জা হা ঙ্গী র ন গ র বি শ্ব বি দ্যা ল য়
আনন্দ উল্লাসে লালনের দেশে
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৩, ১৮:৫৮
দিনটি ছিল শুক্রবার। সকালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় রাজবাড়ী জেলা সমিতির উদ্যোগে বের হলাম আনান্দ ভ্রমণে। উদ্দ্যেশ্য বাউল সাধনার প্রধান গুরু বাউল গানের শ্রেষ্ঠ রচয়িতা গায়ক লালন শাহের সমাধিস্থল ও রবীন্দ্রনাথের আবাসস্থল কুষ্টিয়া জেলা। যেহেতু সবাই জাবির শিক্ষার্থী ও রাজবাড়ী জেলার সন্তান তাই ভ্রমণটা ছিল আনান্দ উল্লাসের ঊর্ধ্বে। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া যেতে হলে আমাদের নিজ জেলাকে অতিক্রম করে যেতে হয়। বিশেষ করে পদ্মা নদীতে লঞ্চ ভ্রমণ ছিল আরো আনান্দদায়ক। আমরা ৪০জন শিক্ষার্থী একই গেঞ্জি পরে লঞ্চের ছাদে উঠলাম। লঞ্চের অন্য যাত্রীরা এবং নদী পার হওয়া ফেরী ও নৌকার লোকগুলো আমাদের মজাগুলো উপভোগ করছিল। স্নিগ্ধ বাতাসে পদ্মা-যমুনার মিলনস্থল অতিক্রম করে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে পৌঁছলাম। সেখান থেকে বাসে সরাসরি কুষ্টিয়ার খোকসা পৌঁছে দুপুরের খাবার শেষ করলাম। যাত্রা শুরু করলাম রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ীর দিকে। বাসেও খুব মজা করলাম, যে যার ইচ্ছামত বেসুরে গলায় গান গাইলো। দুপুর দুইটার দিকে পৌঁছালাম রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ীতে। তিনি আমাদের প্রিয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর আবির্ভাব ছিল যুগান্তর। কুষ্টিয়ার শিলাইদাহে রবীন্দ্রনাথ তার জীবনের অনেকটা সময় কাটিয়েছেন। এখানে থেকেও তিনি লিখেছেন অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস। বাড়ীটিতে রয়েছে তার ব্যবহূত কিছু আসবাবপত্র এবং তার আঁকা কিছু ছবি। বাড়ীর পাশেই অবস্থিত দিঘিতে আমরা অনেকেই গোসল করলাম। শুনলাম সেখানকার একজন শিল্পীর কণ্ঠে রবীন্দ্র সঙ্গীত। সেখানে প্রায় ঘন্টাখানেক সময় পার করে আমরা পা বাড়ালাম বাউল সম্রাটের সমাধিস্থলের দিকে।
প্রায় ঘন্টাখানেক পরে পৌঁছালাম লালনের সমাধিস্থলে। দেখলাম তার সমাধিস্থলকে কেন্দ্র করে অনেক শিষ্যভক্ত বসে আছেন। সেখানেই শুনলাম একজন শিষ্যের কণ্ঠে লালনের গান। তার শিষ্যদের কাছ থেকে আরো জানলাম লালনের কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, কিন্তু নিজ সাধনাবলে তিনি হিন্দু-মুসলমান উভয় ধর্মের শাস্ত্র সম্পর্কে একটা গভীর জ্ঞান লাভ করেন। তাঁর রচিত গানে সেই জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়। আধ্যাত্মিক ভাবধারায় তিনি প্রায় দুহাজার গান রচনা করেন।
লালন ছিলেন একজন উদার প্রকৃতির মানুষ। তিনি কোন জাতিভেদ মানতেন না। তাই তিনি গেয়েছেন: সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে/ লালন কয় জাতির কি রূপ দেখলাম না যে নজরে। লালনের গান বাংলার হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের নিকট সমান জনপ্রিয়। তাঁর খাঁচার ভিতর অচিন পাখি ও বাড়ির কাছে আরশী নগর এবং আমার ঘরখানায় কে বিরাজ করে ইত্যাদি গান বাউল সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ।
জানলাম রবীন্দ্রনাথই লালনকে বাঙালি শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করান। ১২৯৭ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক (১৭ অক্টোবর, ১৮৯০) ছেউড়িয়ায় লালন পরলোক গমন করেন। লালনের মাজারকে ঘিরে আশেপাশে গড়ে উঠেছে অনেক লালনসামগ্রীর দোকান। সবগুলো দোকান ঘুরে দেখলাম। অনেকেই অনেককিছু কিনলো। তাই আমিও কিনলাম একতারা, লালনের খোদাইকৃত মূর্তি আর কিছু মালা। এবার ক্যাম্পাসে ফেরার পালা। বাসে কুষ্টিয়া থেকে ফেরার পথে রাতের খাবারের জন্য থামলাম রাজবাড়ী বাজারে। সেখানে রাতের খাবার শেষ করে আবার রওনা দিলাম ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে। আবারও সেই পদ্মা-যমুনার মিলনস্থল অতিক্রম করার পালা। রাতের আকাশে নদীভ্রমণ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আমরা ৫-৬ জন লঞ্চের ছাদে উঠলাম, হাতে একতারা নিয়ে ধরলাম গান, ‘সর্বনাশা পদ্মা নদী, তোর কাছে সুধাই....।