সা ক্ষা ত্ কা র
‘ফুল টাইম শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার মান উন্নত করা সম্ভব নয়’
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৩৩
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান অবস্থা, শিক্ষার মান, টিউশনি ফি ও সরকারের নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে ইত্তেফাক ক্যাম্পাসের সাথে কথা বলেছেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা ও উপাচার্য
অধ্যাপক ড. আবুল হাসান মুহাম্মদ সাদেক
ইত্তেফাকঃ দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান কেমন?
উপাচার্যঃ কোন দেশের উন্নয়নের জন্য শিক্ষার অধিক হারই যথেষ্ট নয়, বরং শিক্ষার মান উন্নত হতে হবে। প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার মান উন্নত রাখার কোন বিকল্প নেই। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের না হলে শিক্ষার্থীরা সেখানে ভর্তি হবে না। কারণ এখানে মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করে লেখাপড়া করতে হয়। সেখান থেকে ডিগ্রী নিয়ে যদি চাকরি পাওয়া না যায় বা ভাল চাকরি পাওয়া না যায় তাহলে সে বিশ্ববিদ্যালয় আর ছাত্র পাবে না। কাজেই বলা যায়, যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় এক যুগ ধরে টিকে আছে এবং সেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্র লেখাপড়া করে সে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানে উত্তীর্ণ। বাংলাদেশে অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় এক যুগের বেশী সময় ধরে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য অনেক ছাত্রের ভীড় থাকে এবং লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নির্বাচনের পর ছাত্র/ছাত্রী ভর্তি করা হয়। অর্থাত্ শুধু এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের উপর নির্ভর না করে তারা লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেয়। নিঃসন্দেহে বলা যায়, তাদের শিক্ষার মান উন্নত এবং স্বীকৃত। আমার জানামতে বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ মান রক্ষা করতে পেরেছে।
ইত্তেফাকঃ দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম শিক্ষকরা পড়ান। অথচ ফুল টাইম শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হচ্ছে দীর্ঘ সময় থেকে। আপনার মন্তব্য কি?
উপাচার্যঃ ফুল টাইম শিক্ষক ছাড়া শিক্ষার মান ধরে রাখা বা উন্নত করা কখনো সম্ভব নয়। কারণ ক্লাসের বাইরেও শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু জানার থাকে। তাদেরকে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা দেয়া প্রয়োজন। এ কাজ খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে সম্ভব নয়। কারণ তারা ক্লাস নিয়েই চলে যান। এ প্রসঙ্গে আমি আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে পারি। আমরা প্রথম থেকেই চেষ্টা করেছি যেন আমাদের শিক্ষা কার্যক্রম ফুলটাইম শিক্ষক দিয়ে হয়। এ প্রচেষ্টায় আমরা অনেকটা সফল হয়েছি। আমাদের কোন কোন ডিপার্টমেন্টে শতকরা শত ভাগই ফুলটাইম শিক্ষক। অন্যান্য ডিপার্টমেন্টেও প্রায় শতকরা আশি ভাগ ফুলটাইম শিক্ষক আছেন। তবে কোন কোন বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষকের অংশগ্রহণের প্রয়োজনে বাইরে থেকে কিছুসংখ্যক সিনিয়র শিক্ষক ক্লাস নিয়ে থাকেন। আর তারা সাধারণত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত। আমি মনে করি সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত ফুল টাইম শিক্ষকের উপর গুরুত্ব দেয়া। অনেকে তা করছেন। যারা এখনও এতে পিছিয়ে আছেন এ ব্যাপারে তাদের নজর দেয়া উচিত।
ইত্তেফাকঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সরকারের নজরদারি আরো বাড়ানো উচিত কিনা? এবং কেন?
উপাচার্যঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মানে স্বাধীনভাবে প্রতিযোগিতায় উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছার সুযোগ দেয়া। যেখানেই নিয়ন্ত্রণ থাকে সেখানে স্বাধীনতা হ্রাস পায় এবং দ্রুত গতিতে দৌড়ে যাওয়ার গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ডায়নামিক, গতিশীল হতে হলে যত বেশী সম্ভব স্বাধীনতা দেয়া উচিত। অর্থাত্ নিয়ন্ত্রণ যতটুকু কমানো সম্ভব তা করা উচিত। যে দিকটি খেয়াল রাখা উচিত তা হলো শিক্ষার মান। আর প্রতিযোগিতার বাজারে শিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধরে রাখার প্রয়োজন নেই। যারা ভাল মানের শিক্ষা দিতে পারবে তারাই টিকে থাকবে। উন্নত বিশ্বের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণায় বিষয়টিকে এভাবেই দেখা হয় এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদনের পর তাদের উপর নিয়ন্ত্রণ খুব কমই থাকে। আর কোন কোন দেশে মোটেই থাকে না।
ইত্তেফাকঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অতিরিক্ত টিউশন ফি শিক্ষার্থীদের বিপাকে ফেলেছে। টিউশন ফি আরো কমানো উচিত কিনা?
উপাচার্যঃ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশী হবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যয় সরকার থেকে আসে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিজের খরচে চলতে হয়। কাজেই টিউশন ফি থেকেই তাদের শিক্ষা ব্যয় চালাতে হয়। তবে আমি মনে করি টিউশন ফি নির্ধারণের ব্যাপারে আমাদের বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রাখা উচিত। এ প্রেক্ষিতে অতিরিক্ত টিউশন ফি’র অভিযোগটি বেশ কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায় প্রযোজ্য। তারা এত বেশি টিউশন ফি আদায় করেন যে, মধ্যবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তের কারো পক্ষে সেখানে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। এমনকি সাধারণ ধনীদেরও সেই শিক্ষা ব্যয় চালানো সম্ভব নয়। সমাজের শুধু অতি উচ্চ পরিবারের শিক্ষার্থীরাই সেখানে শিক্ষালাভ করতে পারে। আমি মনে করি সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারটি পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। কারণ এদেশের অধিকাংশ মানুষ হলো নিম্ন আয়ের।
ইত্তেফাকঃ ৫ ভাগ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পড়ানোর জন্য নিয়ম রয়েছে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় তা মানছে না। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী? আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কী এ নিয়ম মানছে?
উপাচার্যঃ এই দরিদ্র দেশে বিনামূল্যে দরিদ্র ছেলেদের লেখাপড়ার সুযোগ থাকা উচিত। আমার মনে হয় সকল বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই সে সুযোগ রেখেছে। এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ-এ বিনা মূল্যে দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। প্রত্যেক সেমিস্টারেই তাদের বৃত্তি দেয়া হয়। সরকার যদি কিছুটা ভর্তুকি দেন, তা হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে বিনা বেতনে আরো বেশি শিক্ষার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।
ইত্তেফাকঃ স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বিষয়ে আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্রগতি কতটুকু।
উপাচার্যঃ আমরা ঢাকার উত্তরার কাছাকাছি আশুলিয়ায় বিরাট আয়তনের নিজস্ব ক্যাম্পাস স্থাপনের কাজ করছি। নকশায়ন শেষ হয়েছে। সে নকশা অনুযায়ী নির্মাণের অনুমোদন হয়ে গেছে। আশা করি কিছুদিনের মধ্যেই নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে।