প্রবৃদ্ধি যে হারে এগোচ্ছে তাতে মধ্য আয়ের দেশ হওয়া সম্ভব নয়
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৪৫
দেশের প্রবৃদ্ধি যে হারে এগুচ্ছে তাতে ২০২১ সাল নাগাদ মধ্য আয়ের দেশ হওয়া সম্ভব নয় বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব ব্যাংক। গতবছর ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশের কাছাকাছি থাকবে বলে প্রক্ষেপণ করলেও বিশ্ব ব্যাংক গতকাল শনিবার জানিয়েছে, চলতি (২০১২-২০১৩) অর্থ বছর শেষ নাগাদ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ। বিগত কয়েক বছর যাবত্ দেশের মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার গড়ে হয়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এ হারে প্রবৃদ্ধি হলে ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তর করা সম্ভব নয়। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে একটি মধ্য আয়ের দেশে রূপান্তর করার জন্য ৭ থেকে ৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি হওয়া প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে বিশ্ব ব্যাংক।
গতকাল ঢাকাস্থ কার্যালয়ে বাংলাদেশের উন্নয়নের হালনাগাদ প্রতিবেদন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকাশ করে বিশ্ব ব্যাংক। ভারপ্রাপ্ত আবাসিক প্রতিনিধি সালমান জাহিরের সভাপতিত্বে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকাস্থ কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। তিনি জানান, দেশের বিনিয়োগ স্থবিরতা কাটছে না। কৃষি উত্পাদন ভালো হলেও শিল্পখাতে উত্পাদন দুর্বল হয়ে পড়েছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও রফতানি কমেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যক্তিখাতে ঋণ প্রবাহ অনেক কমে গেছে। অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়ে তিনি বলেন, ইউরোজোনের অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের রফতানি কমেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনীতিও দুর্বল হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে জিএসপি সুবিধা বাতিল হলে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে জনশক্তি রফতানি কমে যাওয়ায় এ খাতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আর্থিক খাতে বিরাজমান অস্থিতিশীলতা এবং চলমান রাজনৈতিক সংকট ও সহিংস পরিস্থিতিকে বাংলাদেশের উন্নয়নে ঝুঁকি বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বর্তমান সহিংসতা অর্থনীতিকে বাধাগ্রস্ত করছে কি-না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান সহিংস পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সেবাখাত। দেশের পরিবহন খাতকে অর্থনীতির জীবনরেখা বলা হয়। সহিংতার ফলে পরিবহন খাত ও বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হবে। তবে কয়েক বছর আগে থেকেই বাংলাদেশে বিনিয়োগ-স্থবিরতা চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থান অনুযায়ী জিডিপির ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগ হওয়া উচিত; কিন্তু বিনিয়োগ হচ্ছে ২৫ দশমিক ২ শতাংশ। প্রকৃত বিনিয়োগে বড় ফারাকের জন্য বাংলাদেশে বিনিয়োগে জমি সংক্রান্ত জটিলতা, বিদ্যুত্ ও গ্যাস সংকটের সাথে সাথে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যকে দায়ী করেন তিনি। সার্বভৌম বন্ডের মাধ্যমে বর্তমান সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এ বন্ড ছেড়ে অর্থ সংগ্রহে অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে সে বিষয়ে জানতে চাইলে জাহিদ হোসেন বলেন, এ ধরনের বন্ড ছাড়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা সরকারের নেই। এর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, গত বছরের তুলনায় চলতি অর্থ বছর ?বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃঢ়তা এসেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবদ্ধি ৬ শতাংশের কাছাকাছিও যেতে পারে। দারিদ্র্য হার হ্রাসে বাংলাদেশের উন্নতি ঘটেছে। ৯০-এর দশকে বাংলাদেশে মাত্র ২৩ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পেরেছিল, সেখানে ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ দেড়কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠে এসেছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, মানুষের শ্রম-আয় বেড়েছে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কারণে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা কমেছে। অন্যদিকে দেশে কর্মসংস্থান তৈরি হলেও বেকারত্বের হার কমছে না। সপ্তাহে ১৫ ঘণ্টাও কাজ করতে পারে না দেশে এমন বেকারের সংখ্যা ১৪ দশমিক ২ শতাংশ। প্রতি বছর ১৩ লাখ বেকার নতুন ভাবে যুক্ত হচ্ছে। বেকারত্বের হার এক অংকের ঘরে নামিয়ে আনার লক্ষ্য সরকারের নির্ধারণ করা উচিত বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা রয়েছে তাতে আগামী দশ বছরে দেড় কোটি লোকের কর্মসংস্থান করা সম্ভব। চীন ও বাংলাদেশের শ্রমিকদের উত্পাদন ক্ষমতা এক হলেও চীনা শ্রমিকদের মজুরি ৫ গুণ বেশি। প্রতিবছর চীনের ৮ কোটি শ্রম দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশ এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ এগিয়েছে। মোট ২৮টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৩টি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ অর্জন করেছে, ১১টি অর্জনের পথে রয়েছে এবং বাকি ১৪টি খাতে আরো যত্নশীল হতে হবে। মাতৃমৃত্যুর হার অনেক কমলেও পুষ্টিখাতে অর্জনের অবস্থা অনেক দুর্বল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।