বিকল্পের উত্থাপন
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২২
অন্ধের দুরবিন
কামাল মুহম্মদ
প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা
মূল্য : এক শ বিশ টাকা
প্রকাশকাল : বইমেলা ২০১২
গ্রন্থটির উত্সর্গপত্রেই চোখ আটকে যায়। ‘সেদিনও ছিল না সে, হঠাত্ দেখি আমারই পাশে/ শুয়ে আছে ফুটফুটে মেয়ে; কত দিন স্বপ্নে এসে/ বাবা বলে ডেকে গেছে। এখন তো সে স্বপ্ন নয়/ আমাকে নিয়ে খেলা করে প্রতিদিন।/ আমারই ছোট্ট মেয়ে।/ পিছু পিছু আমিও যেন প্রজাপতি নিয়ে/ রোদ ধরতে রোদেলাকে ডাকি, দাঁড়াও মা-মণি।/ সত্যিই অবাক হয়ে ভাবি, এ যে আমারই মেয়ে!’ ঠিক এখান থেকেই উদয় হয় বোধের। রোদ ধরতে তিনি আসলে যা করছেন, তা কেবল একজন পিতার স্নেহসুলভই নয়, তারও অধিক কিছু; আর রোদেলাও কেবল তার সন্তান নয়। ভাবতে ইচ্ছে হয়, এই রোদেলা আসলে তার কবিতাও, অথবা সন্তানের সমার্থক হয়ে ওঠা কবিতা।
তার ক্ষোভও খুব মার্জিত। একবার চোখ দেওয়া যাক এই কবিতাটির দিকে :‘এখন আমাকে নিয়ে যারা আড়াল খোঁজে, আমি ফিরিয়ে দিই/ সেই আততায়ীদের যারা মুখোশের আড়ালে ঘুমিয়ে আছে/ তারা তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো আমাকে ডাকে ইঙ্গিতে/ আমি ধরিয়ে দিই ফিরে আসবার পথ, তারা চলে যায়’ (তারা চলে যায়)। স্পষ্টই বোঝা যায়, তার এই উপলব্ধিতে আক্রোশ নেই। কেবল নিজেকে আর লুণ্ঠিত না হতে দেবার জন্য যেটুকু প্রস্তুতি প্রয়োজন, তা-ই যেন কবি নিয়ে বসে আছেন।
দার্শনিকতার পাশাপাশি এবার তাঁর ব্যক্তি-অভিজ্ঞতা ও মন্ময়তার দিকে ফেরা যাক। কবিতাটির নাম ‘বোধ বিষয়ক’। এখানে স্পষ্টই তিনি বলেছেন, ‘দর্জি আমাকে বাবা ডাকে, আমি পিতা হতে পারি না’। বিষয়টিকে এভাবে দেখা যায়, একটি আস্ত কাপড় কেটে দর্জি যেভাবে খদ্দেরের মন রক্ষা করে, সেভাবেই সামান্য মমতাও সে বোধ করে না কাপড়খণ্ডটির প্রতি। কোনো কারণে দর্জি যদি কাপড়টিকে বাবা বলেও ডাকে, তাহলেও কি সেই সম্বোধনের পেছনে কোনো সন্তানের আবেগ থাকে? বোধহয় থাকে না। আর এ কারণেই হয়তো কবি দর্জির মুখ থেকে বাবা ডাক শোনার পরও স্নেহে আপ্লুত হতে পারেন না। কেননা তিনি জানেন এই সম্বোধনের পেছনে আবেগ নেই, যা আছে তাকে বড়জোর তোষামোদ বলা যেতে পারে।
একজন কবির মনোজগতের সাথে সাধারণ মানুষের মনোজগতের কিছুটা তফাত্ তো থাকেই। খুব সাধারণ ঘটনা, যা সাধারণ মানুষের কাছে নিতান্তই উপেক্ষণীয়, কবির কাছে হয়ে উঠতে পারে মহার্ঘ্য। হয়ে উঠতে পারে বেদনার, আনন্দের বা শ্লেষের। ‘হেই চল যাই চুরি দেখি’ কবিতাটির কথা প্রাসঙ্গিকভাবেই উঠে আসে।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধের দুরবিন’-এ, এক অসহায় বন্দীর কানে শোনা শেকলের ঝনঝন, জিভে লাগা স্বাদ, ত্বকে লাগা ছোঁয়া, নাকে লাগা গন্ধের তুমুল বিকল্পের উত্থাপন—একে সহসাই এড়িয়ে যাওয়া যায় না।