শেয়ার মার্কেটে অপ্রদর্শিত টাকা বিনিয়োগ

অন্যান্য দাবির পাশাপাশি শেয়ার বাজারে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের বিদ্যমান সুবিধা বহাল রাখার প্রস্তাব করিয়াছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি সিএসইর পক্ষ হইতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কাছে এই প্রস্তাব তুলিয়া ধরা হয়। সিএসই তাহাদের বাজেট প্রস্তাবে বলিয়াছে, অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের বিদ্যমান সুবিধা আগামী বাজেটে বহাল রাখা হইলে তাহা শেয়ারের চাহিদা বৃদ্ধি ও দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকে উত্সাহিত করিবে। কিন্তু এই ধরনের দাবি কতটা যৌক্তিক তাহা ভাবিয়া দেখা উচিত। শেয়ার বাজারের লেনদেনের দিকে তাকাইলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বার্ষিক টার্নওভার বা লেনদেন এর পরিমাণ ছিলো ১৪৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাড়িয়া গিয়া ২০১০ সালে দাঁড়ায় ৪০১ হাজার কোটি টাকায়। তাহার মানে লেনদেন এর পরিমাণ প্রায় তিনগুণ হইয়া গিয়াছিল। মোটা দাগে বলিতে পারি চাহিদা প্রায় তিনগুণ হইয়া গিয়াছিল। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে মোটামুটিভাবে একই ধরনের পরিবর্তন হইয়াছিল। প্রশ্ন হইলো কি এমন ঘটিয়াছিলো যাহার জন্য চাহিদা এমনভাবে বাড়িয়াছিলো। অনেক কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল শেয়ার মার্কেটে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ, সঞ্চয়পত্রের উপর সুদ কমানো এবং সুদের উপর করারোপ, জমি কিনিবার জন্য ঋণ প্রদান বন্ধ, শেয়ার কিনিবার জন্য ব্যাংক কর্তৃক শেয়ার ব্যবসায়ীদের মার্জিন ঋণ প্রদান, ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার মার্কেটে মাত্রাতিরিক্ত বিনিয়োগ ইত্যাদি। অন্যদিকে সরবরাহ বাড়াইবার আরেক কৌশল ছিলো পেইড-আপ মূলধন বাড়ানো, যাহাতে প্রকারান্তরে চাহিদা আরো বাড়িয়াছিলো। তাহার সাথে আরও ছিলো ১০০ টাকার শেয়ারকে ১০ টাকার শেয়ারে রূপান্তর। এইসব কারণে বিনিয়োগের বিভিন্ন বিকল্প উপায়ের মধ্যে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ সবচাইতে বেশি লাভজনক হইয়া ওঠে। ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত হইতে বিনিয়োগযোগ্য টাকা এই মার্কেটে আসিতে থাকে বৈধ ও অবৈধভাবে। শেয়ারের সরবরাহ বাড়াইয়া দামের সূচক নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া ছিল নীতিগত ভুল। উপরন্তু, এইভাবে শেয়ারের সরবরাহ বাড়াইতে গিয়া বুক বিল্ডিং পদ্ধতির অপব্যবহার হইয়াছিলো এবং প্রাইমারি শেয়ার ইস্যু, কোম্পানির সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন, শেয়ারের মূল্য নির্ধারণ, রাইট শেয়ার ইস্যু ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে অসংখ্য অনিয়ম হইয়াছিলো। আর এই অনিয়মগুলিই শেয়ার মার্কেটে বাবল তৈরি এবং ক্রাশের কারণ ছিলো। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে মার্কেট ক্রাশ করার পর চাহিদা কমিয়া গিয়া প্রায় বিশ/তিরিশ ভাগের এক ভাগ হইয়া গিয়াছে। অন্যদিকে, বাজারে শেয়ারের সরবরাহ বাড়িয়া প্রায় দেড় হইতে দুই গুণ হইয়া গিয়াছে। এখন দাম বাড়াইতে চাহিলে শেয়ারের চাহিদা বাড়াইতে হইবে অর্থের প্রবাহ বাড়াইয়া। সেই পরিমাণ চাহিদা বাড়িবে তখনই যখন এই বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়া আসিবে। বিনিয়োগের বিভিন্ন বিকল্প উপায়ের মধ্যে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ লাভজনক মনে হইবে। কাল টাকা সাদা করার মত কোন পলিসি এই মার্কেটকে টানিয়া তুলিতে পারিবে বলিয়া মনে হয় না।