বৈশাখ বন্দনার পূর্বাপর

পূর্বাপর যোগে সংসারের সকল নিয়ম সদা চলমান। কালের কেশ পক্ব হলে তাকে হয়তো বলি অতীত। আমরা যাকে ফেলে এসেছি। আর কাঁচাকে বর্তমান বলে হয়তো গর্ববোধ করি। কিন্তু অতীত আরো ঋদ্ধ-হয়তো সে গৌরবের ধন। তাকে অস্বীকারের কোনো উপায় নেই। তবে এও সত্য যে, বর্তমানকাল অবশ্যই বহু মূল্যবান। তার দুই কাঁধে অতীত ও ভবিষ্যতের দায়ভার- কোনটাকে ফেলে সে যাবে কোন দিকে? প্রাচ্যের মহাপণ্ডিত পাণিণি কৃত থিয়েটার সংশ্লিষ্ট সূত্রটির কথা মনে পড়ছে। এই অবিস্মরণীয় প্রাচ্য শিল্পতত্ত্বে অতীত ও ভবিষ্যতের আধারে বর্তমানকে ন্যস্ত করতে দেখা যায়। সে সূত্রমতে থিয়েটার সর্বদা বর্তমানকেই অভিনন্দিত করে তুলে। সময়বৃত্তে বাঙালির ঋতু পরিক্রমায় বৈশাখ বন্দনাকে হয়তোবা এই প্রাচ্য শিল্পতত্ত্বের সঙ্গে সাযুজ্য জ্ঞান করা যেতে পারে। কারণ বন্দনা বর্তমানের ঘরে বসে অতীত আবাহনে হয়ে ওঠে উজ্জ্বলতর। এবং তার অভিগমন ভবিষ্যতের পথে পথে। এই অভ্রান্ত গন্তব্য সত্যকে স্বীকার করেই হয়তো বাঙালির বৈশাখ বন্দনা। হে বৈশাখ— তোমার জন্য বিশাখা নক্ষত্রকে প্রণতি। খগোল শাস্ত্রোক্ত সাতাশ নক্ষত্রের একটি এই বিশাখা। পণ্ডিতদের ধারণা, বিশাখা নক্ষত্র যোগেই বৈশাখের উত্পত্তি হয়েছে। সেজন্য সৌরমণ্ডল বা আকাশের আবর্তনের সঙ্গে মাস ঋতুর আগমনকে আমরা প্রত্যক্ষ করি। হয়তো অদৃশ্য এক নিয়মেই ঋতু মাস আসে- নদীর জোয়ার-ভাটার টানে দুলে ওঠা ভুবনে তার সকল বিকাশ ও প্রকাশ। আমরা মানব সন্তান তাকে আবাহন গীতে স্তুতি বন্দনায় নৃত্যে-কৃত্যে অনিবার্যরূপে গ্রহণ করি। হে বৈশাখ- এসো এসো। মর্ত্যভূমিতে নিশ্চিতই বৈশাখ এসেছিল প্রাগৈতিহাসিককালে। কোন আভরণে কি বৈষয়িক বারতা নিয়ে- জানা নেই। তবে ইতিহাসকালের অনুসন্ধানে তার নানা অদৃশ্যের মুরতি আমরা দেখতে পাই। হয়তো কোনোকালে চন্দ্র শশী তারকা গ্রহাণুপুঞ্জের অভিরাম ছন্দ ও নৃত্যানন্দে মানব মনে জেগে উঠেছিল বৈশাখ- সেদিন কী নামে ছিল এই মাস- তা নিতান্তই অনুমান ও অনুভবের বিষয়। তবে বিশাখার যোগসূত্রে হয়তো তার অস্তিত্বের ভেতরে বৈশাখ অভিধাটি যুক্ত হয়েছে। বাংলা সনের গণনা কবে থেকে শুরু হয়ে তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতান্তর লক্ষ্য করা যায়। তবে নানা প্রমাণাদি ও পর্যবেক্ষণের সূত্রে বিষয়টি অবশ্য অমীমাংসিত থাকেনি। প্রাথমিকভাবে ৫৯৩-৯৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বাংলা অব্দ বা বঙ্গাব্দের সূচনাকে স্বীকার করা হয়ে থাকে। পণ্ডিত সিলভ্যাঁ লেভি ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে বাঙ্গালা অব্দের শুরুর সঙ্গে ‘সন’ কথাটির ব্যুত্পত্তি তিব্বতি নৃপতি রি-স্রঙ-সন অথবা তদীয় পুত্র সঙসনগাম- পোর নামের আধারে অনুমান করেন। পিতার রাজ্যাভিষেক কিংবা পুত্রের জন্ম উপলক্ষে এই অব্দের আরম্ভকাল বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তবে উভয়ের নামের একাংশের সঙ্গে বঙ্গাব্দের সঙ্গে ব্যবহূত ‘সন’ -এর সাযুজ্য বিদ্যমান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আরবি ‘সন’ অর্থাত্ বত্সরের সঙ্গে বঙ্গাব্দে ব্যবহূত ‘সন’ এর ঐক্যসূত্র আছে বলেও ধারণা করা হয়ে থাকে। তবে পণ্ডিতদের অনুসন্ধানে জানা যায়, গৌড় বঙ্গের রাজা শশাঙ্কের আমলেই বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। কিন্তু এতে মতান্তর লক্ষ্য করা যায়। কারণ মহামতি আকবরের রাজত্বের পূর্বে বাংলা সন কিংবা বঙ্গাব্দের প্রচলন সম্পর্কিত নিশ্চিত কোনো প্রমাণ নেই। আকবর রাজ্যবর্ষকে সৌরবর্ষ হিসেবে গণনা করেন খুব সম্ভব রাজ্যশাসন ও রাজস্ব আদাযের সুবিধার্থে। সে কারণে এই বাংলা সনের শুরু এবং বৈশাখের সঙ্গে বাংলার কৃষ্যভূমির সম্পর্ককেও অনিবার্য জ্ঞান করি। একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, বাঙালির জীবনায়ন কৃষিভিত্তিক সমাজকে কেন্দ্র করে। এবং তদবিবেচনায় বাংলার কৃষিকেন্দ্রিক কৃত্যাদি ও আচার-অনুষ্ঠান বৈশাখ বা বর্ষবরণের মূলে বিশেষভাবে অন্বিত। কথায় বলা হয়ে থাকে— বাঙালির বারো মাসে তের পার্বণ। তবে এসব পরিবর্তনের মধ্যে ভিন্নতা ও ঐক্যের সূত্র লক্ষ্য করা যায়। বৈশাখ পার্বণের কথা যদি বিবেচনা করি, এখানেও অঞ্চল ভেদে তার বিশেষ বৈচিত্র্যকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। শুধু আঞ্চলিকতা কেন, সময়গত কারণেও বিভিন্ন ও বৈচিত্র্যের সন্ধান লভ্য। কিন্তু তবুও বৈশাখে অঞ্চল সীমানায় কালে কালে বন্দনার ঐক্যতানকে লক্ষ্য করা যায়। আদিতে বাঙালির বৈশাখ বন্দনার পূর্বাপরে চৈত্রসংক্রান্তি ও পুণ্যাহ— এই দুই কৃত্যানুষ্ঠানকে স্মরণ করা যায়। উল্লেখ্য যে, মুঘল আমলে বছর শেষে চৈত্রমাসে বাংলার কৃষক সম্প্রদায় জমিদার বা ভূস্বামীদের খাজনা পরিশোধ করতেন— একেবারে চৈত্রমাসের শেষদিন পর্যন্ত। এবং অতঃপর পরদিন নতুন বছরে ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। এই প্রথাকে পুণ্যাহ হিসাবে অভিহিত করা হতো। এবং তা হয়তো আনন্দেরও। প্রজা বা রায়তরা যখন পুণ্যাহ উত্সবে আসতো তারা তখন বিভিন্ন পণ্যাদি ভূস্বামীদের জন্য ভেট হিসেবে আনতো। ব্রিটিশ শাসনের অবসিত কালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির কারণে এখন আর পুণ্যাহ উত্সবের প্রচলন নেই। তবে বাংলাদেশের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে এখনও আরেক ধরনের পুণ্যাহ প্রথার প্রচলন অস্তিমান। কারণ যেহেতু সেখানে রাজা বা গোত্রপ্রধান প্রথা প্রচলিত, সেহেতু রাজাকে আনুগত্য ও সম্মান প্রদর্শন নিমিত্ত পুণ্যাহ উত্সবের আয়োজন হয়ে থাকে। তাকে রাজ পুণ্যাহ বলা হয়ে থাকে। বৈশাখ বরণের অন্য আয়োজন ‘হালখাতা’ আবহমানকাল থেকে বাঙালির গ্রামীণ ও ব্যবসায়িক জীবনে চলে আসছে। তবে ইদানিং তার বিবর্তন ও ব্যবহার তত্পরতাও কমে এসেছে। সমকালীন যান্ত্রিক জীবনে মানুষ অনুষ্ঠানাদি আয়োজনের বিষয়টি থেকে হয়তো খানিক দূরে সরে এসেছে। এজন্য ‘হালখাতা’ হয়তো আগের মতো এতটা ঘটা করে আয়োজন করা হয় না। তবে এর মধ্যদিয়ে মানুষের অর্থাত্ ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক তৈরির একটা প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বত্সরান্তে চৈত্র-সংক্রান্তির সঙ্গে বৈশাখ বা সময়ের চলমানতার সূত্রটি চড়ক পূজার মধ্যে লক্ষণীয়। চড়ক পূজার সন্ন্যাসীরা ‘চড়কগাছ’ নামে অভিহিত এক স্তম্ভে ‘বান-ফোঁড়া’ অবস্থায় চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। বলা বাহুল্য, সংস্কৃত ‘চক্র’ শব্দ থেকে চড়ক শব্দটি উত্পন্ন হয়েছে। এবং এই চক্রের মূলে চক্রভ্রমণ অর্থাত্ বর্ষচক্র সমাপনের সূত্রটি লভ্য। একে ‘ঘূর্ণন উত্সব’ও বলা হয়ে থাকে। আর ঘূর্ণনের মধ্যদিয়েই তো চৈত্র সমাপনান্তে বৈশাখের বন্দনা কৃত্য হয়ে ওঠে। চৈত্র সংক্রান্তিতে উত্সবের পাশাপাশি ঝড়ের আভাসও লক্ষ্য করা যায়। ঝড় শুধু বৈশাখের শুরুতে কিংবা বৈশাখ সায়াহ্নকালে কালবৈশাখীর অবয়বে আসে না। চৈত্রের শেষ দিবসেও তার উপস্থিতি প্রত্যক্ষ করেন রবীন্দ্রনাথ। উল্লেখ্য যে, ১৩০৫ সালে ৩০শে চৈত্র ঝড়ের দিনে রচিত তাঁর ‘বর্ষশেষ’ শীর্ষক কবিতার শুরুটা লক্ষণীয়— ঈশানের পুঞ্জমেঘ অন্ধবেগে খেয়ে চলে আসে বাধাবন্ধহারা গ্রামান্তের বেণুকুঞ্জে নীলাঞ্জনছায়া সঞ্চারিয়া, হানি দীর্ঘধারা। বর্ষ হয়ে আসে শেষ, দিন হয়ে এল সমাপন, চৈত্র অবসান— গাহিতে চাহিছে হিয়া পুরাতন ক্লান্ত বরষের সর্বশেষ গান। উক্ত ‘বর্ষশেষ’ কবিতায় ঝড়-উত্থিত মাঠ প্রান্তরে ধেনুগণ সাথে চাষিগণের ঊর্ধ্বমুখে ছুটে চলা, কালবৈশাখীর নৃত্যের আবাহনের মধ্যদিয়ে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণের কথাটি অভিব্যক্ত হয়েছে। তবে তাতে গীতভাষের আভাসে নতুন দিনের সংকেতধ্বনি শোনা যায়; যেমন— নবাঙ্কুর ইক্ষুবনে এখনো ঝরিছে বৃষ্টিধারা বিশ্রামবিহীন, মেঘের অন্তরে-পথে অন্ধকার হতে অন্ধকারে চলে গেল দিন। শান্ত ঝড়ে, ঝিল্লিরবে স্নিগ্ধ গন্ধোচ্ছ্বাসে, মুক্ত বাতায়নে বত্সরের শেষ গান সাঙ্গ করি দিনু অঞ্জলিয়া নিশীথ গগনে। অতঃপর নিশীথ রাত্রির শেষে আসে বৈশাখ। তবে পুনশ্চ চৈত্র সংক্রান্তির ‘শিবের গাজন’ বা শিবোত্সবে’র কথা উল্লেখ করাকে প্রাসঙ্গিক মনে করছি। কারণ শিব বাঙালির কৃষিদেবতা। সেজন্য উক্ত উত্সবের সঙ্গে বাংলার কৃষি সংশ্লিষ্টতার সূত্রটি অবশ্য লভ্য। কিন্তু বাংলার অতীত ও বর্তমানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় শিবোত্সবের আনুষ্ঠানিকতা যেন আর আগের মতো হয়ে ওঠে না। রবীন্দ্রনাথ ‘বৈশাখ’ কবিতায় ভৈরব অথবা রুদ্রকে স্মরণ করতে গিয়ে বাংলার কৃষি-ভূমির করুণ দৃশ্যটির কথাও তো ব্যক্ত করেন- দীপ্তচক্ষু হে শীর্ণ সন্ন্যাসী, পদ্মাসনে বস আসি রক্তনেত্র তুলিয়া ললাটে, শুষ্কজল নদীতীরে শস্যশূন্য তৃষাদীর্ণ মাঠে উদাসী প্রবাসী- দীপ্তচক্ষু হে শীর্ণ সন্ন্যাসী। বাংলার কৃষক দেবতা শিবকে কবি বৈশাখ কবিতায় শুধু বৈশাখের ভৈরব কিংবা রুদ্রমূর্তি নয়, বরং প্রাকৃত জীবন-অন্বিত বিষয়াদির সঙ্গে মেলাতে চেয়েছেন। কালে কালে তা হয়তো মিলেও যাবে। কিন্তু বৈশাখের নানাবিধ উত্সব ও মেলার প্রাসঙ্গিকতার ঘরে বহু বর্ণিল অধ্যায়ের বিবর্তন আমরা একালে লক্ষ্য করি। কেন? হয়তো দিন বদলানোর সঙ্গে মানুষের বৈষয়িক চাহিদা ও রুচিবোধ বদলে গেছে। বাঙালির লোকসংস্কৃতি তথা লোকউত্সব ও মেলার অনুষঙ্গাদিও বিবর্তনের ঘরে বসবাস করছে। লোককৃত্যের আনন্দধামে তবুও এসেছে বৈশাখ। তার বন্দনা-গীতে আমরা যেন হয়ে উঠি আরো প্রকৃত বাঙালি। চণ্ডালিকার সেই বিখ্যাত গানটির কথা মনে পড়ছে- চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে। চক্ষে আমার তৃষ্ণা। আমি বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন, সন্তাপে প্রাণ যায় যায় যে পড়ে। ঝড় উঠেছে তপ্ত হাওয়ায় হাওয়ায়, মনকে সুদূর শূন্যে ধাওয়ায়- অবগুণ্ঠন যায় যে উড়ে... এই গানে প্রকৃতি যেন আপনা জীবনবৃত্তে বৈশাখের নিদাঘের মধ্যদিয়ে বরষার নতুন প্রাণ প্রত্যাশী হয়ে উঠেছে। সমকালীন জীবন ভাবনায় আমরাও সে নবীব আশাপূর্ণ ত্রিসন্ধ্যার প্রত্যাশায় বৈশাখকে বরণ করি। এবারের বৈশাখ বন্দনায় তবে আর কোনো স্তুতি নয়। মেঘগম্ভীর বরিষণ-অন্তে শান্ত নীলাভ্রের স্বপ্ন দেখি। সবাকার মঙ্গল হোক।