প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস!
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৬
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাজশাহী থেকে প্রশ্ন ফাঁস হয় বলে জানা গেছে। এ অভিযোগে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ২৯ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ও র্যাব।
দেশের ৬১টি জেলায় (পার্বত্য তিন জেলা ছাড়া) গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে একযোগে এই পরীক্ষা শুরু হয়। ১১ লাখ ৯০ হাজার প্রার্থীর মধ্যে ১৪ হাজার ৮৫৮ জনকে এই পরীক্ষার মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ দেয়া হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগসহ প্রশ্নপত্র জালিয়াতির কারণে রাজশাহীতে ১২ জন, গোপালগঞ্জে ৬ জন, সাতক্ষীরায় ৫ জন, মাদারীপুরে ৬ জনকে আটক করা হয়।
ইত্তেফাকের রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহীতে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত দুইটি চক্রের মূল হোতাসহ ১২ জনকে গ্রেফতার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের একটি অপারেশন দল। গতকাল শুক্রবার ভোরে মহানগরীর একটি আবাসিক হোটেল থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়।
র্যাব জানায়, প্রতারক চক্র দু’টির মূল হোতা যথাক্রমে মোঃ মোস্তাফিজুর রহমান রিপন ও মোঃ ইলিয়াস হোসেন রুবেল। তারা গত ৫ বছর যাবত্ তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র জালিয়াতি ও প্রক্সি (প্রকৃত পরীক্ষার্থীর পরিবর্তে অন্য পরীক্ষার্থীর মাধ্যমে পরীক্ষা দেয়ানো) দেয়ানোর সঙ্গে জড়িত রয়েছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রিপন ও রুবেল র্যাবকে জানায়, তারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অন্য ছা্ত্রদের দিয়ে প্রক্সি দেয়ার ব্যবস্থা করে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর নিকট থেকে ৪৫ হাজার টাকা করে নিতো। পরে রুবেল ও রিপন বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ ও বেসরকারি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি শুরু করে। এক্ষেত্রে বর্তমানে তারা হাতঘড়ির মত দেখতে অভিনব মোবাইল ফোন পরীক্ষার্থীদের নিকট সরবরাহ করে এসএমএস-এর মাধ্যমে পরীক্ষার হল থেকে বাইরে প্রশ্ন পাঠিয়ে পুনরায় উত্তর পাঠানোর ব্যবস্থা করতো। এছাড়া তাদের পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র জালিয়াতির আরেকটি নতুন প্রক্রিয়া হচ্ছে ‘স্পাই ব¬্লুটুথ এয়ারফোন’ ব্যবহার।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব-৫ এর গোয়েন্দা দল জানতে পারে, রিপন ও রুবেল গতকাল অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় রাজশাহীর ১৯ জন, নওগাঁর ৯ জন এবং নাটোরের ১০ জন পরীক্ষার্থীর সঙ্গে টাকার বিনিময়ে চুক্তি করেছে। এ লক্ষ্যে তারা চুক্তিবদ্ধ পরীক্ষার্থীদের স্পাই ব্লুটুথ এয়ারফোন এবং ঘড়িসদৃশ মোবাইল ফোন দিয়ে দেয়। তাদের নিকট থেকে প্রাপ্ত প্রশ্নের উত্তর তৈরির জন্য ঢাকা থেকে তিনজন এবং রাজশাহী থেকে তিনজন করে মোট ছয়জন ছাত্রকে ভাড়ায় নিয়োগ করে। এরা তিন জেলায় ভাগ হয়ে প্রশ্নোত্তর ফোনে বলে দেয়ার পরিকল্পনা করেছিল বলে রিপন ও রুবেল র্যাবকে জানিয়েছে। এজন্য প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে তাদের আড়াই থেকে তিন লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল। র্যাব-৫, রাজশাহীর রেলওয়ে কলোনী ক্যাম্পের একটি অপারেশন দল রাজশাহীর সোনাদীঘির মোড়স্থ সমবায় মার্কেটের একটি আবাসিক হোটেল থেকে গতকাল ভোর ৫টার দিকে পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রস্তুত অবস্থায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেফতার করে। এরা হলো রাজশাহী মহানগরীর ধরমপুরের শামসুল হকের পুত্র কাজল আহমেদ (২৫), তালাইমারীর আবুল কাশেমের পুত্র ইকবাল হোসেন (২৬), খোঁজাপুরের মাজদার রহমানের পুত্র সাব্বির আলী (২৪), উপ-শহর এলাকার আব্দুল মতিনের পুত্র সামিউল হোসেন (৩৭), দিনাজপুরের কাহারোল থানার বাইশপুকুর গ্রামের সিরাজুল ইসলামের পুত্র ওমর ফারুক (২৪), কুমিল্লার দেবীদ্বার থানার শাকতলা গ্রামের সলিমূল্লাহ শেখের পুত্র শরিফ হোসেন শেখ (২৫), একই থানার দরিহাসমারি গ্রামের মৃত আব্দুল মজিদের পুত্র মোস্তাফিজুর রহমান (৩০), নাটোরের গুরুদাসপুর থানার বিলপাটুরিয়া গ্রামের আব্দুর রাজ্জাকের পুত্র ইলিয়াস হোসেন (৩০) ও ময়েজ উদ্দিনের পুত্র বাকী বিল্লাহ (৩৪) এবং টাঙ্গাইলের ঘাটাইল থানার পানসী গ্রামের মৃত রতন দত্তের ছেলে শুভ দত্ত (২৫)। ফলে গ্রেফতারকৃতরা নওগাঁ, নাটোর ও রাজশাহীর চুক্তিবদ্ধ ৩৮ পরীক্ষার্থীকে গতকাল শুক্রবার অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র জালিয়াতির কাজে সফল হতে পারেনি।
মাদারীপুর: মাদারীপুরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রসহ আটক ৬ জনকে ২ মাস করে কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। শুক্রবার সকালে মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের আরডিসি ও ভ্রাম্যমাণ আদালত এই আদেশ দেন। পুলিশ জানায়, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার ‘প্রশ্নপত্র’ বিক্রির অভিযোগে গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ৬ জনকে আটক করে সদর থানা পুলিশ।
তারা হলো মাদারীপুর শহরের পাবলিক লাইব্রেরি এলাকার শুভ কম্পিউটারের মালিক সুদেব কর্মকার, সদর উপজেলার মহিষেরচরের হুমায়ুন কবির, মাদ্রা গ্রামের শহিদুল ইসলাম, হোগলপাতিয়া গ্রামের মিজানুর রহমান, মস্তফাপুরের বড় মেহেরপুর গ্রামের আক্তার কাজী এবং কালকিনি উপজেলার কুন্ডবাড়ি গ্রামের মুরাদ হাওলাদার।
তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। মাদারীপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানান, আমরা যাচাই করে দেখেছি যে, উদ্ধারকৃত প্রশ্নপত্রের সাথে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রাথমিক নিয়োগ পরীক্ষায় দেয়া প্রশ্নপত্রের কোন মিল নেই।
গোপালগঞ্জঃ গোপালগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রসহ ৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে গোপালগঞ্জ শহরের ৩টি কম্পিউটারের দোকানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ প্রশ্নপত্রসহ ৬ জনকে ৯ সেটের ২৯টি অবজেকটিভ প্রশ্নসহ আটক করে। আটককৃতরা হলো বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র মোঃ রাসেল মোল্লা, নড়াইলের লোহাগড়া আদর্শ কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ১ম বর্ষের ছাত্রী ইতি খানম, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার আড়পাড়া গ্রামের মৃতঃ নুরুল হক সরদারের মেয়ে সাজেদা খানম, একই উপজেলার নিজড়া গ্রামের শাহজাহান আলীর ছেলে তানভীর আহম্মেদ, নড়াইল জেলার পাখিমারা গ্রামের কমল বিশ্বাসের ছেলে মানিক বিশ্বাস, খুলনা জেলার তেরখাদার পুলীন বিশ্বাসের ছেলে বর্ণ বিশ্বাস ও গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ কর্মী আলম।
গতকাল শুক্রবার গোপালগঞ্জের বিভিন্ন কেন্দ্রে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। উদ্ধারকৃত প্রশ্নপত্রের সাথে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নের মিল পাওয়া যায়নি বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে।
আটক ৬ জনকে বৃহস্পতিবার রাতভর ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর শুক্রবার দুপুরে তাদের গোপালগঞ্জ থানায় পাঠানো হয়।
গোপালগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আব্দুস সালাম বলেন, শুক্রবার নিয়োগ পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। উদ্ধারকৃত প্রশ্নের সাথে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নের কোন মিল পাওয়া যায়নি।
সাতক্ষীরাঃ সাতক্ষীরায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় চাকরি দেওয়ার নাম করে প্রতারণার অভিযোগে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মির্জা আমিনুর রহমানকে আটক করেছে পুলিশ।
অপরদিকে উত্তরপত্র জালিয়াতির অভিযোগে শহরের একটি আবাসিক হোটেল থেকে ৫ জন যুবককে আটক করেছে সাতক্ষীরা ডিবি পুলিশ। তারা হলেন, শ্যামনগর উপজেলার চরবাড়ি গ্রামের মোহাম্মদ হোসেন, বুড়িগোয়ালীনি গ্রামের আমিনুর রহমান, পাতাখালী গ্রামের তরিকুল ইসলাম, সদর উপজেলার গোয়ালপোতা গ্রামের দেবব্রত বিশ্বাস ও তালা উপজেলা কৈখালী গ্রামের বিশ্বনাথ মন্ডল। সাতক্ষীরা ডিবি ইন্সপেক্টর মোশাররফ হোসেন জানান, আটককৃত ৫ যুবক প্রশ্নপত্র ফাঁসের সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে তারা পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র সরবরাহ করে থাকে। তাদেরকে শহরের আল আরাফাহ হোটেল থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হয়।