হরতালে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ ভাংচুর বোমাবাজি, আহত শতাধিক
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪০
হরতাল চলাকালে গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে শিবিরের বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, ভাঙচুর, বোমাবাজি ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। সিলেটে র্যাব ও পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে শিবির কর্মীরা। ফরিদপুরে পিকেটারদের হামলায় ৬ বাসযাত্রী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আহত এক শিশুর অবস্থা আশংকাজনক বলে জানা গেছে। এছাড়া ফেনী, কুমিল্লা, জায়পুরহাট, নীলফামারীসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় পুলিশ সংগঠনটির অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। দলীয় সভাপতির মুক্তির দাবিতে শিবির দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা এই হরতালের ডাক দেয়। এছাড়া চট্টগ্রাম, নোয়াখালীসহ আরো কয়েকটি জেলায় দলীয় নেতৃবৃন্দের মুক্তির দাবিতে হরতাল পালন করেন স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা। খবর ইত্তেফাক রিপোর্টার, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের।
সাভার ঃ সকাল সাড়ে ৭টার দিকে হরতালের সমর্থনে শিবির কর্মীরা সাভারের নবীনগর এলাকায় অপেক্ষমান একটি শ্রমিকবাহী বাসে অগ্নিসংযোগ করে। এসময় সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ভাঙচুর করা হয় কমপক্ষে আরো ৪টি যানবাহন। রেডিও কলোনী বাসস্ট্যান্ডের অদূরে ২টি ককটেলের বিষ্ফোরণ ঘটনায় শিবির কর্মীরা। এসময় পুলিশ ১ রাউন্ড ফাঁকা রাবার বুলেট ছোড়ে। এছাড়া আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডমের পাশে ২টি ককটেল বিষ্ফোরিত হয়। আশুলিয়ার কুড়গাঁও এলাকা থেকে নুর মোহাম্মদ নামের এক শিবির কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে হরতাল প্রত্যাখ্যান করে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদের নেতৃত্বে স্থানীয় আওয়ামী লীগ মিছিল বের করে। অন্যান্য দিনের মতো ঢাকা-আরিচা, নবীনগর-কালিয়াকৈর এবং আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ছিল স্বাভাবিক। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমও ছিল স্বাভাবিক। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়।
চট্টগ্রাম ঃ বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ, গাড়ি ভাঙচুর ও মিছিল সমাবেশের মধ্য দিয়ে জেলায় বিএনপি ও শিবিরের পূর্ণদিবস হরতাল পালিত হয়েছে। আগের রাতে নগরীর বাদুরতলা এলাকায় শিবিরের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এতে গুলিবিদ্ধ দুই শিবির কর্মীসহ মোট আট জনকে আটক করে পুলিশ। নগরীর কোতোয়ালী থানার দেওয়ানবাজার এলাকা থেকে ককটেলসহ এক শিবির কর্মীকে আটক করা হয়। এছাড়া লাভলেন, ষোলশহর দুই নাম্বার গেইট এলাকায় কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর ছাড়া হরতালে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। হরতাল চলাকালে নগরীর নাসিমন ভবনসহ আশপাশের এলাকা মিছিলে- স্লোগানে মুখর করে তুলে বিএনপি নেতাকর্মীরা। এসব এলাকা দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল। বিকালে নাসিমন ভবনের সামনে নগর বিএনপি সমাবেশ করেছে।
সিলেট ঃ ঝটিকা মিছিল, সড়কে টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ ও হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জেলায় শিবিরের হরতাল শুরু হয়। সকালে নগরীর শাহী ঈদগাহে ঝটিকা মিছিল বের করে । রাস্তায় গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে অবরোধ করে শিবিরকর্মীরা। এ সময় তারা কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। র্যাব ধাওয়া করে এক শিবির কর্মীকে আটক করে। এ সময় তারা র্যাবের গাড়ীতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এছাড়া লামাবাজারে পুলিশের গাড়িতে হামলা চালায় শিবির। তারা জেলা পুলিশের একটি জিপ ভাঙচুর করে । পুলিশ সুপার শাখাওয়াত হোসেন পুলিশের গাড়িতে হামলার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে। এতে বিউটিসহ তিন পুলিশ সদস্য আহত হন। বেলা সাড়ে ১১টায় কোর্ট পয়েন্ট এলাকা থেকে ককটেলসহ শিবির সন্দেহে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। আম্বরখানায় র্যাবের গাড়ি লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোঁড়ে পিকেটাররা এ সময় একটি মোটর সাইকেলসহ চারজনকে আটক করে র্যাব।
ফেনীঃ হরতাল চলাকালে শহরের আল-জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদ্রাসায় পুলিশ ও র্যার অভিযান চালায়। দুই শিক্ষকসহ ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। ওই সময় পুলিশের সাথে শিবির কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। শিক্ষার্থীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করলে পুলিশ শতাধিক রাউন্ড শর্টগানের গুলি বর্ষণ করে। এসময় চার পুলিশসহ ১৪ জন আহত হন। এদের মধ্যে ৩ জন গুলিবিদ্ধ। এদিকে হরতাল চলাকালে পুরো শহরে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। পিকেটাররা রাস্তায় টায়ারে আগুন দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মুহুরীগঞ্জ এলাকায় পিকেটারা ৫টি কভার্ডভ্যান ভাঙচুর করে। পিকেটাররা শহরের শান্তি কোম্পানি সড়কে একটি সিএনজিতে আগুন দেয়।
ফরিদপুরঃ বোয়ালমারীর রামকান্তপুর এলাকায় যাত্রীবাহী লোকাল বাসে পিকেটারদের অতর্কিত হামলায় ছয় বাস যাত্রী আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে সোহান শেখ নামে ৬ বছরের এক শিশুর অবস্থা আশংকাজনক বলে জানা গেছে । শিশুটিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। হামলাকারীরা জামায়াত-শিবিরের কর্মী বলে জানা গেছে।
খুলনা ঃ হরতাল চলাকালে সকাল ৬টায় নগরীর শিরোমণি এলাকায় খুলনা-যশোর মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে ও টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ করে শিবির কর্মীরা। এসময় তারা একটি বাসসহ ৫টি ইজিবাইক ভাঙচুর করে। সকাল ৭টার দিকে ফুলতলা এলাকায় হরতাল সমর্থকদের একটি মিছিল থেকে ৬টি ককটেল বিস্ফোরিত হয়। এ সময় তারা হানিফ পরিবহনের একটি গাড়ি ভাঙচুর করে। একই সময় খুলনা মেডিক্যাল কলেজের সামনে নেতাকর্মীরা দু’টি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটায় ও ইজিবাইক ভাঙচুর করে ।
রাজশাহী ঃ জেলায় হেতেমখাঁ, শালবাগান ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল ফাটিয়ে শিবির পিকেটিংয়ের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। সকাল পৌনে ৭টায় শালবাগানে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রশিবির কর্মীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সংঘর্ষ হয়। এসময় পুলিশ কয়েক রাউন্ড টিয়ারসেল, রাবার বুলেট ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে। ৬টা ১৫ মিনিটে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনটি ককটেল ফাটিয়ে ঝটিকা মিছিল করে ছাত্রশিবির। একই সময় নগরীর দেবিশিং পাড়ায় ছাত্রশিবির ঝটিকা মিছিল ও রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে পিকেটিংয়ের চেষ্টা করে। এছাড়া নগরীর খড়খড়ি বাইপাস সড়কে দু’টি মালবাহী ট্রাক ভাঙচুর করে শিবির কর্মীরা। পুলিশ হেতমখাঁসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ১৫ জনকে আটক করেছে বলে মহানগর পুলিশ কমিশনার এস.এম মনির-উজজামান জানান।
দাউদকান্দি ঃ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনার কাঠেরপুল ও তীরচরের নিকট শিবিরের কর্মীদের সাথে পুলিশের গোলাগুলি, যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ সময় পুলিশ ১৬ রাউন্ড শর্টগানের গুলি ছুঁড়ে এবং ৬ শিবির কর্মীকে আটক করে।
জয়পুরহাট ঃ হরতাল চলাকালে শিবির-পুলিশ সংঘর্ষ, ৪১ রাউন্ড গুলি ও টিয়ার সেল নিক্ষেপ, ঢাকাগামী আন্ত:নগর ট্রেনের জানালা ও দরজার গ্লাস ভাঙচুর, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ৩টি অফিস এবং ২টি টেম্পু ও ২টি মোটর সাইকেল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় ট্রেন যাত্রীসহ আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১৫জন। অপরদিকে ১টি ককটেলসহ দুই জামায়াক কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ।
নোয়াখালী ঃ হরতাল চলাকালে বিএনপি ও শিবির নেতাকর্মীরা জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত পিকেটিং মিছিল সমাবেশ করে। দুপুরে জেলার কবিরহাট-সোনাপুর সড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে সড়ক অবরোধ করার চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সাথে তাদের ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এদিকে, হরতালে নাশকতা এড়াতে বুধবার রাতে বিভিন্ন থানা এলাকা থেকে পুলিশ বিএনপি’র ১০ জন ও জামায়াত-শিবিরের ১১ জনসহ ২১ নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করেছে।
রংপুরঃ নগরীর বিভিন্ন স্থানে ১০/১২টি যানবাহন ভাংচুর, টায়ার জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ ও কয়েকটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে হরতাল সমর্থনকারীরা। এদিকে নগরীতে হরতাল বিরোধী মিছিল করেছে জেলা আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল ও গণজাগরণ মঞ্চ।
ঝিনাইদহ ঃ বিষয়খালীতে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়েছে শিবির। আগুনে বাসটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। হরতালের শুরুতে ভোরে ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের বিষয়খালী বাজারে এ ঘটনা ঘটে। ঝিনাইদহের সহকারী পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেন।
টঙ্গীঃ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় শিবিরের গাজীপুর মহানগরীর ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সহ-সভাপতি নাজমুল ইসলাম, শিবির কর্মী ইলিয়াস আলী, তালহা বিন কাদের, মেহেদী হাসানকে আটক করেছে পুলিশ।
জলঢাকা (নীলফামারী)ঃ উপজেলার কালীগঞ্জ বঙ্গবন্ধু হাটে জামায়াত-শিবির ও আওয়ামী লীগের মধ্যে দফায়-দফায় সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে গুরুতর আহত স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ইয়াছিন আলীসহ ৩ জনকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এ সময় জামায়াত-শিবির কর্মীরা ৩টি মটর সাইকেল ও ১৫টি দোকান ভাঙচুর ও লুটপাট করে এবং ১টি মটর সাইকেল পুড়িয়ে দেয়। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে।
সাতক্ষীরাঃ পুলিশের সাথে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, পরিবহন ও মটর সাইকেল ভাংঙচুর, গাছের গুঁড়ি, ইট ফেলে ও টায়ার জ্বালিয়ে মহাসড়ক অবরোধ-এর মধ্য দিয়ে জেলায় শিবিরের ডাকা হরতাল পালিত হয়েছে। দুপুরে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ছাত্রশিবির ঝটিকা মিছিল করে। এ সময় কমপক্ষে ৬টি ককটেল নিক্ষেপ করে তারা। তবে এতে কোন ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এদিকে সদর উপজেলার ভাদড়ায় পিকেটিং করার সময় ২ জনকে বেধড়ক পিটিয়ে ও কুপিয়ে জখম করেছে জামায়াত-শিবির কর্মীরা। আহতরা হলেন সদর উপজেলা আগরদাড়ী ইউনিয়ন আ’লীগ সভাপতি হবিবার রহমান ও আ’লীগ কর্মী আব্দুল করিম সরদার।
বোদা (পঞ্চগড়)ঃ উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নে জামায়াত-শিবির ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে ৬ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে দুজনের অবস্থা গুরুতর। তাদের পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতাল ও বোদা উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। পিকেটিং করার অপরাধে পুলিশ মানিক নামে জামায়াত-শিবিরের এক কর্মীকে গ্রেফতার করেছে।