বাংলাদেশের সাধুগুরুদের গানের ধারা
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:০৫
বাংলার সাধুগুরু হলেন প্রাচীন বাংলার চর্যাসংস্কৃতির চর্চাকারী বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যদের উত্তরাধিকার, মধ্যযুগের জ্ঞানসাধক পরিমণ্ডলের যোগী তথা নাথসাধকদের উত্তরাধিকার, এমনকি তারা সাম্প্রতিককাল পর্যন্ত বিস্তৃত ‘লৌকিক ইসলাম’ তথা সুফিসাধক ও বৈষ্ণব মোহন্তদের উত্তরাধিকার। সামাজিক পরিচয়ে কোথাও তাদের উপাধি বা বিশেষণ জুটেছে ‘বাউল’ নামে, কোথাও ‘ফকির’ নামে, কোথাও ‘পাগল’, ‘ক্ষ্যাপা’, ‘পীর’, ‘মুরশিদ’, ‘সাধু’, ‘সাধক’, ‘গুরু’ ইত্যাদি নামে। আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত পণ্ডিতদের অধিকাংশ গবেষণাকর্মে ‘বাউল’ নামটি বেশি ব্যবহূত হয়ে থাকে। কিন্তু সাধক পরিমণ্ডলে ‘সাধুগুরু’ শব্দবন্ধটি অধিক প্রচলিত।
বাংলার সাধুগুরুরা বিশ্বাস করেন—মানব জীবনের পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য অন্তত তিনজন গুরুর প্রয়োজন পড়ে, যার মধ্যে প্রথমজন হন শিক্ষা গুরু, দ্বিতীয়জন দীক্ষা আর তৃতীয়জন হন ভাবের গুরু। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধনসঙ্গিনীকে চতুর্থ গুরু তথা ‘চেতন গুরু’ বলে উল্লেখ করে থাকেন। গুরু পরম্পরার এই সিঁড়ি ভিন্ন সাধুগুরুরা জ্ঞানের পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারেন না, তাই সম্ভবত বলা হয়ে থাকে—
‘গুরু কর শত শত মন্ত্র কর সার
যে ঘোচাবে মনের আন্ধার দোহাই দাও তার \’১
সাধুগুরুদের এই গুরুপরম্পরার জ্ঞান চর্চার ঐতিহ্য সুদূর অতীত চর্যার কাল থেকে চলে আসছে এবং সেই ধারাবাহিকতায় সাধুসঙ্গ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। একদিকে গুরুপরম্পরা ঐতিহ্য, অন্যদিকে সাধুসঙ্গ ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জ্ঞান আহরণের ব্যাপারে সাধুগুরুরা উদার দৃষ্টিভঙ্গির অনুসারী। এ সম্পর্কে জানা যায় যে, ‘নবী হজরত মহাম্মদ আল্লার সঙ্গে মে’রাজ মিলনে নব্বুই হাজার জ্ঞানমূলক বাক্য পেয়েছিলেন। তার তিরিশ হাজার সর্বজনের জন্য কোরাণে লিপিবদ্ধ; তিরিশ হাজার যোগ্য শিষ্যদের জানিয়েছিলেন; বাকী তিরিশ হাজার তার ‘সিনায়’ (হূদয়ে) ছিল। এগুলি নবীর নূরে জাত সাধু-ফকিরদের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এ সমাজে গুরু শিষ্যের এক কানে মন্ত্র দেন অন্য কানটি ফাঁকা রাখেন; মানুষের কাছ থেকে, সাধুসঙ্গ করে ছড়িয়ে থাকা গুপ্ত জ্ঞান সংগ্রহ করে শিষ্যবর্গ।’২ মৌলবাদী অন্ধতা ও অনড় সাম্প্রদায়িকতা এ কারণেই সাধুগুরুদের মতবাদে নেই। জ্ঞানরাজ্যে তার সদা অপূর্ণতা, যেকোনো মানুষের কাছ থেকে সে সংগ্রহে ও গ্রহণে প্রস্তুত। এমনই উদার ও যুক্তিনিষ্ঠ অবস্থানে দাঁড়িয়ে তাই তো খুব নিশ্চিতে নেত্রকোণার জালাল উদ্দিন খাঁ স্পষ্ট করেই গাইতে পারেন—
‘মানুষ থুইয়া খোদা ভজ, এই মন্ত্রণা কে দিয়াছে
মানুষ ভজ কোরাণ খোঁজ, পাতায় পাতায় সাক্ষী আছে \’৩
এই গানের ভেতর দিয়ে যে মেরাজে আল্লাহ-নবীর সেই মহামিলন এবং সেখান থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান আবার লোকসমাজের ভেতর থেকে আরহণ করারই ইঙ্গিত রয়েছে।
এবারে সাধুগুরুদের জ্ঞান চর্চার অন্যতম আশ্রয় সাধুসঙ্গ সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। কেননা, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সাধুগুরুই তাদের আখড়াবাড়িতে একটি করে সাধুসঙ্গের আয়োজন করে থাকেন।
সাধুসঙ্গ মূলত এক ধরনের সাধু সমাবেশ বা সাধুদের মিলনক্ষেত্র। সাধুসঙ্গে সাধারণত সাধুগুরুদের রচিত গানের চর্চা যেমন প্রত্যক্ষ করা যায়, তেমনি তাদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু চিত্রও প্রত্যক্ষ করা যায়। সাধুগুরুরা সাধুসঙ্গে একত্রিত হলে শিষ্যভক্তদের মধ্যে পারস্পারিক প্রেম ও ভক্তি ভাব সৃষ্টি হয়। সাধুসঙ্গে শিষ্যদের পাশাপাশি গুরুরা মিলিতভাবে তাদের সাধনার অনুষঙ্গ বিভিন্ন পর্বের গান পরিবেশন করেন এবং গানের অন্তর্নিহিত অর্থের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ তাতে নির্দেশিত জীবনপদ্ধতির প্রতি শিষ্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ পর্যায়ে লালনপন্থী সাধুগুরুদের সাধুসঙ্গ হতে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছি।
দুই
লালনপন্থী ফকির-সাধুদের সাধনার একটি অনিবার্য ও আবশ্যিক অঙ্গ হলো সাধুসঙ্গ। সাধুসঙ্গে লালনপন্থী সাধুগুরুরা একত্রিত সাঁইজির নির্দেশনাগুলো পালন করেন, গান করেন এবং গুরু-শিষ্যের মধ্যে সেবা গ্রহণ-প্রদান, গুরুকর্ম ইত্যাদি অনুষঙ্গ থাকে। প্রতিটি গুরুর বাড়িতে বাত্সরিক সাধুসঙ্গের আয়োজন হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিষ্যরাও গুরুর সম্মানে সাধুসঙ্গ করেন। গত প্রায় বিশ বছর ধরে সে রকম সাধুসঙ্গে ঘুরি ফিরি। সাধু-গুরুদের গান শুনি। সাধুরা বলেন—যে গানে চেতনার বোধন ঘটে না তা কোনো গান নয়, আর গানকে তারা যেভাবে দেখেন, গেয়ে থাকেন, এমনকি গানের বিবেচনা করে থাকেন, তাতে আমার খুব মনে হয়—‘গান’ শব্দটিকে সাধু-গুরুরা আসলে ‘জ্ঞানে’র আঞ্চলিক ও প্রতীকায়িত শব্দ বলেই মনে করেন। সাধু-গুরুদের ভাষ্য অনুযায়ী—গানের আরেক নাম ‘কালাম’, যেমন—লালন সাঁইজির গানকে তারা বলেন—‘সাঁইজির কালাম’ অর্থাত্ সাঁইজির দিকনির্দেশনা বলে থাকেন। সাধুসঙ্গে ঘুরে ফিরে বুঝি সাঁইজির যে দিকনির্দেশনায় যখনকার কথা বলা হয়েছে তখনই তা গাইতে হয়, যেমন—গোষ্ঠলীলার গানকে সকালেই গাইতে শুনেছি, আবার রাসলীলার গানকে কখনোই রাতে গাইতেও শুনিনি। কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়া গ্রামে যে মাটিতে লালন সাঁইজি শায়িত—সেখানকার শিশু থেকে সাধারণ পর্যন্ত সবাই একটা কথা জানে ও মানে—‘রাতে গোষ্ঠ দিনে রাস যে গাই তার সর্বনাশ।’ এমন সুসংঘবদ্ধ নিয়মের কারণে সাঁইজির গানের বাণীকে যখন তখন গাইতে শোনা যায় না। তাই সাঁইজি দিকনির্দেশনামূলক বহু গানই সাধারণ শ্রোতাদের শ্রুতির অগোচরেই থেকে যায়, কেননা তা সময়ের বিধান মেনে সুনির্দিষ্ট সময়েই গীত হয় এবং তা সচরাচর সাধুসঙ্গেই গীত হয়। আজ আমরা সে আলোচনায় যাচ্ছি না, আজ শুধু একটা বিষয়ের অবতারণা করছি, তা হলো সাধুসঙ্গে লালন সাঁইজির গানের পাঠ নিয়ে।
সাধু-গুরুদের গান তো মৌখিক সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত। অধিকাংশক্ষেত্রে তার লিখিত পাঠ পাওয়া ভার, ক্ষেত্রবিশেষে কিছু কিছু গানের বাণীর লিখিত পাঠ পাওয়া যায়, এ ক্ষেত্রেও সমস্যা হয় একই গানের একাধিক লিখিত পাঠ পেলে, আবার লিখিত পাঠ প্রথমবার আবিষ্কৃত হওয়ার পর আকস্মিকভাবে তা হারিয়ে গেলে এবং কোনো হারানো লিখিত পাঠ নতুনভাবে পুনরায় আবিষ্কৃত হলে, কিংবা লিখিত পাঠের সঙ্গে সাধু-ভক্তদের গাওয়া বা শহুরে শিক্ষিত শিল্পীদের গাওয়া পাঠের মিল-অমিল নিয়েও কখনও কখনও বির্তক ওঠে।
বহু দিন ধরেই দেখে আসছি, সাধু-গুরুদের গানের পাঠ নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থী-গবেষক, এমনকি শিল্পীদের মধ্যেও গবেষণা, বির্তক বা ঝগড়াঝাটির অন্ত নেই। অথচ, এই ঝগড়াঝাটি ও বির্তকের মধ্যে কখনোই প্রায় আলোচনা হতে দেখিনি—গবেষকদের মতো গানের বাণীর পাঠ নিয়ে বির্তক কিন্তু সাধু-গুরুদের সাধুসঙ্গেও নিত্যই হয়ে থাকে। যেখানে গুরুর উপস্থিতিতে শিষ্য গান পরিবেশন করেন সেখানে শিষ্যকে যেমন গানের উত্তর ব্যাখ্যান করতে হয় তেমনি গানের পাঠের ভিন্নতা নিয়েও জবাব দিতে হয়। বাংলাদেশের কুষ্টিয়া, দৌলতপুর, খলিসাকুণ্ডু, মিরপুর, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা অঞ্চলে সাধুসঙ্গে গিয়ে লালন সাঁইজির বিভিন্ন গানের বাণীর পাঠ নিয়ে সাধু-গুরুদের বির্তক দেখার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে।
আজকের আলোচনায় গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০৯ তারিখ চুয়াডাঙ্গা জেলার বেলগাছি ইউনিয়নের অন্তর্গত ফরিদপুর গ্রামে রইসউদ্দিন শাহ’র বাড়িতে অনুষ্ঠিত একটি সাধুসঙ্গে কীভাবে লালন সাঁইজির একটি গানের পাঠ নিয়ে বির্তক উঠেছিল তা উপস্থাপন করছি।
সে সাধুসঙ্গে পূর্ণসেবার আগে গানের অনুষ্ঠানে শব্দগান বা ভাবগানের শিল্পী সানোয়ার হোসেন (২৭) তাঁর ভাঙা দোতরা বাজিয়ে বেশ সুরেলাকণ্ঠে লালন সাঁইজির যে গানটি গাইলেন, তা হলো—
“জাত গেল জাত গেল বলে
একি আজব কারখানা
সত্য কাজে কেউ নয় রাজি
সব দেখি তা না না না \
যখন তুমি ভবে এলে
তখন তুমি কী জাত ছিলে
যাবার বেলায় কী জাত নিলে
এ-কথাটি বলো না \
ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল চামার-মুচি
একই জলে সব হয় শুচি
দেখে শুনে হয় না রুচি
যমে তো কাউকে ছাড়বে না \
গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়
তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়
লালন বলে জাত কারে কয়
এই ভ্রমও তো গেল না \”
গানটি গাওয়া শেষ হতেই সাধুসঙ্গে উপস্থিত বাউলগুরু দিদার শাহ (৮৪) বললেন, ‘গান তো ভালই গাইলে, কিন্তু কথা হলো—ওইখানে কী বললেন— ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’! এটা কি ঠিক?’
সানোয়ার উত্তর করল, ‘আপনারা আমাদের গুরুজন। আমরা যেটা শুনেছি তাই গেয়েছি। ভুল হলে শুধরে দেবার জন্যে আপনাদের মুখ চেয়ে আছি।’
দিদার শাহ বললেন, ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’ এটা বলার অধিকার তোমারে কে দিয়েছে! দুনিয়ায় কতজন সত্য কাজে রাজি আছে। আর তুমি বলছ ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’। সাঁইজি দুনিয়ার লোককে নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না, আমাদের জানার বাইরে বহু লোক আছে যারা সত্য কাজে রাজি আছে। আসলে কথাটা হবে ‘সত্য কাজে মন নয় রাজি’। আমার মন রাজি নেই, অনেকের মনও হয়তো রাজি নেই, তাই কথাটা হওয়া উচিত ‘সত্য কাজে মন নয় রাজি/সব দেখি তা না না না।’ আর একটা কথা বললে—‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়’। এ কথাটাও ঠিক নেই। কারণ, কী জানো?’
সানোয়ার মন্ত্রমুগ্ধের মতো গুরু দিদার শাহের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী গুরু?’
বাউলগুরু দিদার শাহ বললেন, ‘ধর্মের ক্ষতি গোপনে করলেও হয় প্রকাশ্যে করলেও হয়। রোজা রেখে গোপনে ডুব দিয়ে পানি খেলে কি রোজা ভাঙে না মনে করছ! তাই ওই কথাটা বলা ঠিক না—‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে ধর্মের কী ক্ষতি হয়।’ আসলে, কথাটা হওয়া উচিত ‘গোপনে যে বেশ্যার ভাত খায়/তাতে জাতের কী ক্ষতি হয়।’ তা ছাড়া, এই গানটাও তো জাতের গান।’
লালন সাঁইজির গানের প্রচলিত পাঠের সঙ্গে দিদার শাহের বলা পাঠের এই অমিল নিয়ে আমি পরবর্তীতে আরেক সাধুসঙ্গে কুষ্টিয়ার ঘোড়ামারা-ভেড়ামার গ্রামের রওশন ফকিরের সাথে আলাপ করি। রওশন ফকির (৫৪) বলেন, ‘দিদার শাহ প্রবীণ সাধু-গুরু তার কথাকে আমরা অমান্য করতে পারি না। তবে, কথা আছে, সাঁইজির বাণীর কথাবস্তুর অন্য অর্থও আমাদের ভেবে দেখতে হয়, এই গানের বাণীতে বলা ‘সত্য কাজে কেউ নয় রাজি’ কথাটাকে যদি আমার দেহবস্তুর দিকে তাকিয়ে বিবেচনা করি তাহলে তো কথাটা ঠিক আছে—আমার দেহের কোনো কিছুই অর্থাত্ রিপুর বিষয়গুলো কেউই তো সত্য কাজে রাজি নেই, সব সময় তারা তা না না না করে ফিরছে। তাদেরকে রাজি করানোর জন্যই সাঁইজির এই হুঁশিয়ারি—সত্য কাজে কেউ নয় রাজি।’
বাংলাদেশের সাধুসঙ্গে প্রতিনিয়তই গানের বাণীর এমন পাঠ-পাঠান্তর হয়ে থাকে, আর নিশ্চিতভাবেই হয়ে থাকে মুখে মুখেই, তাই প্রায় প্রতি সাধুসঙ্গেই একেকটি গান নতুন নতুনভাবে ব্যাখ্যা হয়। এ বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ খুঁজে ফিরব। আজ এটুকুই। তবে, শেষের আগে আরেকটি কথা বলা উচিত, লালন সাঁইজির নামে প্রচলিত যে গানের পাঠটি নিয়ে এতক্ষণ এত কথা বলা হলো। ২০০৯ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়ায় অনুষ্ঠিত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পরিষদ লালনমেলা সমিতি আয়োজিত লালনমেলাতে যোগ দিয়ে সাধু-ফকির বিশারদ পণ্ডিত শক্তিনাথ ঝা’র সঙ্গে আলোচনার সূত্রে জানতে পারি—উক্ত গানটি ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে গোপাল শাহ’র নামে মুদ্রিত হয়েছিল। শক্তিনাথ ঝা যা তার লালন ‘সাঁই-এর গান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন।৫
তিন
আরেকটি সাধুসঙ্গের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই। ২২ জুন ২০০৭ খ্রিস্টাব্দে যোগ দিয়েছিলাম মেহেরপুর জেলার ফতাইপুরে লালনপন্থী সাধক দৌলত শাহ’র ৪০তম সাধুসঙ্গে। সেদিন শত শত সাধুগুরুদের সমাবেশের মধ্যে বসে তরুণ বয়সী সাধক আব্দুর রাজ্জাক শাহ আমাকে রতির পাঠ দিয়েছিলেন হাউড়ে গোঁসাই-এর একটি গান গেয়ে, গানটি হলো—
‘ব্রজ নিত্য স্থানে সমর্থা যৌবনে
কৃষ্ণ আত্মা অর্পণে বাঞ্ছা হয় যার
শ্রীমতির স্বভাবে আসক্তি প্রভাবে
রতি রসে হয় মিলনও তার \
দেহ রতির গতি আত্ম সুখও ত্যাগী
উন্নত উজ্জ্বলও রসকোটি ভোগী
আনন্দ মোদন করিয়ে বন্ধন
কৃষ্ণানুশীলনে হয় প্রেমেরই সঞ্চার \
বিলাশও পিয়াসা প্রিয়া প্রিয়জনে
দেহ মিলনে ভাব আলিঙ্গনে
রতি সতী নাশে রূপে সদা মেশে
তখন কৃষ্ণ আত্মায় এসে করেনও বিহার \
কামরূপে কান্তি শান্তি কামাচার
কৃষ্ণ সেবা করেন তারা যুক্ত বামাচার
ব্রজের ধর্ম মর্ম বিধি নির্দেশ কর্ম
হাউড়ে বলে রে মন
গুরু কৃষ্ণ ব্রহ্ম আমি দেখি একাকার \’
সাধকশিল্পী আব্দুর রাজ্জাক গানটি গেয়েই শুধু ক্ষান্ত হলেন না, সাধুসঙ্গের নিয়মানুযায়ী গানের শেষে গানটির সূত্রে বুঝিয়ে দিতে তত্পর হলেন রতির প্রকরণ সম্পর্কে। বললেন, জীবনকে পরিপূর্ণভাবে গড়ে তুলতে চাইলে রতি সম্পর্কে জ্ঞান রাখার প্রয়োজন, তাই এই গানের অবতারণা। মনে রাখতে হবে—রতি তিন প্রকার, যথা—সমর্থা, সাধারণী এবং সামঞ্জসী। কিশোর থেকে যৌবন অবধি সমর্থা, যৌবন পরবর্তী সময় সাধারণী আর জীবন সায়ান্নে বা মানব জীবনের পড়ন্ত কাল হচ্ছে সামঞ্জসী রতির সময়।
সেদিন সাধুসঙ্গ থেকে এইটুকু জেনে-বুঝে নোটবুকে টুকে রেখেছিলাম। তারপর হঠাত্ একদিন চৈতন্যমহাপ্রভুর অনুসারী রতিরসতত্ত্বজ্ঞ ও নাট্যকার শ্রীরূপ গোস্বামী প্রণীত ‘শ্রীশ্রীউজ্জ্বলনীলমণিঃ’ পাঠ করতে গিয়ে রতির প্রকরণ পর্বে এসে চমকে উঠি। আরে সাধুসঙ্গে যা জেনেছি সাধুর মুখে তা দেখছি এই গ্রন্থমধ্যে একই ধরনের ব্যাখ্যায় লিখিত রয়েছে।৬ সাথে সাথে মনে হলো, তাহলে কি জ্ঞান চর্চার গুরুপরম্পরার ঐতিহ্যের সমান্তরালে লেখ্যরূপের জ্ঞান চর্চার ধারাবাহিকতা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিতদের অলক্ষ্যেই প্রবাহমান রয়েছে। কিন্তু আমাদের পাণ্ডিত্য দুটি ধারার মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করতে অনেকাংশেই হয়তো ব্যর্থ হয়েছে এবং সম্ভবত এ কারণেই সাধুগুরুদের জ্ঞান চর্চার ধারাবাহিকতাকে যথাযথভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে ওঠেনি।
চার
সাধুগুরুদের সাধনার ধারার প্রধান আশ্রয় কায়া তথা দেহ কেন্দ্রিক সাধনা। প্রাচীন বাংলার চর্যার যুগ থেকে এই কায়াসাধনার সত্য প্রচলিত। চর্যা ও তার জ্ঞানগত পরম্পরা নিয়ে এবারে আমার নিজের কথা নয় সুধীর চক্রবর্তীর কথা উদ্ধৃত করতে চাই, তিনি বলেছেন, ‘লক্ষ্য করে দেখবেন চর্যাপদের গান আমরা যখন কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে পড়েছি—শশিভূষণ দাশগুপ্তের কাছে আমি নিজে চর্যাপদ পড়েছি—উনি পড়ে বলতেন—‘এসব অত্যন্ত কঠিন, নিগূঢ় তত্ত্ব আছে এর মধ্যে— এসব তত্ত্ব এক হাজার বছর আগেরকার তত্ত্ব, এ ভেদ করা যায় না।’ শুনলে অবাক হবেন মাত্র দুবছর আগে একটা গ্রামের মধ্যে গিয়ে এক বৃদ্ধ, অশিক্ষিত ফকিরকে বললাম যে এক হাজার বছর আগেকার কিছু গান শোনাচ্ছি গদ্যে। বললেন, “বলতো কি বলছে?’ আমি চর্যাপদের গান গদ্যে বললাম—লোকটা তার সঙ্গে সঙ্গে মানে করে দিলেন আমার কাছে। শশিভূষণবাবু পারেননি—অতবড় পণ্ডিত পারেননি, আর অশিক্ষিত ফকির বললে ‘আরে এই কথা’— বলে সে তার একটা বাউল গান শুনিয়ে দিল আমাকে। আমি তখন বুঝলাম এক হাজার বছর আগেকার সেই মগ্ন পরম্পরা বয়ে গেছে ওই বাউলের মধ্যে, যা আমার মধ্যে নেই কারণ আমি শিক্ষিত হয়ে গেছি। ওই শশিভূষণবাবুর দলে চলে গেছি। আমি তো পুঁথিপড়া পণ্ডিত হয়ে গেছি। আমি তো জীবনের মূলস্রোত থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছি। সেইজন্য চর্যাপদ আমার কাছে দুর্বোধ্য—কিন্তু ওঁর (বাউলের) কাছে দুর্বোধ্য নয়।’৭
গত প্রায় বিশ বছরের ক্ষেত্রসমীক্ষায় ব্যক্তিগতভাবে আমারও একই ধারণা— আসলেই বাংলার লোকায়ত জীবনের সঙ্গে হাজার বছরের জ্ঞান চর্চার ধারাবাহিকতা কোনো না কোনোভাবে প্রবাহমান রয়েছে। কিন্তু গ্রন্থকেন্দ্রিক পাঠ অভিজ্ঞতার সাথে মিলন প্রয়াসী ক্ষেত্রসমীক্ষায় নিবেদিত গবেষণাকর্মীর অভাবে সাধুগুরুদের জ্ঞান চর্চার ঐতিহ্যিক পরিচয়ের কথা আমাদের কাছে অনেকটাই অজানা রয়ে গেছে।
তথ্যনির্দেশ
রমাকান্ত চক্রবর্তী ও শক্তিনাথ ঝা, গুরু : তত্ত্ব, পূজা, পরম্পরা, কলিকাতা : অবভাস, ২০০৮, পৃ. ৪৮
শক্তিনাথ ঝা, বাউল সনাক্তকরণ সমস্যা ও লালন, কলিকাতা : সূচনা, ১৯৯৩, পৃ. ৫-৬
যতীন সরকার (সম্পাদিত), জালালগীতিকা সমগ্র, ঢাকা : নন্দিত, ২০০৫, পৃ. ৭৭
আরজ আলী বয়াতী জানান—ঘটনাটি সত্য এবং এই ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে মাগুরা জেলার মাগরো গ্রামে লুত্ফর চেয়ারম্যানের বাড়িতে।
শক্তিনাথ ঝা (সম্পাদিত), লালন সাঁই-এর গান, কলিকাতা : কবিতাপাক্ষিক, ২০০৫, পৃ. ২১৭
প্রয়োজনে দেখুন, শ্রীরূপ গোস্বামী (প্রণীত), শ্রীশ্রীউজ্জ্বলনীলমণিঃ, হরিদাস দাসেন (সম্পাদিত), কলিকাতা :সংস্কৃত পুস্তক ভাণ্ডার, ২০০৮, পৃ. ৩৮৬-৩৮৯
সুধীর চক্রবর্তী, লালন এবং তাঁর সমকালীন লোকধর্ম, কলিকাতা : সূচনা, ১৯৯৪, পৃ. ১৫