চাই শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন

বাংলাদেশের অহংকার তিনি। শুধুই কী বাংলাদেশের? প্রতিটি বাঙালিরও কী নয়! বাঙালিত্বের বোধকে সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার, আপন সংস্কৃতির শক্তিতে বিকশিত করার প্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন সারা জীবন ধরে। তাঁর চলায়, বলায়— অশিক্ষা, কূপম্লুকতা দূর করে মানুষের মনে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাতিঘর জ্বালাতে নিরন্তর সাধনা করে চলেছেন। তিনি সন্জীদা খাতুন। শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত এক নাম। বাঙালির চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক উত্সবকে অবলম্বন করে জাতীয় জীবন থেকে সাম্প্রদায়িকতার বীজকে উপড়ে ফেলতে ছায়ানট রমনা বটমূলে শুরু করেছিল বৈশাখ উদযাপন। সেই উত্সব আজ সারাবিশ্বের বাঙালি কাছে এক প্রাণের উত্সবে পরিণত হয়েছে। এ উত্সব উদযাপনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব ছায়ানটের প্রাণমাতা সন্জীদা খাতুন। তিনি নিরন্তর সাধনা আর লক্ষ্যে অবিচল থেকে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক। শক্ত হাতে হাল ধরে ছায়ানটকে নিয়ে এসেছেন এক অনুকরণীয় অবস্থানে। গতবছর ভারতের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে দেশিকোত্তম উপাধিতে ভূষিত করে। সেই অর্জনের পর দৈনিক ইত্তেফাককে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ইত্তেফাক: মানুষের মনে সংস্কৃতির বোধ সঞ্চারিত করার ক্ষেত্রে প্রধান বাধাটা কোথায়। দেশের শিক্ষা কাঠামোর গ্লি পেরুনো মানুষও সবসময় সংস্কৃতিবান হন না। এই দ্বন্দ্বটা কেন? সন্জীদা খাতুনঃ ১৯৬৭ সাল সেই পরাধীনতার আমল থেকে নববর্ষের আবাহনী করে আসছি। তখন প্রাণে স্বতস্ফূর্ততা ছিল। সেই উচ্ছাসে ২০০১ সালে আঘাত আসে। বোমা হামলা হয়। এরপর ছায়ানট নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই হিংসাত্মক আচরণ মানুষের স্বাভাবিক আচরণ নয়। এই হিংসা অশিক্ষা থেকে এসেছে। মুখস্ত করে খাতায় উগরে দিলে তা শিক্ষা হয় না। সত্যিকারের শিক্ষার জন্য সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ অপরিহার্য। এ পথেই উদ্ধার সম্ভব। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির যোগ না ঘটলে এদেশ থেকে অজ্ঞানতা, অজ্ঞতা দূর হবে না। অন্তর থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর হলেই আমরা মানুষ হতে পারবো। হতে পারবো সম্পূর্ণ বাঙ্গালী।’ প্রশ্নঃ পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রে যে বিভেদ ছিল সেই বিভেদ আজো কাটেনি। অসাম্প্রদায়িক স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও সেই বিভেদ কাটাতে ব্যর্থ হলাম আমরা। সন্জীদা খাতুনঃ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সাম্প্রদায়িক মনোভাবকে প্রশ্রয় দেয়া শুরু হয়েছিল সেই পাকিস্তানি আমল থেকেই। বাংলাদেশে অগণতান্ত্রিক ও মৌলবাদী সমর্থনপুষ্ট সরকারগুলো সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে। এটা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে জাতি ও রাষ্ট্রের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির জন্য। বাঙালি মানে হিন্দু এই ধারণা রাজনৈতিক উদ্দেশে ছড়ানো হয়েছে। তার প্রভাব জাতির মাঝে আজো রয়েছে। পাঠ্যপুস্তকে চিরায়ত বাংলার ইতিহাস বর্ণণার চাইতে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা ইতিহাসকে আমাদের বলে চালানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু কষ্টের বিষয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি ক্ষমতায় থাকলেও এসব সংশোধনের উদ্যোগ নেই। তারা রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তারা বুঝতে পারে না শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার মাঝ থেকে এই সাম্প্রদায়িক মনোভাব দুর করা না গেলে তা থেকেই যাবে। এটা কিন্তু মৌলবাদী মতাদর্শের দলগুলো ভালো বোঝে। তাই তারা শিক্ষাকে বেছে নিয়েছে। সে কারণে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে ধর্মীয় গোঁড়ামি আরো জেঁকে বসেছে। ইত্তেফাকঃ কিন্তু আমরা তো একটা যুগোপযোগী শিক্ষা নীতি পেলাম। সন্জীদা খাতুনঃ আমাদের যে শিক্ষানীতি প্রণীত হয়েছে এটা একটা বিশাল কাজ হয়েছে। অথচ এই শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে সরকারের টাকার অভাব পড়ে। এছাড়া বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রতিক্রিয়াশীল চক্র বসে রয়েছে। ফলে অনেক ভালো উদ্যোগও কার্যকর হয় না। যখন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির দলগুলো এসব সংশোধনে নজর দেয় না তখন তার দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধরন মানুষদের, আমাদের। শুধু বিদেশে ডেলিগেশন পাঠিয়ে আর অনুষ্ঠান করে সংস্কৃতির বিকাশ হয় না — এটা সরকারকে বুঝতে হবে। ইত্তেফাকঃ তাহলে অপনি কী হতাশ? সন্জীদা খাতুনঃ যতই ধুম-ধাড়াক্কা গান হোক, বিজাতীয় সংস্কৃতির চর্চা বাড়তে থাকুক। কোন না কোন সময় মানুষকে নিজের সংস্কৃতিতে ফিরতে হয়। বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারার ব্যান্ডের শিল্পীও একসময় রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে চেষ্টা করে। সঙ্গীত যখন তার উপলব্ধিতে আসে তখন সে শিকড়ে ফিরতে চায়। তাই আমি এই সাংস্কৃতিক, শিক্ষার আগ্রাসনে ভীত নই। ইত্তেফাকঃ প্রায় ৫০ বছর আগে ছায়ানট প্রতিষ্ঠার পর দেখা গেল গত দশ বছরে আপনারা বেশ কিছু নতুন কার্যক্রম হাতে নিচ্ছেন। নালন্দা, শিকড় প্রভৃতি। সন্জীদা খাতুনঃ এই যে ছায়ানট, এটা কিন্তু আমাদের নিজেদের নয়। এটা মানুষের। সাধারন মানুষের রক্তে এটা গড়ে উঠেছে। আমাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্য দিয়ে আমরা বুঝেছি সবার আগে শিক্ষা। তার সঙ্গে সঙস্কৃতির যোগ থাকা চাই। সেই লক্ষ্যেই ছায়ানট শুধু সঙ্গীত শিক্ষা ও তার প্রসারেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। শিক্ষা প্রদান কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে বিদ্যায়তন ‘নালন্দা’। ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম ভাষার আলাপ, শিশুদের জন্য ‘শিকড়’। এসব নানা কর্মকা্লের মধ্য দিয়ে আমাদের লক্ষ্যটা হচ্ছে নিজস্ব সংস্কৃতির শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বিশ্বমানব হয়ে ওঠা।’ ইত্তেফাকঃ যে লক্ষ্যে এসব কার্যক্রম শুরু করলেন এসব কাজের মধ্য থিকে আপনার উপলব্ধি কী? সন্জীদা খাতুনঃ আমি চাইলেই তো সবকিছু হয়ে যায় না। তাকে পূর্ণতা দিতে হলে নিরন্তর চেষ্টা প্রয়োজন। সে চেষ্টা শুধু নিজের উদ্যোগকে সফল করার জন্য নয় বরং তা পরিবেশ, সমাজ ও দেশের জন্য। যখন দেখি চারদিকে বিশৃংখলা, ধর্ম নিয়ে হীনতা। যখন দেখি মানুষ মানুষকে সম্মান দেয় না। ধর্মের নামে মনুষত্বের অপমান করা হয়— তখন খুব কষ্ট পাই। সমাজ থেকে এসব দূর করতে হলে মন থেকে সত্ হবার চেষ্টা চাই সবার মাঝে। আমরা ছায়ানট, নালন্দা, শিকড়— এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তা করার চেষ্টা করছি। এই চেষ্টা সকল শুভবুদ্ধি মানুষের মধ্যে থাকলে তবেই একদিন আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবো।