নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করবে সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি

সংসদীয় ঐকমত্য কমিটির মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, একটি ‘অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণমূলক’ নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য বর্তমান ‘সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে’ সংশ্লিষ্ট সবার বিবেচনার জন্য এই প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়, এই সরকারের মেয়াদ হবে দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে পরবর্তী ৯০ দিন। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময় রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে সর্বোচ্চ আরো ৯০ দিন পর্যন্ত এই সরকারের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে বলে রূপরেখায় সুপারিশ করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা:প্রক্রিয়া ও কাঠামো প্রস্তাবনা’ শিরোনামে এই রূপরেখাটি তুলে ধরে টিআইবি। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, ট্রাস্টি এম. হাফিজউদ্দিন খান ও নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন। কার্যপত্র উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষণা বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার রুমানা শারমিন। সম্ভাব্য সরকারের গঠন প্রক্রিয়া, এখতিয়ার ও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিষয়গুলো তুলে ধরেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। টিআইবির প্রস্তাবে বলা হয়, বর্তমান সংসদের দুই জোটের মধ্যে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে উভয় জোট থেকে সমান সংখ্যক (চার-ছয় বা উভয় জোটের কাছে গ্রহণযোগ্য সংখ্যক) নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সমন্বয়ে এই সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি গঠিত হবে। পরস্পরের প্রতি সহিষ্ণু, ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, গ্রহণযোগ্য ও আস্থাভাজন জনপ্রতিনিধিকে এই কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনয়ন দিতে হবে। টিআইবির প্রস্তাবনা অনুযায়ী সংসদের স্পিকার কর্তৃক ঐকমত্য কমিটি গঠনের আহ্বানের পর রাজনৈতিক দলগুলো কমিটির সদস্য মনোনয়ন দেবে এবং এরপরই স্পিকার উক্ত কমিটির সভা আহ্বান করবেন। এই কমিটির সাচিবিক দায়িত্ব পালন করবেন জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব। প্রস্তাব অনুযায়ী সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানসহ ১১ সদস্যের তালিকা প্রস্তুত করবে। তারা উভয় জোটের সঙ্গে আলোচনা করে গ্রহণযোগ্য একজন নির্বাচিত বা অনির্বাচিত ব্যক্তিকে নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান হিসেবে মনোনীত করবেন। তবে ১১ সদস্যের নির্বাচনকালীন সরকার গঠনে দুটি বিকল্প প্রস্তাব রাখা হয়েছে টিআইবির রূপরেখায়। প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঐকমত্য কমিটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকার প্রধান মনোনয়ন দেবে। পরে সরকার প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের অন্যান্য ১০ সদস্যের তালিকা প্রস্তুত করবে। দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ঐকমত্য কমিটি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যের তালিকা করবে। পরে তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকার প্রধান মনোনয়ন করা হবে। প্রস্তাবে বলা হয়, নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হবেন একজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচিত বা অনির্বাচিত ব্যক্তি। প্রস্তাবের রূপরেখায় বলা হয়েছে, সরকার প্রধান মনোনয়নের ক্ষেত্রে কমিটি ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারলে অনধিক তিন ব্যক্তির একটি তালিকা স্পিকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে উপস্থাপন করা হবে। ওই তালিকা থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে সরকার প্রধান হিসেবে মনোনয়ন দেবেন। মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিবেচ্য বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের দলীয় অনুপাতের ভিত্তিতে সদস্য মনোনীত করা যেতে পারে বলেও রূপরেখায় বলা হয়েছে। এক্ষেত্রেও তিনটি বিকল্প রাখা হয়েছে। উভয় জোট থেকে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে বা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও অনির্বাচিত/নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে অথবা শুধু অনির্বাচিত/নির্দলীয় ব্যক্তিদের নিয়ে এই মন্ত্রিসভা করা যেতে পারে। রূপরেখায় বলা হয়েছে, সংসদের মেয়াদপূর্তির ৩০ দিন আগে এই নির্বাচনকালীন সরকারের সদস্যদের তালিকা চূড়ান্ত করতে হবে। সংসদের মেয়ার পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংসদ ভেঙে দিয়ে রাষ্ট্রপতি এই নির্বাচনকালীন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। টিআইবির প্রস্তাবনা অনুযায়ী সংসদীয় ঐকমত্য কমিটির সার্বিক সমন্বয় ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের জন্য দুইজন যুগ্ম-আহ্বায়ক নির্বাচিত হবেন যারা কমিটির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের সাথে সাথে উক্ত সংসদীয় ঐকমত্য কমিটি অকার্যকর হয়ে যাবে। নির্বাচনকালীন এই সরকার দায়িত্ব পালনকালীন সময় রাষ্ট্রপতি স্বপদে বহাল থাকবেন। নির্বাচনকালীন সরকারের কোনো সদস্য দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না এবং দশম সংসদে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ওই সংসদের নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত সরকারি কোনো লাভজনক পদে থাকতে পারবেন না।