মু খো মু খি
গানের ভেতরেই আমার প্রতিদিনের নিশ্বাস
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ১৭:১৫
কেমন আছেন আপনি?
সবাই যেমন থাকে। প্রায় অবরুদ্ধ আছি। দেশের এই অবস্থায় সবাই শঙ্কিত। শিল্পী হিসেবে এটুকু বলতে পারি-অনেকগুলো শো বাতিল হয়েছে। সব ট্রেডেই ক্ষতি হচ্ছে। আমাদেরও তেমনি।
দীর্ঘদিন হলো রিটায়ার্ড করেছেন। কীভাবে আপনার এখন সময় কাটে?
একেবারে নিজের মতো করে। একান্ত অবসর। কাজের খুব একটা প্রেসার নিই না। প্রতিদিন প্রচুর গান শুনি। টিভিতে হরেক রকম শো দেখি। মেয়ের সাথে ফোনে কথা বলি। খুব সমপ্রতি তার বিয়ে হলো। তাই আমরা ঘরে টোনাটুনির অবসর।
কী ধরনের গান শোনা হয়?
বিভিন্ন ধরনের গান শুনি। এখন তো ইন্টারনেটের যুগ। তাই বিভিন্ন দেশের গান অনায়াসেই পেয়ে যাই। ইদানীং শুনছি পাকিস্তানি সুফি গানগুলো। তাদের ক্লাসিক্যালটা আবার একেবারেই আলাদা। আমাদের প্রত্যেকেরই প্রচুর গান শোনা উচিত বলে আমি মনে করি। কারণ আমি মনে করি, গানের জগতে একজন জাগজিত্ সিং বা একজন গোলাম আলী এমনি এমনি জন্মায় না। তারা সারাবিশ্বের মিউজিককে ধারণ করে নিজের মতো করে এক ধরনের সাংগীতিক মতবাদ তৈরি করেছেন।
কিন্তু আমাদের দেশে ক্লাসিক্যাল ঘরানার সেই অর্থে শিল্পী গড়ে ওঠেনি। বা উঠলেও আাামাদের মিডিয়া তাদের নিয়ে চর্চা করেনি।
না, ক্লাসিক্যাল শিল্পী আছে প্রচুর। কিন্তু এই যে গড়ে ওঠার জন্য ইনস্টিউশন, পারফর্ম করার জন্য প্ল্যাটফর্ম এগুলোও তো প্রয়োজন। তবে আমি আশাবাদী যে, এগুলো ধীরে ধীরে তৈরি হবে। আর আমাদের দেশের লোক গানের যে বিশাল রশদ আছে, তা উপমহাদেশ কেন, বিশ্বের অনেক দেশেই নেই। এটাকে ঠিক ঠাক মতো চর্চা করে এগুলেই আমি মনে করি, বিশ্ব সংগীতে আমাদের বিশাল অবস্থানে যাওয়া সম্ভব। হয়তো আমি দেখে যেতে পারব না। কিন্তু পরবর্তী জেনারেশন এই অবস্থানে বাংলা গানকে নিয়ে যাবে।
পরবর্তী জেনারেশন বলতে কি রিয়েলিটি শো থেকে প্রতি বছর বের হওয়া এই নবাগত শিল্পীদের কথা বলছেন? আপনি নিজেও তো বিচারকের আসনে কাজ করেছেন। এই রিয়েলিটি শোয়ের মিউজিক জেনারেশন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়নটা কেমন?
না এটাকে নিয়ে এত সিরিয়াসলি ভাবলে হবে না। তবে এটা অবশ্যই এ সময়ের ছেলেমেয়েদের জন্য পজিটিভ। দেখুন আমরা বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও হঠাত্ হঠাত্ শুনতে পেতাম কোনো ছেলে কিশোর কুমারের চেয়েও ভালো গাইছে, বা কোনো মেয়ে লতা মুঙ্গেশকরের মতো। কিন্তু সেই ছেলেটা এতদিন হয়তো ওর পাড়া গায়ের লোকদেরই গান শোনানোর অভ্যেসে ছিল। রিয়েলিটি শো গুলো এসে এদের একটা সুযোগ করে দিল। এটাকে আমি বলব প্রাথমিক সুযোগ। অর্থাত্ যে ছেলেটা ্ইে ধরনের প্রতিযোগিতায় প্রথম হলো, সে আসলে প্রাথমিক পরীক্ষার্থী হিসেবে সিলেক্ট হলো। কিন্তু আমরা স্টার-সুপারস্টার নাম দিয়ে ওদেরকে ফাইনালিস্ট বলা শুরু করি। ভুলটা এখানেই হয়। এরপরও আমি বলব, এত প্ল্যাটফর্মে এত সুযোগ কিন্তু পজিটিভ। ‘পাওয়ার ভয়েজ’-এর হয়ে আমি সারাদেশ ঘুরে অসাধারণ কিছু অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছি। সারাদেশে আমাদের যে এত গান পাগল প্রতিভা আছে তা নিজে চোখে দেখার সুযোগটা হয়েছে। আমি বারে বারে অভিভূত হয়েছি।
কিন্তু হঠাত্ করে সেই রিয়েলিটি শো থেকে আপনি সরে দাঁড়ালেন কেন?
না সরে দাঁড়ায়নি। আসলে ব্যক্তিগত কাজে দেশের বাইরে গিয়েছিলাম। যেতে হয়েছিল। আর এটা যেহেতু চলমান প্রক্রিয়া। তাই ব্রেক দিতে হয়েছে। তবে ‘পাওয়ার ভয়েজ’-এর আজকের সব ছেলেমেয়েদের সেই প্রত্যন্ত এলাকা থেকে খুঁজে বের করার মূল কাজটির সময় যে থাকতে পেরেছি। এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।
এবার আসি আপনার গান প্রসঙ্গে। নিজেকে গানে আর কোথায় দেখতে চান। বা গান নিয়ে পরিকল্পনা। একজন মানুষ যখন গান নিয়ে সবকিছু প্রাপ্তি হয়, তখন আর কী চাওয়ার থাকে। একজন সুবীর নন্দীর নতুন গান নিয়ে ভাবনার জায়গাটা কোথায়?
না এটার কিন্তু শেষ নেই। প্রত্যেক শিল্পী মৃত্যুর আগের দিন অবধি চায় আরেকটি গানের রেকর্ড করে গেলে গানটি বোধহয় অনেক মানুষকে নাড়া দিতে পারত। কিংবা আরেকবার কোনো মঞ্চে গাইবার সুযোগ পেলে মনে হয়, গতবারের শোটার চাইতে ভালো গাইতে পারত। নয়তো আমার এই চাকরি জীবনের রিটায়ারমেন্টের পরও আমি কেন ছুটে ছুটে যাই। বিভিন্ন এলাকায়, বিভিন্ন দেশে। গানের নেশায়। শিল্পী জীবনের এ এক অদম্য প্রেম। একে থামানো যায় না। আর থামলে সে শিল্পী না। এই কিছুদিন আগে হরতালের ভেতরে অ্যাম্বুলেন্সে করে দিয়ে শো করে এলাম। প্রতিনিয়ত নতুন মিউজিক ডিরেক্টরদের গান শুনছি। গান তুলে গাইবার চেষ্টা করছি। গানের ভেতরেই আমার প্রতিদিনের নিশ্বাস নেওয়া হয়।
আপনার আপকামিং অ্যালবাম ‘মুগ্ধতা নেব বলে’ অ্যালবামটিতে আপনি একটি রবীন্দ নাথের গান রেকর্ড করলেন। এই অ্যালবাম প্রসঙ্গে একটু বলবেন। এ ছাড়াও যদি শুনতে চাই, রবীন্দ নাথের গান নিয়ে প্রায়শই নানান তর্ক হয়। এটা ভাঙা যাবে না ওটা করা যাবে না। কিছুদিন আগে ‘ক্ষ’ নামের একটি ব্যান্ডদলের আমাদের জাতীয় সংগীত পরিবেশনা নিয়েও কথা উঠল। এ প্রসঙ্গে একটু বলুন।
প্রথমে বলব গানের নেশাতেই ‘মুগ্ধতা নেব বলে’ অ্যালবামটির কাজ করা। এই ধরনের গান আগে যে গাইনি তা না। কিন্তু গানের চলন বা কম্পোজিশনটা একেবারেই নতুন। আলাদা এক নতুনত্ব পাবে শ্রোতারা এই অ্যালবামে। আর রবীন্দর ‘ক্ষ’ বান্ডদল বা যেই নতুন মিউজিকের সংমিশ্রণে রবীন্দ গানকে সাজাক আমি বলব গানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে মূল সুর বা চলনকে ঠিক রেখে আধুনিকায়ন হতেই পারে। কিন্তু ওই যে বললাম শ্রদ্ধা জিনিসটা থাকতে হবে। না হলেই বিতর্কের জন্ম হবে। এখন আধুনিক গানের শিল্পীরা রবীন্দ গান গাইছে। তাতে তো আমি মন্দ কিছু দেখছিনা। তপন চৌধুরী গাইল, সামিনা গাইল। আমার কাছে দারুণ লেগেছে। আমাকে দীর্ঘদিন ধরে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা বলে আসছিলেন যে, ধ্রুপদাঙ্গের রবীন্দ দুটি জিনিস থাকলে গানের সাথে বিতর্ক জিনিসটা কেন আসবে। আর ‘ক্ষ’ ব্যান্ড দলের গায়কীতে আমার কাছে মনে হয়েছে ওদের গায়কীর ভেতরে এক ধরনের শ্রদ্ধাবোধ ছিল। আমার কাছে চমত্কার লেগেছে। পরবর্তীতে বেশ ক’জন রবীন্দ সংগীত শিল্পীকেও শুনেছি তারাও বিষয়টি পছন্দ করেছে।