লুপ্তপ্রায় পারিজাত
মাদারগঞ্জ (জামালপুর) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৩৮
এককালের গ্রাম বাংলায় অতিপরি-চিতি মান্দার বা পারিজাত ফুলগাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জসহ সারাদেশে এই অতিপরিচিত ফুলগাছটি কৃষকরা জমির সীমানা খুঁটি ও বাড়ির সীমানা খুঁটি হিসাবে ব্যবহার করতো। কিন্তু প্রায় এক যুগ ধরে এই গাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সারা বছর গাছটি মরাগাছের মতো থাকলেও বসন্ত কালে তার শোভা সকলের নজর কাড়ে। এই ফুলকে অনেকে পলাশ বলে ভুল করে থাকেন। অনেকে বুনো পলাশ নামেও ডেকে থাকেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার গানে মান্দার বা পারিজাতকে নিয়ে লিখেছেন, ‘পারিজাতের কেশর নিয়ে/ ধরায় শশী ছাড়ায় কি এ/ ইন্দ্রপুরীর কোন রমণী/ বাসর-প্রদীপ জ্বালো.. ও রজনীগন্ধা তোমার গন্ধসুধা ঢালো ।
আঞ্চলিক শব্দে মান্দার বা মাদারফুল বসন্তকে জানান দেয়। আসছে বসন্ত গাছে গাছে লাল নীল রংয়ের নানা ফুল, মাতাল হাওয়ার পাগলকরা সুবাসিত বাতাস। কোন গন্ধ নেই এই ফুলে, লাল পাপড়ির পাশে কেশর দুলিয়ে ফুটে। সারা বছর গাছটি ঘুমিয়ে থাকে। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে আগুন হয়ে জেগে উঠে। অযত্নে বেড়ে ওঠা এই গাছটি হলো পারিজাত। এই সাধারণ মান্দার গাছটি চিনলেও এই গাছ যে পারিজাত তা অনেকেরই জানা নেই। গায়ে কাঁটা থাকে, পত্রমোচী, বসন্তে ফুল ফোটে। মঞ্জুরিতে অনেক ফুল থাকে। গাছের গায়ে কাঁটা থাকে একটু বয়স হলে কাটা ঝরে যায়। ডালপালায় ফাল্গুন এলে রং ধারণ করে। সারা শরীরে লাল টকটকে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
‘‘ফাগুন হাওয়ায় রঙে রঙে
পাগল ঝোরা লুকিয়ে ঝরে
গোলাপ জবা পারুল পলাশ
পারিজাতের বুকের পরে।’’ মান্দার স্বর্গের ফুল। মর্ত্যের রাজা শ্রীকৃষ্ণ স্বর্গের রাজা ইন্দ্রের কাছ থেকে অনেকটা জোর করে মর্ত্যের বাগানে এই ফুল নিয়ে আসেন। এই পারিজাত বা মান্দার ফুল নিয়ে একটি উপাখ্যান রয়েছে: কৃষ্ণের দুই স্ত্রী সত্যভামা ও রুক্সিণীর খুব ইচ্ছে তাদের বাগানও পারিজাতের ঘ্রাণে আমোদিত হোক। কিন্তু পারিজাত তো স্বর্গের শোভার! কৃষ্ণ স্ত্রীদের খুশি করতে চান। তাই লুকিয়ে স্বর্গের পারিজাত বৃক্ষ থেকে একটি ডাল ভেঙ্গে এনে সত্যভামার বাগানে রোপণ করেন, যার ফুল রক্সিণীর বাগানেও ঝরে পড়ে, সুগন্ধ ছড়ায়। এদিকে স্বর্গের রাজা ইন্দ্র তো ঘটনাটা জেনে খুব রেগে যান। তিনি বিষ্ণু অবতারের উপর ক্রুদ্ধ ছিলেন। এই কারণে তিনি কৃষ্ণকে শাপ দেন কৃষ্ণের বাগানের পারিজাত বৃক্ষ ফুল দেবে ঠিকই কিন্তু ফল কোনদিন আসবে না, তার বীজে কখনও প্রাণের সঞ্চার হবে না।
সারাদেশে এই পারিজাত ফুলের গাছ দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলে কৃষকরা জমির আইলে সীমানা খুঁটি এবং বাড়ির বেড়ার জন্য এই গাছ লাগিয়ে থাকে। কোনরকম পরিচর্যা ছাড়াই এই গাছে দ্রুত বৃদ্ধিপায়। বসন্ত এলে প্রাণখুলে দেখিয়ে দেয় লাল টুকটুকে ফুলের বাহার। পরিবেশের প্রভাবে ও যত্নের অভাবে দিনে দিনে এই গাছ গ্রাম বাংলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এই দেশি ফুলগাছ রক্ষায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।