আলোকচিত্র প্রদর্শনী
সচেতন-সংবেদনার চিত্রকথা
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২১
হাওড়া থেকে যশবন্তপুর এক্সপ্রেসে চড়ে চলে যাই দক্ষিণে তামিলনাড়ুর দিকে। বাংলা ছাড়তে ছাড়তেই সবুজের রং পাল্টাতে শুরু করে। ওড়িশ্যা পর্যন্ত মোটামুটি সবুজটা পরিচিতির পরিসীমাতেই থাকে। কিন্তু অন্ধ্র থেকে শুরু হয় অপরিচিতির সবুজ এবং তামিলনাড়ুতে এসে সবুজকে আমি হারিয়েই ফেলি। বাংলার সবুজ নেই এখানে। আমাদের দেশে মসৃণ-মোলায়েম কলাপাতা-সবুজের যে কমনীয় বিস্তৃতি, ভারতবর্ষের দক্ষিণে এসে আর তা খুঁজে পাই না। তখন বুঝতে পারি—এ শুধু রঙের ব্যাপার নয়। দক্ষিণের তামিলনাড়ু অঞ্চলের মাটির বয়স সর্বোচ্চ আড়াই থেকে পৌনে তিন লক্ষ বছর। অথচ আমাদের এই বাংলার বয়স ১০-১২ হাজার বত্সর। একই আলো বর্ষিত হয় ওপর থেকে দিনের পর দিন বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী কিন্তু নানা রঙের যে প্রকাশ-বিকাশ তার উত্স মাটির গর্ভ। আলো ও মাটির পারস্পরিক সমীকরণ থেকেই যাবতীয় রঙের রসায়ন।
অনেক সময় অবাক হয়ে ভাবি, যে সবুজ বা যে রং আমি আমার চোখ দিয়ে দেখি, তা কি হুবহু আরেকজন বা সকলেই ঠিক একইভাবে দেখছে—আমার দেখা এবং অন্যদের দেখার ফল কি এক ও অভিন্ন! তখন চিকিত্সাশাস্ত্র আমাকে জানায় যে স্নায়ু বলে একটা জিনিস আছে। আমাদের বিশ্বকবির চোখে দেখা সবুজ নাকি প্রকৃত সবুজ ছিল না, সবুজকে তিনি সবুজ দেখতেন না। তবু তাঁর কবিতায় অনেক সবুজ এসেছে। প্রশ্ন হলো, কী সবুজ তিনি দেখে গিয়েছিলেন তাঁর দুচোখ দিয়ে?
সূর্য ডুবে গেলে কিন্তু সবুজ কালো হয়ে গেল। অন্ধকারে কোনো বৃক্ষকেই সবুজ বলা মুশকিল। আমরা বলি, আমাদের পূর্ব-অভিজ্ঞতার নির্ভরতায়। সকালের সবুজ আর সন্ধ্যার সবুজ এক নয়, দুপুরের সবুজ আর বিকেলের সবুজ আলাদা। বর্ষার সবুজ আর হেমন্তের সবুজ কি এক? শীতের সবুজ আর গ্রীষ্মের সবুজ কি পুরোপুরি এক! আসলে এসব প্রশ্ন কেবল উত্থাপনই করা যায়। আমি কেবল একটা রঙের প্রসঙ্গ নিয়ে অনেকটা দূর চলে এলাম।
এসব কথা ভাবছিলাম আলোকচিত্রী মউদুদুল আলমের ফটোগ্রাফি পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে। আলোকচিত্রীর মূল অবলম্বন তাঁর চোখ। যে চোখে পড়ে আলোর রশ্মি। আবার আঁধারও তাঁর অস্ত্র। মানে আলো আর আঁধার—দুটোই তাঁর উপাদান। কিন্তু এগুলো তো তিনি বানাতে পারেন না। অন্তত, মউদুদুল আলম প্রথম যখন আলোকচিত্রের অভিযাত্রী, তখন আজকের প্রযুক্তি, সম্পাদনা কিংবা কারিগরি চাতুর্য সে রকম সুলভ ছিল না। আশির দশকের গোড়ার দিককার সেই সময়টা সাদা-কালো এবং রঙিন ফটোগ্রাফির যুগ। আমরা রশিদ তালুকদার, নওয়াজিশ আলী, মঞ্জুর আলম বেগম, আল-মাজী—প্রমুখ চিত্রীর কাজ দেখছি পত্র-পত্রিকায় এবং প্রদর্শনীতে। তখন এত প্রদর্শনীও হতো না। আনোয়ার হোসেনের কয়েকটি প্রদর্শনী দেখেছি মনে পড়ে। মউদুদুল আলম এবং তাঁর সহযাত্রী আরও দুয়েকজন চট্টগ্রামে গড়ে তোলেন আলোকচিত্রশিল্পের আলয়।
আমি মউদুদুল আলমের অনেক ছবির উত্সাহী দর্শক। তাঁর একক ও যৌথ প্রদর্শনী এবং তাঁর নিজস্ব সংগ্রহের যথেষ্ট ছবি দেখে তাঁর সম্পর্কে একটা অধিগম্য ধারণা আমার মধ্যে তৈরি হয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই বলা যায়, এ দেশে সৃজনশীল আলোকচিত্রশিল্পের ঘরানায় মউদুদুল আলমের অবস্থানটি বিচার্য।
বাংলার প্রকৃতি, ইতহািস-ঐতিহ্য, জনজীবন, নৃ-বৈচিত্র্য—ইত্যাদি নানা উপাদানে সমৃদ্ধ তাঁর চিত্রশিল্পী। এ ছাড়া ভ্রমণপিপাসু চিত্রী মউদুদুল আলমের নিষ্ঠ পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে বহু দুর্লভ এবং আপাত মুহূর্তের চকিত ঘটনাধারা। স্থিরতার মধ্যেই যেসব চিত্র বাঙ্ময় ব্যক্ততায় যোগাযোগ তৈরি করে আমাদের সঙ্গে। সে চিম্বুক পাহাড়ের নিগর্স হোক কিংবা চকরিয়া-রাসুর জনজীবন কিংবা মুন্সীগঞ্জ-খাগড়াছড়ির জীবনবৈচিত্র্য। আমি মুগ্ধ হয়ে দেখি, তাঁর মুহূর্তকে বন্দী করবার তাঁর এই কৌশল। কী দেখি আমি? হয়তো স্থির হয়ে থাকা কয়েকটি ফ্রেম—কোনো শব্দের সঞ্চয় নেই, গতির উচ্ছ্ব্াস নেই, গতি এখানে স্থিরতায়অবরুদ্ধ। খাগড়াছড়ির এক অজানা চাকমা-বৃদ্ধার হুকো খাওয়ার ছবিটির কথা ধরি। আলোকচিত্রী আমাদের জানাচ্ছেন, তাঁর সঞ্চয় অপ্রতুল আলোর কথা। কিন্তু এই প্রাচীন মহিলার সমগ্র সত্তা তাঁর একার উপস্থাপনায় সমগ্র চাকমাজীবনের এক নীরব প্রতিনিধিত্ব হয়ে উঠেছে। অল্প একটু আয়তনে যে নৃ-বৈশিষ্ট্যসমূহ ধরা পড়ে তাতেই চিত্রটির চমত্কৃতি অনুভব করা যায়। তাঁর পোশাক, বয়সের স্থিতি, হুঁকোর উপস্থাপনা এমন এক জীবনের গল্প আনে, যে জীবন থেকে আমাদের অবস্থান বহু দূরে। কিংবা ধরা যায় পার্বত্য অঞ্চলের ‘পানি খেলা’ উত্সবের অদ্ভুত সব বর্ণিল ছবির কথা। যুগের পর যুগ এই উত্সব হয়েই চলেছে পার্বত্য অঞ্চলে। সমতলের মানুষ হয়তো তার খবরও রাখে না। মউদুদুল আলমের চিত্র পর্বতের আপাত সুদূর জীবনের সেই বৃত্ত থেকে উত্কলন করে আনে প্রাণের স্পন্দনকে, জীবন স্পন্দনের অনুপ্রেরণাকে। জলপাত্র থেকে জল ছুঁড়ে দেওয়ার জ্যা-সম রেখাটিকে পর্যন্ত চিত্রবন্দী করার চাতুর্যটুকুকে গুরুত্ব যদি না-ও দিই, তবু উত্সবের এই স্থির মুহূর্তগুলো আমাদের অনেক সম্পদ উপহার দিতে সক্ষম। চাতুর্য মউদুদুল আলমের আলোকচিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য তো বটেই; কোথাও আলোতে, কোথাও আঁধারে, কোথাও আরও আঁধারে, কোথাও স্থানিকতায় বা দূরত্বের উপস্থাপনায়, কোথাও বা রঙের উচ্চতা-ঊনতায় এবং সর্বোপরি পারিপার্শ্বিকতা ও প্রক্ষেপিত বস্তুর সমন্বয়সাধনের মধ্যে। আলোকচিত্র আমাদের যদি প্রদর্শনক্রিয়াতেই সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে হয়তো মউদুদুল আলমের এসব চাতুর্যের কোনো তাত্পর্যই থাকত না। একটি ছবির কথা বলতে পারি—এর বর্ণনায় দেখছি—‘জাহাজের ডেকে ঘুমোয় শ্রমিক। কড়া রৌদ্রের মানা তাকে পরেনি রোধ করতে। কাজ শেষে বিশ্রাম তো চাই-ই।’ আমার ধারণা এই বর্ণনাটুকুরও প্রয়োজন পড়ে না। শুধু ‘ঘুমের অবসর’ বললেই আমরা বুঝতে পারি পেছনে চিত্রবন্দী মোটা গ্রন্থিময় দড়ির প্রেক্ষাপটে কোন ঘুম ঘুমাতে পারে হাজার হাজার বছরের বাংলার শ্রমজীবিতাকে উপস্থাপন করা এই নাম-না-জানা মানুষটি!
কিংবা দুর্লভ হাসি উপহার দেওয়ার চকরিয়ার প্রত্যন্ত পল্লির আদিবাসী সেই রমণীর মুখ। আমরা হয়তো অনেকেই জানব না, তাঁর গলায় চড়ানো নল গামছাটি তাঁর নিজেরই তাঁতে বোনা, পশ্চাতে আবছা হয়ে থাকা তাঁর ঘরের কাঠামোর ইশারা তার প্রচীন ঐতিহ্যের মতো উদ্ভাসিত।
একটি লোক শীতের সকালে তার ছোট বাচ্চাটিকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বাজারে যাচ্ছে কিংবা যাচ্ছে কোথাও। এই ছবির নৈমিত্তিকতা থেকে নির্বিশেষের ব্যঞ্জনা নিষিক্ত করে মউদুদুল আলমের চিত্র। গ্রামের সরু পথ, ঝাপসা সকাল, পথের দুপাশের প্রান্তর, একটি একাকী বৃক্ষ এবং পশ্চাতে কুয়াশাও আকাশের বিশাল বিভ্রম এক অনিঃশেষ জীবনচক্রের মধ্যে আমাদের নিয়ে যায়। এ জীবন আটপ্রাহরিক, অপিচ এ জীবন ব্যঞ্জনাময়। শিল্পের দৃষ্টি এসব ছবিকে জীবনের শিল্পে পরিণত করে। শেষ পর্যন্ত মউদুদুল আলমের আলোকচিত্র এই বাংলার মানুষ, জীবন ও নিসর্গের কাব্যকথা। এগুলো আপাতদৃষ্টে টুকরো টুকরো কথা এবং এসবের আলো-ছায়ার পরতে পরতে রয়েছে কাব্যের সংবেদনা। সবমিলিয়ে মউদুদুল আলম আলো এবং ছায়ার এক সফল অনুবাদশিল্পী।
‘বাংলাদেশ মাই লাভ’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি শেষ হয়েছে গত ৫ এপ্রিল।