রমনা বটমূলে বোমা হামলা

মাওলানা তাজউদ্দিনসহ ৫ আসামি এখনো গ্রেফতার হয়নি

রমনার বটমূলে বোমা হামলার মামলায় ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত আসামির ৫ জন গ্রেফতার হয়নি। পলাতক এই ৫ আসামিকে ধরিয়ে দিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে একটি ঘোষণা দেয়া হয়। এতে প্রত্যেক আসামিকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার দেয়া হবে বলে বলা হয়। এ বোমা হামলা মামলার বিচারকার্য চলছে সাড়ে ৩ বছর ধরে। গ্রেফতারকৃত আসামিদের উপস্থিতিতে ৮৪ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬০ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। মামলার বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাকি ২৪ জনের সাক্ষ্য প্রয়োজন নেই বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। সর্বশেষ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর আবু হেনা মো: ইউসুফ সাক্ষী দিয়েছেন। এখন এই মামলায় সাক্ষীদের জেরা চলছে। আগামী ১৫ এপ্রিল মামলার পরবর্তী সাক্ষীর জেরার দিন ধার্য রয়েছে। তবে বোমা হামলার ঘটনায় বিস্ফোরক আইনে দায়ের করা মামলার বিচারের ব্যাপারে আদালতের কোন নির্দেশনা না পাওয়ায় এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে আছে। বোমা হামলার ৭ বছর ৭ মাস ১৬ দিন পর ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর হরকাতুল জিহাদের শীর্ষব্যক্তি জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে হরকাতুল জিহাদের ২ টি আস্তানায় এ হামলার পরিকল্পনা হয়। হামলায় ২২ জঙ্গি অংশ নিয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে ১৪ জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। পুরো নাম ঠিকানা না পাওয়ায় ৮ জনের নাম চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন- মুফতি আব্দুল হান্নান, আরিফ হাসান সুমন ওরফে আব্দুর রাজ্জাক, মাওলানা আকবর হোসাইন ওরফে হেলাল উদ্দিন, বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিণ্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন আহমেদ, শাহাদাত উল্লাহ ওরফে জুয়েল, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, মাওলানা আব্দুর রউফ, মাওলানা সাব্বির, মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, মুফতি শফিকুর রহমান, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া ও মুফতি আব্দুল হাই। আসামিদের মধ্যে পলাতকরা হলেন- মাওলানা তাজ উদ্দিন আহমেদ, হাফেজ জাহাঙ্গীর আলম বদর, মাওলানা আবু বক্কর, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া ও মুফতি আব্দুল হাই। চার্জশিট থেকে বাদ আসামি ওমর ফারুক, জনি, ড্রাইভার আব্দুল হালিম, সুজন,আব্দুল জব্বার,আব্দুল্লাহ, জাকারিয়া, মাওলানা নূরউদ্দিন ওরফে নূর উল্লাহ’র ঠিকানা এখনো উদ্ধার করেত পারেনি তদন্ত সংস্থা। তবে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে সিআইডি সূত্র জানিয়েছে। প্রয়োজনীয় তথ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সম্পূরক চার্জশিট দেয়া হবে বলে সিআইডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান চলছিল। মঞ্চের কাছে ঘটানো হয় বোমা বিস্ফোরণ। ঘটনাস্থলে নিহত হয় আবুল কালাম আজাদ, মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, মোহাম্মদ এমরান হোসেন, অসীম চন্দ্র সরকার, মামুন হোসেন তার চাচাতো ভাই রিয়াজুল ইসলাম ও বোন জান্নাতুল ফেরদৌস শিল্পী, ইসমাইল হোসেন স্বপন ও আনসার আলীসহ ৯ জন। পরে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় আরও একজন মারা যায়। নিহতদের মধ্যে একজনের পরিচয় এখনো অজ্ঞাত। আহতদের মধ্যে রয়েছেন রেজাউল করিম, আফজাল হোসেন, আমানুল্লাহ, জাহাঙ্গীর হোসেন, স্বপন কুমার দাস, মাহমুদুল কবির, ইব্রাহিম খলিল, রফিকুল ইসলাম, পীযূষ কান্তি সরকার ও ওমর ফারুক। এদের মধ্যে রেজাউল করিম, আমানুল্লাহ, ইব্রাহিম খলিল ও রফিকুল ইসলামকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। তাদের দেয়া তথ্য মতে পুলিশ গ্রেফতার করে ডেমরার মাদানীনগর মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আকবর হোসেন ওরফে আলী আকবরকে। ২০০১ সালের ১৪ জুন আলী আকবর ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময় আলী আকবর আদালতে দেয়া তার জবানবন্দি প্রত্যাহার করে নেয়। ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে উচ্চ আদালত থেকে তিনি জামিনে বেরিয়ে আত্মগোপন করেন। বোমা হামলার ঘটনায় বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল কুমার রমনা থানায় দু’টি মামলা করেন। প্রথম মামলার তদন্ত করেন তত্কালীন রমনা থানার এসআই মোহাম্মদ কবির। পরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মামলাটি তদন্ত করে। ২০০১ এ চারদলীয় জোট ক্ষমতায় গেলে তদন্ত থমকে যায়। ২০০৩ সালে মামলাটি স্থানান্তরিত হয় সিআইডিতে। তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হলেও মামলায় আশানুরূপ গতি আসেনি। ২০০৭ সালে মামলার অষ্টম তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন সিআইডির ইন্সপেক্টর আবু হেনা মোঃ ইউসুফ। ঘটনার সাত বছর পর চার্জশিট দাখিল করা হয় আদালতে। চার্জশিটে নিহতের স্বজন, প্রত্যক্ষদর্শী, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যসহ মোট ৮৪ জনকে সাক্ষী করা হয়। এদের মধ্যে ৬০ জন ইতোমধ্যে আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আলামত হিসেবে রক্ত মাখা জামা কাপড়, বোমার আলামত,পাসপোর্টসহ ২৬ ধরনের আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর আবু হেনা মো: ইউসুফ বলেন, এখন সাক্ষীদের জেরা চলছে। চলতি বছরের শেষ দিকে মামলার বিচার শেষ হতে পারে।