বিনম্র শ্রদ্ধায় বিপ্লবীর চির বিদায়
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৪
শোক, শ্রদ্ধা আর হূদয় উজাড় করা ভালোবাসায় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে চিরবিদায় জানালো বাংলাদেশের মানুষ। গতকাল শুক্রবার তার জন্মভূমি চট্টগ্রামের বলুয়ার দীঘির পাড়ে অভয়মিত্র মহাশ্মশান ঘাটে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন হয় এই বীর যোদ্ধার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। ঢাকায় শ্রদ্ধা নিবেদনের পর তার মরদেহ গতকাল সন্ধ্যায় চট্টগ্রামে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয়। ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় এই বিপ্লবীর কফিন। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামে মাস্টারদা সূর্যসেনের অন্যতম সহযোদ্ধা, বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীকে শ্রদ্ধা জানান ঢাকা ও চট্টগ্রামের সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনের সর্বস্তরের নেতৃবৃন্দ।
বর্ষীয়ান বিশিষ্ট বিপ্ল¬বী নেতা বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মরদেহ দুপুর সাড়ে ১২টায় ঢাকার আন্তর্জাতিক শাহজালাল বিমানবন্দরে এসে পৌঁছালে অশ্রুসজল নয়নে তা গ্রহণ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তার সহকারী একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শেখর মরদেহ গ্রহণ করেন এবং কফিনে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। ঢাকার জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হুমায়ুন কফিন জাতীয় পতাকা দিয়ে ঢেকে দেন।
এ সময় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্ল¬া, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাসগুপ্ত, মাস্টার দা সূর্যসেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের (দক্ষিণ) সভাপতি মোসলেহউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পঙ্কজ কুমার দেবনাথ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক (চলতি দায়িত্ব) এবং চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের (সিইউজে) সাবেক সভাপতি আজিজুল ইসলাম ভুঁইয়া, চট্টগ্রাম সমিতি ঢাকার সভাপতি রেজাউল হক চৌধুরী মোস্তাক, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ ও হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজল দেবনাথ উপস্থিত ছিলেন। ফুল দিয়ে সাজানো একটি মোটরযান বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মরদেহ নিয়ে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। সেখানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাকে শেষবারের মতো একনজর দেখার জন্য ভিড় করেন। তার কফিনে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। আত্মীয়-স্বজন, গুণগ্রাহী, শুভাকাঙ্ক্ষি ও সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার মরদেহ দুপুর ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হয়। এরপর গতকাল বিকালে হেলিকপ্টারে করে মরদেহ তার জন্মস্থান চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়।
আমাদের চট্টগ্রাম অফিস জানিয়েছে, তার মরদেহ প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় আসকার দীঘির পাড় রামকৃষ্ণ মিশনে, এরপর তার দীর্ঘদিনের স্মৃতি বিজড়িত প্রিয়তম নিবাস মোমিন রোডের বিপ¬বী কুটিরে, রহমতগঞ্জ জেএম সেন হল এবং চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। প্রতিটি স্থানেই তাকে একনজর দেখার জন্য ভিড় করেন শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতি কর্মী, প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী, লেখক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ নানা পেশা ও অঙ্গনের প্রবীণ নবীন সদস্যরা। এ সময় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দও উপস্থিত ছিলেন।
সন্ধ্যায় ঢাকা থেকে বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মরদেহ নিয়ে হেলিকপ্টার চট্টগ্রাম এমএ আজিজ স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও সুধীজন। সেখান থেকে একটি মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে তার লাশ শেষ অনুষ্ঠানমালায় নিয়ে যাওয়া হয়। প্রবীণ বয়সেও এই মানুষটি তার প্রিয় বিচরণস্থল হিসেবে যেসব স্থানকে ভালবাসতেন সেসব স্থানে আগে থেকেই অপেক্ষমাণ ছিলেন তার ভক্তরাগীরা।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে চট্টগ্রাম গণজাগরণ মঞ্চ, আবৃত্তি সংগঠন প্রমা, বোধন, উদীচী, নাট্য সংগঠনসমূহ এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের পক্ষ থেকেও বিনোদ বিহারীর মরদেহে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। জেএম সেন হলে তার মরদেহের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটি ও মহানগর কমিটি, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, চট্টগ্রাম মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদ, সীতাকুণ্ড স্রাইন কমিটি, বাংলাদেশ গীতা শিক্ষা কেন্দ ীয় কমিটিসহ বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান।
বিভিন্ন মহলের শোক
সন্তু লারমা:পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) বিপ¬বী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
সিটি মেয়র মনজুর আলম:চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র এম মনজুর আলম বিপ্ল¬বী বিনোদ বিহারীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে বলেছেন, তার শূন্যতা পূরণ হবার নয়।
চবি উপাচার্য:বিপ্ল¬বী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর মৃত্যুতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মো. আনোয়ারুল আজিম আরিফ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
এছাড়া চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগ, হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ দক্ষিণ জেলা কমিটি, আইনজীবী ঐক্য পরিষদ, চট্টগ্রাম জেলা কমিটি, স্বামী পরমানন্দ বেদাস্ত ভাবনা কেন্দ্র, যুব রেডক্রিসেন্ট চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম আইনজীবী বিজয়া সম্মিলন পরিষদসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন।