রাজধানীতে হরতালে বিক্ষিপ্ত ককটেল বিস্ফোরণ
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩২
রাজধানীতে বিক্ষিপ্ত ককটেল বিস্ফোরণ, যানবাহন ভাংচুর, সড়ক অবরোধ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্য দিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলের ডাকা ৩৬ ঘণ্টার হরতালের প্রথম দিন অতিবাহিত হয়। আটক নেতা-কর্মীদের মুক্তি এবং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবিতে ১৮ দল গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকে সারাদেশে ৩৬ ঘণ্টার লাগাতার এ হরতাল ডাকে। আজ বুধবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত হরতাল চলবে। তবে আদিবাসীদের বর্ষবরণ উত্সব বৈসাবি (বৈসুক, সাংগ্রাই ও বিজু) উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটি হরতালের আওতামুক্ত রাখা হয়েছে।
গতকাল হরতাল চলাকালে সকাল পৌনে ৯টার দিকে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর ধলপুর কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ছাত্রদল হরতালের সমর্থনে একটি মিছিল বের করে। এ সময় তারা একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশাকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ ও ধাওয়া করলে গাড়িটি উল্টে যায়। এতে চালকসহ চারজন আহত হয়েছেন।
অন্যান্য হরতালের তুলনায় রাজধানীতে গতকাল বেশি যানবাহন চলাচল করেছে। অধিকাংশ দোকানপাট খোলা ছিল। তবে ঢাকার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সায়েদাবাদ, গাবতলী ও মহাখালী থেকে দূরপাল্লার কোনো বাস ছেড়ে যায়নি। সহিংসতা রোধে পুলিশ-র্যাবসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে ছিল।
হরতালের সমর্থনে বিএনপির সংসদ সদস্যরা সকাল পৌনে ৯টায় সংসদ ভবনের পূর্ব টানেল চত্বরে মিছিল বের করেন। পরে তারা সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন। দলের পাঁচ নারী সংসদ সদস্যসহ ১২ জন এমপি এ মিছিল ও সমাবেশে অংশ নেন। তারা হলেন রাশেদা বেগম, শাম্মী আক্তার, নিলুফার চৌধুরী, রেহানা আক্তার, সৈয়দা আসিফা আশরাফি, হারুনুর রশিদ, মেজবাহ উদ্দিন, আবুল খায়ের ভুঁইয়া, এবিএম আশরাফউদ্দিন, গোলাম মোস্তফা, নাজিমুদ্দিন প্রমুখ। সকাল সাড়ে ১০টা পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করেন। এ সময় পুলিশ ছিল সতর্ক অবস্থানে।
বিএনপির সংসদ সদস্যরা সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে বলেন, সরকার মিথ্যা মামলা দিয়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করছে, দমন-নিপীড়ন চালাচ্ছে। তবে মামলা ও গ্রেপ্তার করে তাদের দমানো যাবে না। একই সঙ্গে বিএনপির সংসদ সদস্যরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি করেন।
সকাল ৬টায় যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে জামায়াত-শিবিরকর্মীরা মিছিল বের করার চেষ্টা করে। পুলিশ তাদের বাধা দিলে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এ সময় পুলিশ কয়েকটি ফাকা গুলি ছুঁড়লে মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ৬টায় মিরপুরের আনসার ক্যাম্প এলাকায় চারটি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। মিরপুর বাংলা কলেজের সামনে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের ব্যানারে একটি মিছিল বের করা হয়। পুলিশের বাধায় মিছিলটি ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে পেট্রোলের একটি বোতল উদ্ধার করে পুলিশ। সকাল ৭টার দিকে দক্ষিণ বিশিল এলাকায় হরতালের সমর্থনে মিছিল বের হয়। সকাল সোয়া ৭টার দিকে মিরপুর সাড়ে এগারো কাঁচা বাজার এলাকায় ঝটিকা মিছিল করে শিবির। পরে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল সাড়ে ৭টায় গাবতলীতে যুবদল মিছিল বের করে। মিছিল থেকে পুলিশের দিকে ঢিল ছোঁড়া হলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। সকাল ৭টার দিকে হরতালের সমর্থনে মিছিল হয় তেজগাঁও সাতরাস্তা এলাকায়। সকাল ৮টায় রামপুরা বনশ্রীতে যুবদলের কর্মীরা রাস্তার মাঝখানে ব্যানার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে। এ সময় একটি পিকআপ ভ্যান দ্রুত ওই এলাকা ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ধাক্কা লেগে আল আমিন নামের এক যুবক আহত হয়। সকাল পৌনে সাতটার দিকে মালিবাগ আবুজর গিফারি কলেজের গলি থেকে একটি মিছিল বের করে স্বেচ্ছাসেবক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ। এ সময় তারা তিনটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়।
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান সেলিমা রহমানের নেতৃত্ব সকাল সোয়া ৯টায় গুলশান-২ নম্বর সার্কেলের ৬২ নম্বর রোডে একটি ঝটিকা মিছিল বের হয়। এ সময় পুলিশ এগিয়ে এলে মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে সটকে পড়ে।
বিএনপি অফিস এলাকা ছিল নিথর দুদুকে নিয়ে পুলিশের টানা-হেঁচড়া
গতকাল ভোর থেকে রাত পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় এলাকা ছিল নিথর। শীর্ষ নেতারা একের পর এক গ্রেপ্তার হওয়ায় দলের কার্যালয় গতকাল ছিল নেতা-কর্মীশূন্য। হরতালের শুরুতেই সকাল ৬টা থেকে নয়াপল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয় পুলিশ ও র্যাব। কাছেই সাঁজোয়া যান, জলকামানের গাড়ি, প্রিজন ভ্যান মজুত রাখা হয়। কার্যালয়ের বন্ধ গেটের সামনেই অবস্থান নেয় সাদা পোশাকধারী গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা। সকাল ৮টার পর দলীয় কার্যালয়ে যান বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু। প্রবেশের সময় তিনি পুলিশের টানা-হেঁচড়ার মধ্যে পড়েন। পুলিশ প্রথমে তাকে কার্যালয়ে ঢুকতে বাধা দেয়। পরে তাকে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। ভেতরে ঢুকেই তিনি কলাপসিবল গেট আটকে ওপরে উঠে যান। তার আগে গেটের ভেতরে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন দুদু। তিনি বলেন, আমরা এ কোন দেশে বাস করছি? সরকার দেশটাকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। দেশে আর গণতন্ত্র নেই। সরকারের দমন-পীড়নে দেশবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। দুদু ছাড়া কার্যালয়ে সহ-দপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ জনি, নির্বাহী কমিটির সদস্য বেলাল আহমেদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-দপ্তর সম্পাদক আখতারুজ্জামান বাচ্চু ছিলেন।
এ কার্যালয়ের সামনে দায়িত্বরত পুলিশের মতিঝিল জোনের এডিসি মেহেদী হাসান সাংবাদিকদের বলেন, হরতালে যে কোনো ধরনের নাশকতা ঠেকাতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত। আন্দোলনের নামে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সেজন্য তাদের এ সতর্ক অবস্থান।