববর্ষ পালিত হয়ে আসছে। আফগানিস্তানের নববর্ষের নামও নওরোজ, পালিত হয় ২০ মার্চ। আরবি নববর্ষ ১ মহররম। বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষের দিন হলো প্রতিবছর পয়লা বৈশাখ-ইংরেজি ১৪ এপ্রিল। তবে বাংলাদেশের পার্বত্য এলাকার আদিবাসী ভাই-বোনেরা নববর্ষের উত্সব উদযাপন করে পয়লা বৈশাখের আগের দিন অর্থাত্ চৈত্রের শেষ দিন-ইংরেজি ১৩ এপ্রিল। তাদের ঐ উত্সবের নাম বৈ-সা-বী।
আমরা বাঙালিরা প্রতিবছর পয়লা বৈশাখ তারিখে উদযাপন করি বাংলা নতুন বছর-আনন্দ আর খুশিতে ভরা নববর্ষ। চৈত্র মাসের শেষ দিনটির বিদায়ে পরদিন যে সূর্যটি ওঠে তা প্রথম বৈশাখের সূর্য, নববর্ষের প্রথম দিনের প্রথম সূর্য্যোদয়। সারাদেশ মেতে ওঠে নতুন বছরের খুশিতে। ধনী-গরিবের ভেদ নেই; কে কোন ধর্মের মানুষ তাও জানার দরকার নেই। সবাই ছোটে বৈশাখী মেলায়। ঘুড়ি-নাটাই, পুতুল-বেলুন, মুড়ি-মুড়কি, নাড়ু-মোয়া, পাঁপর-জিলাপি, খাজা-গজা-শনপাঁপরি, রসগোল্লা-পানতোয়া, মালাই-খেরসাভোগ, দই-আইসক্রিম কি না থাকে মেলায়! পাশাপাশি থাকে পান্তা ইলিশ খাওয়ার ধুম, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, বানরের খেলা, টিয়া-ময়না পাখি দিয়ে ভাগ্যগণনা, ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতা আর জারি-মুর্শিদী বাউল গানের আসর। সব মিরে টইটম্বুর খুশির সাগর যেন। মেলায় আসা মিষ্টি ও খেলনাজাতীয় বিভিন্ন জিনিসের ওপর বড়দের চেয়ে ছোটদের আগ্রহই বেশি। বড়রা এসব সাধ্যমতো কিনে দেয় ছোটদের। হাসি ফোটায় তাদের মুখে। এভাবে ছোট-বড় সবাই ভুলে যায় অন্যসব না পাওয়ার কষ্ট, ব্যর্থতা। শুধু হাসি-খুশি আর আনন্দ তাদেরকে ঘিরে রাখে দিনভর।
বাংলা নববর্ষ বা বঙ্গাব্দের সূচনা হয় মোগল আমলে। মোগল সম্রাট আকবর (জন্ম: ১৫৪২ খ্রি, মৃত্যু: ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ) তখন ভারত শাসন করছেন। আমাদের বাংলাদেশের এই এলাকাও তখন আকবরের সাম্রাজ্যের অধীন। তো, কেন তিনি বাংলা সন বা বঙ্গাব্দের সৃষ্টি করলেন? সেটি করলেন প্রজাদের খাজনা পরিশোদের সুবিধার জন্য। জনগণ ফসলপাতি ঘরে তুলেই না তা বিক্রি করে রাজসরকারের খাজনা দেবে, তাই না? আগে অসময়ে খাজনা দিতে হতো বলে অর্থাভাবে মানুষজন বেজায় অসুবিধা আর কষ্টের মধ্যে পড়ছিল। তাই প্রজাদের অনুরোধে সম্রাট তার এক অফিসারকে নির্দেশ দিলেন এমন একটি বছরের সূচনা করতে, যে বছর শুরুর আগেই প্রজাদের ফসল কাটা এবং তোলা শেষ হয়ে যাবে; আর তারা নতুন বছরের প্রথম দিনেই খাজনা দিতে পারবে। সম্রাটের আদেশ পেয়ে তার অর্থ বিভাগের কর্মকর্তা আমির ফতেউল্লাহ শিরাজী অনেক ভেবে-চিন্তে ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে পয়লা বৈশাখকে বাংলা সনের প্রথম দিন নির্ধারণ করে বঙ্গাব্দের প্রবর্তন করলেন, যা কার্যকর হলো ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ অর্থাত্ সম্রাটের সিংহাসনে আরোহণের সময় থেকে। প্রজারা নির্দিষ্ট দিনে খাজনা দিতে শুরু করল। সেই উপলক্ষে চালু হলো উপহার বিনিময় আর মিষ্টিমুখ করানোরও, যা এখনো টিকে আছে। এখনো হালখাতা উপলক্ষে মিষ্টি খাওয়ানো আর গান-বাদ্যের চল আছে আমাদের দেশে। নববর্ষে উপহার দেয়ার রীতিও চালু আছে এখনো।
সম্রাট আকবর প্রজাদের খাজনা পরিশোধের সুবিধার জন্য যে বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন, তা এখন আমাদের জাতীয় উত্সব ও বাঙালির সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক উত্সব আর মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এটি এমনই একটি সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উত্সব যাতে সব ধর্মের, সব শ্রেণির মানুষ যোগ দিতে পারে। ছোট-বড়, নারী-পুরুষ সবাই প্রাণ খুলে আনন্দ উপভোগ করতে পারে।
নববর্ষ উপলক্ষে পয়লা বৈশাখ সবচেয়ে বড় মেলা বসে ঢাকার রমনা বটমূলে। ১৯৬১ সাল থেকে এখানে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হচ্ছে প্রতি বছর। বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় নববর্ষ উপলক্ষে ছোট-বড় ২৭০টি মেলা বসে বলে জানা যায়। এসব মেলার মাধ্যমে বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতির যেমন উজ্জীবন ঘটছে, তেমনি সবার মধ্যে তৈরি হয় সর্বজনীন এক অসাম্প্রদায়িক চেতনা।
শুভ হোক নতুন বছর ১৪২০ বঙ্গাব্দ। সবার হূদয় আলোকমালায় উদ্ভাসিত করে আমাদের মাঝে আসুক আনকোরা একটি বছর। সেই নব আলোকের ঝর্নাধারায় ধুয়ে-মুছে যাক পুরনো বছরের সব জঞ্জাল-নববর্ষের শুভাগমনের এই শুভলগ্নে এই হোক আমাদের সবার চাওয়া।