কারুশিল্প সার্বজনীন
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:০৮
পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির ধারণ ও চর্চার পাশাপাশি সব শ্রেণীর মানুষের সম্মিলনে পালন করা হয় এ দিনটি। আমাদের ঐতিহ্যমণ্ডিত সংস্কৃতির এক প্রধান অংশই হচ্ছে এই প্রাণের উত্সব। নববর্ষ পৃথিবীর প্রতিটি জাতিকেই উজ্জীবিত করে, অনুপ্রেরণা জোগায় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। বাংলাদেশের মানুষ তথা বাঙালিরাও এ থেকে পিছিয়ে নেই। বরং একধাপ এগিয়ে আছে বলা চলে। কারণ বাঙালির আতিথেয়তা এবং উত্সবমুখরতা অন্য যেকোনো জাতির চেয়ে সরস বললে ভুল হবে না। নববর্ষ উপলক্ষে একে অপরকে এটা-ওটা উপহার দেওয়ার রেওয়াজ বহু দিনের। আধুনিক শহর জীবনে সেটা যেন আরও বেড়েছে। শুধু পহেলা বৈশাখই নয়, যেকোনো উত্সব-পার্বণকে কেন্দ্র করেই উপহার আদান-প্রদানের হিড়িক পড়ে যায়। বাংলা নববর্ষের সঙ্গে যেহেতু গোটা বাংলা সংস্কৃতিটাই সম্পর্কযুক্ত, তাই উপহার বিনিময় করার সময় এ বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া যেতে পারে। আমরা সচরাচর যে ধরনের উপহার প্রিয়জন কিংবা কাছের মানুষকে দিয়ে থাকি এ থেকে বেরিয়ে এসে নজর দিতে পারি দেশীয় পণ্যের দিকে। যেমন কোনো বন্ধুকে উপহার দেওয়ার সময় কাঠ, বাঁশ বা বেতের তৈরি ছোট কিন্তু আকর্ষণীয় শো-পিস উপহার দিতে পারি। গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা গুণী শিল্পীদের হাতে তৈরি অনেক মূল্যবান ও চমত্কার কারুশিল্প নগরীর বিভিন্ন অভিজাত দোকানে বিক্রি হচ্ছে। এসব কারুশিল্পের মাঝে দৈনন্দিন ব্যবহার্য ছোটখাটো জিনিসপত্র যেমন আছে, তেমনি আছে সৌন্দর্যপিপাসুদের মন ভরানোর মতো বিভিন্ন উপকরণ। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনার কোনো বান্ধবীকে হয়তো আপনি একটি ভালো আয়না উপহার দিতে চাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে আপনি শরণাপন্ন হতে পারেন কারুশিল্পের। কারণ বর্তমানে মাটির ফ্রেমে আটকানো চমত্কার সব আয়না পাওয়া যায়। তেমনিভাবে বিভিন্ন কারুকার্যের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের মানচিত্র ও গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্র সংবলিত পটারি, কাঠের ফ্রেমের ঘড়ি, ঘণ্টি ইত্যাদি। কাঠ, সুতা, পুঁতি ইত্যাদির তৈরি বালার ব্যবহার তো অনেকদিন ধরেই লক্ষ করা যাচ্ছে। আবার মা-বাবা বা বন্ধু-প্রিয়জনদের উপহার দিতে গেলে আমাদের ঝোঁকটা কাপড়-চোপড়ের দিকে বেশি থাকে। এই নববর্ষে এ থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেননি। তাদের উপহার দেওয়ার চেষ্টা করুন এমন কিছু জিনিস, যা তাদের দৈনন্দিন কাজে লাগবে। দিতে পারেন কারুপণ্যের ঘর সাজানোর সামগ্রী, যদি আপনার মা কিংবা শাশুড়ির ঘর সাজানোর সখ থাকে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি আগেই জেনে নেওয়া যায় যাকে উপহার দেবেন তার পছন্দের বিষয় কী। তবে আপনার যদি কাউকে পোশাক কিনে দেওয়ার একান্তই ইচ্ছা থাকে, এ ক্ষেত্রে দেশীয় পোশাকই বাছাই করুন। শিশুদের উপহার দিতে চাইলে বিভিন্ন দেশীয় খেলনা সামগ্রী দিতে পারেন, যা তার পছন্দ। আমাদের সমাজ জীবনে কারুশিল্প মেলার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন আয়োজনে গ্রামীণ কারুশিল্পীরা তাদের নিজস্ব ধারণা থেকে তৈরি কারুশিল্পজাত পণ্য মেলায় বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন। ঢাকার বৈশাখী মেলা, চট্টগ্রামের আবদুল জব্বারের বলীখেলা—এ রকম প্রতিটি জেলা শহর ও উপশহরে কোনো না কোনো উপলক্ষে মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। যেখানে শহরের মানুষের যাপিত জীবনের প্রতিদিনের কাজে ব্যবহূত সামগ্রীর সন্ধান পাওয়া যায়। তেমনি কিছু কিছু কারুশিল্পীর রূপান্তরিত কারুপণ্যও সমাদৃত হচ্ছে। পোড়ামাটি, শোলা, পাট, কাঠ, ধাতব, ধান, পাতা, বাঁশ, বেত ইত্যাদি উপকরণে নির্মিত বিভিন্ন ধরনের বৈচিত্র্য্যময় কারুপণ্য মেলার নিজস্ব ধারাকে চিহ্নিত করেছে। স্বাধীনতার পর সত্তর ও আশির দশকে বিভিন্ন এনজিও, সামাজিক ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ কারুশিল্পীদের সৃজনশীল পণ্যের আঙ্গিক ও রূপান্তর নিয়ে ভাবতে শুরু করে। পরে কারুশিল্পীদের সঙ্গে নগরকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানগত পৃষ্ঠপোষকা শুরু হয়। আশির দশকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শিল্পী কামরুল হাসান কারুশিল্প নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেন। এরপরই জন্ম হয় বিসিকের। পরবর্তীকালে আড়ং, সেতুলী, কুমুদিনী, কারিকা তাঁতবস্ত্রের পাশাপাশি কারুশিল্পের জন্য সহায়তা করে। এরপর অরণ্য ক্রাফটস, যাত্রা, দেশী দশ, স্বদেশীও এই ধারাকে গতিশীল করেছে। দেশীয় কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে গতিশীল করতে বেসরকারি সংস্থাগুলো নানামুখী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এতে শহর ও গ্রামের অবহেলিত বা সুবিধাবঞ্চিত নারীরা কারুশিল্পের কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। নানা প্রশিক্ষণের পর তারা তৈরি করছে টুপি, নকশিকাঁথা, রঙ্গিন কাঁথা সেলাই, বিছানার চাদর, কুশম কভার, ওয়ালম্যাট, পাঞ্জাবি-ফতুয়া, গায়ের চাদর, থ্রি-পিস, হ্যান্ডব্যাগ, ভ্যানিটিব্যাগ, মোবাইল ফোনের ব্যাগসহ নানা রকম জিনিস। বাংলাদেশের কারুপণ্যের বিশ্বভ্রমণের প্রেক্ষাপটও উল্লেখযোগ্য। বিশ্বে রপ্তানির সম্ভাবনার আলোকরেখা দেখিয়েছে বেশ কিছু কারুপণ্যের প্রতিষ্ঠান। কারুপণ্যের রপ্তানিমুখী নতুন দিক একই সময়ে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক সহায়ক সেক্টর হিসেবেও চিহ্নিত করে। রাজধানী ও দেশের বড় বড় শহরে কারুপণ্যের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঢু মারলে আপনি দেখতে পাবেন ঝোলা ব্যাগ, রুপার গয়না, কানের দুল, চাবির রিং, বিউটি বক্স, টি-শার্ট কী নেই! সবকিছুতেই প্রকাশ পাচ্ছে অনেক যত্ন ও ভালোবাসার ছোঁয়া। প্রত্যেক জিনিসেই ফুটে উঠেছে এ দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির চিত্র। কেউ যদি গ্রামীণ কোনো উপকরণ তৈরি করেছেন তো আরেকজন সেসব সহজলভ্য গ্রামীণ উপকরণ দিয়েই তৈরি করেছেন নতুন কোনো কিছু। সর্বত্র বাঙালিয়ানা ছোঁয়া দিতে ক্রমবর্ধমান নগরবাসীর পরিবেশবান্ধব মনোভাব, দেশ ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসাই কারুশিল্প এখন হয়ে উঠেছে সার্বজনীন।