চৈত্র সংক্রান্তিতে চড়ক উত্সব
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:০২
চৈত্র সংক্রান্তিতে বাংলাদেশ হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাদের প্রথাগত চড়ক পূজা উত্সবে মেতে ওঠেন। ঐতিহ্যগত চড়ক উত্সবের চল বা প্রভাব শহুরে বা এখনকার নগরজীবনে তেমন চোখে না পড়লেও পল্লী বাংলার বহমান জীবনধারায় হারিয়ে যায়নি চড়ক উত্সব। দেশের বহু স্থানেই চড়কগাছ স্থাপন করে বসে চড়ক পূজার উত্সব। ভক্ত আর কৌতূহলী মানুষের কাছে এখনো আকর্ষণ চড়ক উত্সব। বিস্ময়মিশ্রিত কৌতূহলী আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এখনো গ্রামীণ মানুষ অপেক্ষা করে চড়ক উত্সবের।
নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) থেকে জানান, বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে আজ রবিবার কমলগঞ্জ উপজেলার ছয়চিরী দীঘির পাড়ে চড়ক পূজা ও মেলা শুরু হচ্ছে। পূঞ্জিকামতে প্রতিবছর চৈত্র সংক্রান্তিতে ২ দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় চড়ক উত্সব। প্রায় দুইশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা ও মেলাকে কেন্দ্র করে হিন্দু সমপ্রদায়ের মধ্যে উত্সাহের আমেজ বিরাজ করছে। ২ দিনব্যাপী এ চড়ক পূজা ও মেলা শেষ হবে সোমবার। ঐতিহ্যবাহী চড়ক পূজা দেখতে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে হাজার হাজার লোকের ঢল নামবে।
চড়ক পূজার ২ দিন পূর্বে পূজারীরা শ্মশানে গিয়ে পূজা-অর্চণা করেন ও শেষে গৌরীর বিয়ে, গৌরীনাচ ও বিভিন্ন গান গেয়ে ঢাকের বাজনায় সরগরম করে গোটা এলাকা। ছয়চিরী দীঘির পাড়ে ভক্তরা নৃত্য করার জন্য কলাগাছ ও বাঁশের খুঁটি বেষ্টিতমণ্ডলী তৈরি করে। পূজার প্রথম দিন নিশি রাতে তান্ত্রিক মন্ত্র ধারা কাঁচ পড়া দিয়ে জ্বলন্ত ছাইয়ের উপর মানুষরূপী কালী সেজে নৃত্য করে। অন্য ভক্তগণ নৃত্যের তালে তালে, ছন্দে ছন্দে ঢোলক, কাশি, করতাল বাজিয়ে থাকেন। জ্বলন্ত আগুনের মধ্যে এই ‘কালীনাচ’ অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং তান্ত্রিক মন্ত্র দিয়ে ৭টি বলিছেদ (লম্বা দা)-এর উপর শিব শয্যা করেন। শিবের উপর উঠে কালী ভয়ানক এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করেন। কালীকাঁচ শেষ হওয়ার পর সকালে পূজারীরা পূজা করে পানবাটা দিয়ে চড়ক গাছকে নিমন্ত্রণ জানানো হলে পার্শ্ববর্তী ঐতিহাসিক ছয়চিরী দীঘি থেকে ভেসে উঠে ১০০ ফুট লম্বা চড়কগাছ। এ গাছের চূড়া থেকে মাচা পর্যন্ত চারটি পাখার মতো করে বাঁধা হয় চারটি মোটা বাঁশ এবং তাতে যুক্ত করা হয় মোটা লম্বা রশি। আগের বছর উত্সব শেষে এই দীঘিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল চড়কগাছ। দীঘির পাড়ে গর্ত খুঁড়ে সোজা এবং খাড়া করে পোঁতা হয় এ গাছ।
প্রথম দিন বিকেলবেলা ভক্তরা মণ্ডলীতে বিশাল দা দিয়ে নৃত্য, শিবের নৃত্য ও কালীর নৃত্য দেখানো হয়। নৃত্যশেষে ছয়চিরী দীঘিতে স্নান করে ভক্তদের শরীরের বিভিন্ন অংশে লোহার শিক গাঁথা হয়। জিহ্বা ও গলায় গেঁথে দেয়া হয়। নৃত্যের তালে তালে চড়কগাছ ঘুরানো হয়। দেবতার পূজা-অর্চণাশেষে অপরাহ্নে ৪ জন ভক্তের পিঠে লোহার দুইটি করে বড় আকৃতির বঁড়শি গেঁথে রশিতে বেঁধে ঝুলিয়ে চড়কগাছ ঘুরানো হয়। এ সময় দর্শনার্থীদের অনেকে বাতাসা আর কলা উপরের দিকে উড়িয়ে দেন আর দর্শনার্থীরা তা কুড়িয়ে নেন। সোমবার ফেরা চড়ক পূজা অনুষ্ঠিত হবে। বিশাল মেলা বসবে। মেলায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের বিভিন্ন রকমারী জিনিসপত্র থাকবে।
যুগ যুগ ধরে এ চড়ক উত্সব এ অঞ্চলের হিন্দুদের বেশ নাড়া দিয়ে আসছে। বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দুইদিন ও ১ বৈশাখ বসে মেলা। শেষ চৈত্রের গোধূলিলগ্নে চড়কগাছ মাটিতে পুঁতে ঘুরানো হয়। এর আগে ভক্ত ও পূজারীরা চড়কগাছে ফুল, দুধ ও চিনি দিয়ে পূজা দেয়। চড়ক পূজা উদযাপন কমিটির নেতা প্রধান শিক্ষক অসমঞ্জু প্রসাদ রায় চৌধুরী জানান, রহিমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক সহযোগিতায় ইতিমধ্যে চড়ক পূজা ও মেলার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।