গ্রহণযোগ্য নির্বাচন পদ্ধতি ছাড়া সমাধান আসবে না
প্রকাশ : ০৯ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৩
বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভিন্ন ইস্যুতে উপর্যুপরি হরতাল কর্মসূচির কারণে জাতীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন উত্পাদনশীল খাত, রফতানিমুখী শিল্প, ব্যাংক-বীমা, পরিবহন, মানবসম্পদ রফতানিসহ সকল অর্থনৈতিক ভিত ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ অবস্থায় দাবি উঠছে আইন করে হরতাল বন্ধ করার। কিন্তু হরতাল বন্ধ করলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না।
দেশের রাজনৈতিক অবস্থায় স্থিতিশীলতা আনতে এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে ব্যবসায়ের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য সমস্যার গোড়ায় হাত দিতে হবে। দেশের রাজনৈতিক সমস্যা বেশিরভাগই তৈরি হয় জাতীয় নির্বাচনের আগে। তাই সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এমন একটি নির্বাচন পদ্ধতি করতে হবে। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে পারস্পরিক সমঝোতায় আসতে হবে। আর রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতায় না আসলে ব্যবসায়ীরা তাদের চাপ প্রয়োগ করে এটা করতে পারে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে দেশের গণমাধ্যমের বিশিষ্টজনদের সৌজন্য সাক্ষাত্ ও মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন সাংবাদিকরা। গতকাল রাজধানীর একটি ক্লাবে অনুষ্ঠিত এ সভায় সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআই সভাপতি কাজী আকরাম উদ্দিন আহমদ। সহ-সভাপতি হেলাল উদ্দিন আহমদের পরিচালনায় এতে বক্তৃতা করেন বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক, টেলিভিশনের মালিক ও প্রধান নির্বাহীরা।
সভায় সমকাল সম্পাদক গোলাম সরওয়ার বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থার অবসান না হলে আমরা বাঁচব না, দেশ বাঁচবে না। আর দেশ না বাঁচলে কিসের গণতন্ত্র? বর্তমান অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য ব্যবসায়ীরা অনশনের মত কর্মসূচি দিলেও তাতে কোন কাজ হবে না। এ পরিস্থিতি সামলানোর জন্য সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন সে বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। ক্ষমতাসীন কোন দলের অধীনে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন হয় না। তাই তত্ত্বাবধায়ক বা যে নামেই অভিহিত হোক—এমন ব্যবস্থার অধীনে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে।
তিনি বলেন, আমরা এক/এগার চাই না। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করবে না। এদিকে বর্তমানে পুলিশের ওপর যে হামলা হচ্ছে—তা রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর পরিকল্পিত হামলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এদিকে বিএনপি অফিসে যে হামলা হচ্ছে এবং বিএনপি নেতাদের যেভাবে দ্রুত বিচার আইনে বিচার করা হচ্ছে তাও ঠিক নয়। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। এ অবস্থা চলতে থাকলে দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে। বর্তমানে আর্থিক সূচক ইতিবাচক দেখাতে জিডিপি উল্লেখ করা হচ্ছে। কিন্তু আমরা জানি নানাভাবে হিসাব করা যায়। তাই জিডিপির হিসাব না করে সাধারণ মানুষ কিভাবে জীবন-যাপন করছে সেটা দেখার জন্য সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি।
বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, হরতাল দিন দিন ভয়ংকর হচ্ছে। আর এ হরতাল হচ্ছে নির্বাচন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। আমরা যদি নির্বাচন পদ্ধতি ঠিক করতে না পারি তাহলে কোন সমস্যারই সমাধান হবে না। আর ওই নির্বাচন পদ্ধতি ঠিক করার জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক দলকে চাপের মুখে রাখতে হবে। বর্তমানে আইনের শাসন ব্যহত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি ব্যবসায়ীদের শক্ত অবস্থান নেয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে হরতালের ক্ষতি থেকে রেহাই পেতে আগামী নির্বাচনে আগে উভয় দলের কাছ থেকে হরতাল না দেয়ার প্রতিশ্রুতি আদায়েরও আহ্বান জানান।
বৈশাখী টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুরুল আহসান বুলবুল বলেন, এফবিসিসিআই-এর সদস্যরা দুই নেত্রীর খুব কাছের লোক। তাই অলংকারীক আওয়াজ না তুলে কার্যকর ব্যবস্থা আপনারাই নিতে পারেন। যখন সুষ্ঠু রাজনীতি বন্ধ হয়ে যায় তখন অপরাজনীতি শুরু হয়। এখন দেশে অপরাজনীতি চলছে। এ অপরাজনীতি রুখে দিয়ে দেশকে গণতান্ত্রিক ধারায় রাখতে ব্যবসায়ীরা কার্যকরী পদক্ষেপ নিলে গণমাধ্যম তার সঙ্গে থাকবে।
আমাদের অর্থনীতির সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খান বলেন, এরশাদ সরকারের পতনের পর দুই রাজনৈতিক দল অনেক কাছাকাছি এসেছে। আমরা অস্থিরতা চাই না। দেশের বিশিষ্ট এক হাজার ব্যক্তির তালিকা তৈরি করতে এফবিসিসিআইকে অনুরোধ জানান তিনি। এসব নাগরিকরা অবস্থান কর্মসূচি দিলে দেশের অনেক সমস্যার সমাধান হবে। অন্যদিকে আগামী নির্বাচন কিভাবে হবে, এর সমাধান হলে আর কোন সমস্যা থাকবে না।
ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, প্রধান দুই দলের সংলাপ করে লাভ হবে না। ব্যবসায়ীরা প্রতিবাদ করলে কিছু হতে পারে।
সংবাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো চলে ব্যবসায়ীদের টাকায়। তাদের চাঁদা দেয়া বন্ধ করে দিলে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি হবে।
সংসদ সদস্য ও দেশটিভির চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান নূর বলেন, একটা দেশের গণতন্ত্র যখন পরিপক্ব হয় তখন নানারকম চাড়াই-উত্রাই পার হতে হয়। বাংলাদেশ এখন সেটা করছে। যখন যারা বিরোধী দলে থাকে তারা হরতালকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। আমরাও করেছি। তবে হরতাল দিয়ে সরকারের পতন ঘটান যায় না। এখন সময় এসেছে এটা উপলব্ধি করার। তিনি বলেন, দেশের অবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ক্ষমতাসীন দলের একটি বড় দায়িত্ব আছে। সে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিরোধী দলকেও দায়িত্ব পালন করতে হবে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক ম. হামিদ তার বক্তব্যের প্রথমেই প্রশ্ন তোলেন ক্ষমতা কি এতোই লাভজনক যে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বা টিকে থাকার জন্য এতো সমস্যা। আমাদের সুশীল সমাজকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, ক্ষমতা অলাভজনক, এটি সেবার জায়গা। এছাড়া শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
প্রথমআলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম হরতাল আহ্বানকারীদের উদ্দেশে বলেন, আপনারা হরতাল দিন আর যাই করুন বন্দর খোলা রাখতে দিন। রফতানির পথ পরিষ্কার রাখার বিষয়ে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার সম্পাদক মাহবুবুল আলম ও ইনকিলাবের নগর সম্পাদক যাকারিয়া কাজল বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই সমস্যার সমাধান করতে হবে।
এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা সম্পর্কে এফবিসিসিআইসহ বিভিন্ন ফোরামের উত্কণ্ঠা জানিয়ে প্রেস রিলিজ ও সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে হরতালের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরে এ ধরনের কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার জন্য রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকার ও বিরোধী দলকে বারবার অনুরোধ করা হচ্ছে। কিন্তু কোন কিছুই কাজে আসছে না। অস্থিরতা বাড়ছেই। হরতাল কার্যত প্রাণঘাতী কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। একদিনের হরতালে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এর মধ্যে শুধু পোশাক শিল্পে প্রতিদিন প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। হরতালে শিল্প-বাণিজ্যের ব্যাকওয়ার্ড ও ফরোয়ার্ড লিংকেজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একদিন হরতাল হলে শিল্প বাণিজ্য তিনদিন বন্ধ থাকার সমান ক্ষতি হয়। এছাড়াও শুধুমাত্র হরতালের কারণে দেশ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই বিরাজমান পরিস্থিতি এবং দেশের স্বার্থে আইন করে হরতাল বন্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, বিরোধী দলকে যেমন হরতাল ডাকা থেকে বিরত থাকতে হবে, তেমনি ক্ষমতাসীন দলকেও বিরোধী দলের ন্যায্য দাবি-দাওয়া পূরণে আন্তরিক হতে হবে। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সকল সমস্যার সমাধান করতে হবে। জাতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিশেষত প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি আপনারা একসঙ্গে বসে দেশ ও জাতিকে এই চরম ক্রান্তিকাল সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করতে সহায়তা করুন। দেশবাসীসহ আমরা ব্যবসায়ী সমাজ আপনাদের উভয়ের এ অবদান কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করব।