পহেলা বৈশাখ :কৃষি, কৃষক ও অর্থনীতির সমীকরণের সূত্র
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৩
২০১২ সালের জাতিসংঘের কৃষিবিষয়ক সংস্থা এফএও এবং বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে আমার চোখ আটকে যায়। প্রতিবেদনের তথ্য এমন যে, বাংলাদেশ একরপ্রতি ফসল উত্পাদন বৃদ্ধির হারে বিশ্বে শীর্ষ স্থানে উঠে এসেছে! বাংলাদেশে হেক্টরপ্রতি জমিতে গড় উত্পাদন চার দশমিক ১৫ টন, যেখানে বিশ্বে এর পরিমাণ তিন টনের কাছাকাছি। প্রযুক্তির অভাব, কৃষকের জ্ঞানের স্বল্পতা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, উত্তরাধিকার সূত্রে ভাগ হওয়া ক্ষুদ্র জমি এবং সর্বোপরি উন্নত বীজের অভাব সত্ত্বেও বাংলাদেশকে এই সাফল্য এনে দিয়েছেন এদেশের কৃষক। প্রতিবেদনটিতে বাংলার কৃষককে ‘উত্পাদনের কারিগর’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।
আমার চোখের কোণায় কিছুটা জল এসে জমা হয় যেন। হায় আমাদের কৃষক! বিশ্বের দরবারে তাঁরা আজ মহান, অনেক সম্মানিত। কিন্তু তাঁরা হয়তো এ ধরনের খবরই রাখেন না; জানেন না কিছুই। কিন্তু ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় একটা জয়লাভ মানেই খেলোয়াড়দের পুরস্কারের হিড়িক লেগে যায়। ছোট্ট এক ভূখণ্ডের ১৬ কোটি মানুষের জন্য খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করেও, বিশ্বের কাছে ‘উপচে পড়া খাদ্যের দেশ’ হিসেবে স্বীকৃতি এনে দিয়েও তাঁরা পুরস্কারজয়ী কেউ নন! কারণ তাঁরা কৃষক। অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কৃষক! তাঁরা লুঙ্গি পরা, রোদে গায়ে ঘামের গন্ধ জমে যাওয়া, বৃষ্টিতে গায়ের মাটিগুলো লেপ্টে থাকা জীর্ণ হতদরিদ্র মানুষ। ফসলের বাম্পার ফলনও তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পারে না। কারণ মহাজনদের টাকার ঋণের বোঝা বাড়তে বাড়তে কখনো কখনো তারা আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন। এগুলো আমরা কেউই জানি না। এগুলো আমাদের কাছে খবরেরও মর্যাদা পায় না।
হ্যাঁ, পাঠক, বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। আমি পহেলা বৈশাখ নিয়েই লিখতে বসেছি। পহেলা বৈশাখ, যার আদ্যোপান্ত পুরোটাই আমাদের এই কৃষি, কৃষক এবং কৃষি সমাজের অর্থনীতির সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। কৃষক তাঁর ফসল উত্পাদনের জন্য জমি তৈরি, বীজ রোপণ, চারা পরিচর্যা, পোকামাকড় থেকে ফসলকে রক্ষা করা, পাকা ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত সকল কাজই প্রকৃতির সঙ্গে জড়িত। মোদ্দা কথা, প্রকৃতির সঙ্গে সখ্য রেখেই, রোদ-হাওয়া কাজে লাগিয়ে কৃষক তার ফসলকে খাদ্যে রূপান্তরিত করেন। মুঘল আমলে এটিকে অনুসরণ করেই শস্য উত্পাদন এবং খাজনা আদায়ের মধ্যে একটা সমন্বয় সাধনের জন্য সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। অর্থাত্ নববর্ষ মানে নতুন এক ফসল চক্রের শুরু। তাই লেখার শুরুতে একটু চেষ্টা করলাম, আমাদের আজকের কৃষকের অবস্থা ও অবস্থানটা একটু জানতে এবং জানাতে।
চৈত্রসংক্রান্তির ‘আমানী’ উত্সব যেন সাম্যের বার্তা
অতীতে এখানে সংস্কৃতির সঙ্গে অর্থনীতির দৃঢ় যোগাযোগ ছিল। কারণ এই অঞ্চলের জাতীয় অর্থনীতি তথা কৃষিজাতদ্রব্য উত্পাদন ও বাণিজ্যের লেনদেন পহেলা বৈশাখের সঙ্গেই জড়িত। কৃষি এবং ফসলের মঙ্গলকে কেন্দ্র করে এখানে বেশকিছু আচার বা উত্সব চালু ছিল। কৃষিজীবী সমাজের পারিবারিক পর্যায়ে এধরনেরই একটি মাঙ্গলিক উত্সব ‘আমানী’। চৈত্রসংক্রান্তির দিবাগত রাতে একটি নতুন পাত্রে পানি ঢেলে সেটিতে আতপ চাল এবং একটি কচি পাতাওয়ালা চারা আমগাছের চিকন ডাল ভিজিয়ে রাখা হতো। সকালে বাড়ির সবাইকে সেই ভেজানো চাল খেতে দেওয়া হতো। লোকবিশ্বাস ছিল, এতে সারা বছর বাড়ির সবার মঙ্গল হবে, কৃষির ফলন বাড়বে এবং এর কোনো অনিষ্ট হবে না।
এই বিশ্বাস ধর্ম-গোত্র নির্বিশেষে সকলের মনেই থাকতো। তাই চৈত্রসংক্রান্তির এই আমানী উত্সব হিন্দু-মুসলমান সকলের উত্সবে পরিণত হয়েছে। একই উত্পাদনব্যবস্থায় সংস্কৃতিকে বিচ্ছিন্ন করা কঠিন। এই উত্সব তাই হয়ে উঠেছে সামপ্রদায়িকতার উর্ধ্বে সর্বজনীন এক উত্সব।
‘হালখাতা’ কিংবা মেলা হয়ে ওঠে ভাব বিনিময়
এবং ক্রয়-বিক্রয়ের উত্স
ধান-পাটের মৌসুমে ফসল বিক্রির টাকায় কৃষকরা পরিবারের সদস্যদের কাপড়-চোপড় এবং বছরের প্রয়োজনীয় জিনিস ক্রয় করতেন। তাই বাকিতে কেনাবেচা এবং নতুন ফসলি সনে প্রথম দিনে তা শোধ করা ছিল এক স্বাভাবিক রীতি। বছরের প্রথমদিন ব্যবসায়ীরা তাঁদের ক্রেতা-বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করে মিষ্টিমুখ করানোর মাধ্যমে সৌহার্দ্যপূর্ণ লেনদেনের জন্য নতুন হিসাবের হালখাতা খোলেন। আর তাই এই দিনটি হয়ে ওঠে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ের একটা উত্স। আজ পহেলা বৈশাখের উত্সব মানেই লাল-সাদার রঙের খেলায় বাঙালিরা নিজেদেরকে রাঙিয়ে তোলেন। এই রঙের সম্মিলন মূলত হালখাতার বৈশিষ্ট্যকেই প্রতিনিধিত্ব করে। লাল কাপড়ের মলাটে বাঁধাই করা শাদা কাগজের হিসাবের খাতাই ছিল ‘হালখাতা’।
পহেলা বৈশাখের সময় কৃষি, কৃষক, অর্থনীতি এবং ব্যবসাকে কেন্দ্র করে উত্সবের এখানেই শেষ নয়। নতুন বছরের নতুন ধান ঘরে তোলার পর শস্য সম্পদে সমৃদ্ধ কৃষকরা নানারকম পণ্যসামগ্রী আদান-প্রদানের উদ্দেশ্যে নদীতীরে, বৃক্ষছায়ায় অথবা পাহাড়ের পাদদেশে মিলিত হতেন। এভাবেই একসময় গ্রামীণ অর্থনীতিতে যুক্ত হয় মেলা। পুরো বছরের উপকরণ, দৈনন্দিন জীবনের রসদ যাবতীয় জিনিসপত্র এখান থেকেই সংগৃহীত হতো। পারস্পরিক ভাব বিনিময়, সমপ্রীতি এবং ক্রয়-বিক্রয়ের উত্স হিসেবে এই মেলাকে চিহ্নিত করা হয়।
প্রশ্নগুলো এসে যায়
ক) মানুষের মনস্তত্বকে বিক্রি করে কিংবা অন্যভাবে বললে বলা যায়, সারা বিশ্বের মানুষের যোগাযোগ বা সম্পর্কের বহুমাত্রিকতাকে কাজে লাগিয়েও যে বিলিওনিয়ার হওয়া যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেসবুক নির্মাতা মার্ক জুকারবার্গ তা দেখিয়ে দিয়েছেন। সেখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাংলাকে, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করা, ১৬ কোটি মানুষের খাবার নিশ্চিত করা এবং সর্বোপরি অসামপ্রদায়িক মিলন মেলা তৈরির কৃতিত্বটুকুও আমরা কৃষককুলকে দিতে নারাজ। এর পেছনের কারণটা জানার দরকার বোধ করছি। তবে কি প্রযুক্তির এই সর্ব আধুনিক সময়েও সমাজে জাতি, শ্রেণি, বর্ণ বৈষম্যের মতো মানুষের সঙ্গে মানুষের আদি ভেদাভেদগুলো থেকেই গেছে? বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় অসামপ্রদায়িক উত্সবের প্রচলনকর্তা কৃষক সমাজ নিজেরাই কি তবে শ্রেণি বৈষ্যম্যের শিকার?
খ) আমার সন্তানরা ধানগাছ চেনে না। তারা জানে মাছ থাকে ফ্রিজে! এভাবেই এক সময় হারিয়ে যাবে এই প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্বের কৃষক-পরিচিতি! আমরা সন্তানদের দেখাবো শহরের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট! তারা সেখানে বৈজ্ঞানিক পাত্র আর কলকব্জা দেখবে। তারা প্রকৃতি, মাটি, রোদ, বৃষ্টির খেলায় কৃষকের হাতে সবুজ ধানের গাছকে জানবে রূপকথার মতো করে। এই উদাসীনতার কারণটা অস্পষ্ট।
তরুণ প্রজন্মের চিন্তায় কৃষি ও কৃষক
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি তথ্য বা পরামর্শ কৃষকের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন একজন বাংলাদেশী নারী, কাশফিয়া আহমেদ। আর কাশফিয়ার সেই উদ্যোগের সুফল সরাসরি নিতে পারছেন বাংলাদেশের কৃষকরা। প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব এবং বিভিন্ন বিষয়ের তাত্ক্ষণিক সমাধান না পাওয়া এদেশের কৃষকদের জন্য বড় একটা সমস্যা। আবার অক্ষরজ্ঞান জানা কৃষকের সংখ্যাও খুব কম। এই বিষয়টি কাশফিয়া আহমেদ কৃষকদের সান্নিধ্যে থেকে বেশ বুঝেছিলেন। তিনি কৃষকদের তথ্য সহায়তায় এগিয়ে আসতে চেয়েছেন। তিনি চেয়েছিলেন, মুহূর্তেই কৃষকদের হাতে তার প্রয়োজনীয় তথ্যটি পৌঁছে দিতে।
অনেক চিন্তা-পালটা চিন্তার পর তিনি এ কাজে মুঠোফোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি লক্ষ করলেন, মুঠোফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান একটা নম্বর এবং কলসেন্টারের সুবিধা দেয়। ২০০৮ সালে তিনি এই বিষয়টাকেই কাজে লাগালেন। বাংলালিংকের সঙ্গে চুক্তি করে ‘জিজ্ঞাসা ৭৬৭৬’ একটি নম্বর উন্মুক্ত করলেন। কৃষকেরা ঘর বা খেত যে কোনো জায়গা থেকে এখন এই নম্বরে ফোনে কথা বলে তাত্ক্ষণিকভাবে সরাসরি পরামর্শ পাচ্ছেন। বিদেশ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেও কাশফিয়া দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁর জ্ঞানকে মাতৃভূমির প্রয়োজনে কাজে লাগিয়েছেন। আর সেটাও সবচেয়ে অবহেলিত ও বঞ্চিত জায়গায়। কাসফিয়া আহমেদকে অভিনন্দন।
পহেলা বৈশাখ-ই হোক প্রতিবাদের প্লাটফর্ম
পহেলা বৈশাখের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটগুলো জানতে গিয়ে মনের অজান্তেই অতীত চিত্রগুলোর সঙ্গে সমসাময়িক চিত্রগুলোর তুলনা হয়ে গেলো যেন! কৃষি সমাজের অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাঙালির এই বৃহত্ উত্সবে আমি শুনতে চাই কৃষকের কণ্ঠস্বর। পহেলা বৈশাখ-ই হতে পারে কৃষকের প্রতিরোধের দিন, প্রতিবাদের দিন, জাগরণের দিন।
ঢাকা