চরমতম স্বাধীন দেশের নাম বাংলাদেশ

আজকের পৃথিবীতে জাতিসংঘের অধিভুক্ত ১৮০টির অধিক রাষ্ট্র এখন নানা অনুষঙ্গে ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃত। তবে কোনো কোনো রাষ্ট্র বিশেষ কোনো বৃহত্ রাষ্ট্রের আনুগত্য মেনে চললেও ঐসব দেশের নাগরিকগণ মূলত কোনো না কোনো বিচারে স্বাধীনই বলা যায়। কোনো রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাধীন বলা হলেও, পৃথিবীর সকল দেশ এবং নাগরিকগণ আসলে ‘সীমিত স্বাধীনতা’ই ভোগ করে। কারণ স্বাধীনতার নামে তাকে রক্ষা করতে হয় অপর দেশ ও নাগরিকের স্বাধীনতা। যেমন বৃটেন স্বাধীন দেশ বলে দখল করতে পারে না ফ্রান্স কিংবা জার্মানি। আবার কানাডার কোনো নাগরিক স্বাধীনতার নামে জোরে মাইক বাজিয়ে প্রতিবেশী, রোগী বা পরীক্ষার্থীকে বিরক্ত করতে পারে না তার ইচ্ছেমতো। কিন্তু বিশ্বের অন্য অনেক স্বাধীন দেশই এ ক্ষেত্রে কিছুটা ‘পরাধীন’ হলেও, সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, যেখানে এদেশের অনেক নাগরিকই ভোগ করে বিশ্বের ঈর্ষণীয় ‘নিরঙ্কুশ ফ্রিস্টাইল স্বাধীনতা’। সে বিচারে ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি স্বাধীন কিংবা বলা চলে চরমতম স্বাধীন। চলুন দেখা যাক বিষয়টি কীভাবে! বিশ্বের প্রায় সকল রাজধানী শহরে চলাচল অযোগ্য কিন্তু ঢাকা শহরের ২০ বছরের পুরনো লক্কর ঝক্কর বাসেও Exclusive Business Class লিখে মানুষকে ‘হতভম্ব করার স্বাধীনতা’ কি ভোগ করতে পারে অস্ট্রিয়া বা বৃটেনের এ জাতীয় কোনো বাস? একটি দেশের রাজধানী শহরের বাসে টিকেট ছাড়া ইচ্ছেমতো ভাড়া দাবি এবং তা আদায় করার স্বাধীনতা কি আছে নিউইয়র্কের বাস কোম্পানির? স্টপেজ ছাড়া যেখানে সেখানে বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর স্বাধীনতা বেলজিয়ামের মতো স্বাধীন দেশের আছে কি? সড়কপথের স্বাধীনতার নামে কী হয় এদেশে, দেখুন একটু পরীক্ষা করে। পাবলিক টেক্সিতে মিটার অগ্রাহ্য করে ইচ্ছেমতো ভাড়া নেওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করে বাংলাদেশের ট্যাক্সিচালকগণ, যা ভোগ করতে পারে না সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশের চালকরাও। এদেশে রিকশাচালকেরা বিনা প্রশিক্ষণ বা লাইসেন্সে রাজপথে স্বাধীনভাবে রিকশা/ভ্যান চালাতে পারে এবং ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকার স্বাধীনতা আছে তার, যা নেই স্বাধীন দেশ বেলজিয়ামের। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে রাস্তা বন্ধ করে দাঁড়ানোর স্বাধীনতা কি হলান্ডের বাসের আছে? ফুটপাত দখল করে দোকান বসানো, হাঁটার ফুটপাথে গাছ, লোহালক্কর রাখার স্বাধীনতা আর কে ভোগ করতে পারে বাংলাদেশের মতো? স্বাধীন বাংলাদেশের ডাক্তারগণ ইচ্ছেমতো সরকারি চাকরি করেও নিজ খুশিমতো ব্যক্তিগত চেম্বার ও ভিজিট আদায় করতে পারেন, হাসপাতালে ৮টার বদলে ১০টায় উপস্থিত হয়ে আবার দেড়টায় হাসপাতাল ত্যাগ করে রাত ১২টা পর্যন্ত নিজ চেম্বারে অগণিত রোগী দেখার যে স্বাধীনতা ভোগ করেন তিনি তা পারেন না গণতন্ত্র আর স্বাধীনতার জনক খোদ গ্রীসের চিকিত্সকগণ। পত্রিকায় যে কোনো সংবাদ প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা আছে বাংলাদেশের সংবাদপত্রের, হোক তা কা’বাঘরের গেলাফ পরিবর্তনের ট্যাম্পারিং করা ছবি। আবার যে কোনো খাবার, ওষুধ ও নানাবিধ জিনিসপত্রে ভেজাল মেশানোর স্বাধীনতায় একদম পিছিয়ে নেই স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকরা। তারা অবাধে মানুষের জন্য তৈরি করা খাবারে দামি ‘ফুড কালারের’ বদলে সস্তা কাপড়ের রঙ মেশাতে পারে এবং এই রঙ বাজারে কেন বিক্রি হয় এমন সাফাই গাইতে পারে, যা পারে না স্পেনের কোনো খাদ্য উত্পাদনকারী ব্যক্তি বা সংস্থা। নির্ধারিত সময়ে ফাইলের কাজ সম্পাদন না করার স্বাধীনতা আছে এ দেশের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। এজন্য জবাবদিহি না করার স্বাধীনতাও পায় সে অবাধে। এমন স্বাধীনতা কি ভোগ করতে পারে অস্ট্রেলিয়ার সরকারি চাকুরেরা? ঢাকার জিপিও থেকে সেগুনবাগিচায় চিঠি ১০ দিনে পৌঁছানোর স্বাধীনতা পান বাংলাদেশের ডাকপিওনগণ, যা ভোগ করে না চীনের কোনো চিঠি বিতরণকারী কিংবা ডাক বিভাগ। যেনতেন ইস্যুতে হরতাল ডাকা এবং হরতালে স্বাধীনভাবে গাড়িতে আগুন দেওয়া, ট্রেনলাইন উপড়ানোর স্বাধীনতা পায় স্বাধীন দেশের পিকেটাররা, যা ভোগ করতে পারে না গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত খোদ গ্রীস বা এথেন্সের নাগরিকগণ। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল প্রভৃতি পেশায় প্রতিদিন লাখ টাকা কামালেও, বছরে মাত্র ২-৩ হাজার টাকা ইনকাম ট্যাক্স দেওয়ার স্বাধীনতা আর কোন স্বাধীন দেশের নাগরিকগণ ভোগ করতে পারে? কানাডার নাগরিকগণ বাংলাদেশের তুলনায় এতোটা স্বাধীন নয় বলে সেখানকার নাগরিকগণ তাঁদের আয়ের ৪০% অর্থই দিয়ে দেন আয়কর হিসেবে, সে হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকগণ কতই না স্বাধীন! প্রচণ্ড যানজট সত্ত্বেও রাস্তা দখল করে জনসভা ও মিছিল করার স্বাধীনতা কি ভোগ করতে পারে ডেনমার্ক না সুইজারল্যান্ডের নাগরিকগণ? প্রকাশ্যে মানুষের সামনে সত্যের বদলে মিথ্যা গলাবাজির স্বাধীনতা বাংলাদেশের মতো আর কোন দেশের লোকেরা ভোগ করে? হাজারো কর্মকর্তাকে কাজ না করিয়ে ‘ওএসডি’ করেও বেতন দেওয়ার ও নেওয়ার স্বাধীনতা আর কোনো স্বাধীন দেশের নাগরিকরা পায় জানা নেই। পত্রিকা ও মিডিয়ায় ভুয়া ফকির, তাবিজ-কবজ, তান্ত্রিক, সর্বরোগের চিকিত্সা, ভুয়া নিয়োগ ও বিয়ের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের স্বাধীনতা অবাধে ভোগ করতে পারে বাংলাদেশের নাগরিকগণ, যা পারে না সুইডেন বা রাশিয়ার মতো স্বাধীন দেশের ‘হতভাগ্য পরাধীন’ নাগরিকরা। কান ঝালাপালা করে সারাদিন যত্রতত্র মাইক বাজিয়ে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নামে চাঁদা তোলা, নানাবিধ প্রচার ও বিপজ্জনক ওষুধ বিক্রির স্বাধীনতা কেবল বাংলাদেশের নাগরিকরাই ভোগ করতে পারে অবাধে, এমনকি পরীক্ষার আগের রাতে কিংবা জীবন সঙ্কটে নিমজ্জমান রোগী পাশের ঘরে থাকলেও। একইভাবে যেখানে সেখানে বিনা অনুমতিতে নানাবিধ পোস্টার-ব্যানার লাগানোর স্বাধীনতা বিনা পয়সায় স্বাধীনভাবে ভোগ করে বাংলাদেশিরা, সে হিসেবে হংকং বা সিঙ্গাপুরের নাগরিকগণ অনেকটাই পরাধীন নয় কি? নিজেদের স্বার্থে ডাকা হরতাল পালনে ভাড়াটে অগ্নিসংযোগকারী কিংবা ভাংচুরের স্বেচ্ছাসেবী আর পাওয়া যাবে কোন দেশে কেবল বাংলাদেশ ছাড়া? তাই তো যে কেউ যখন তখন ডাকতে পারে দেশব্যাপী হরতাল, এজন্যে আগের দিন কয়েকটি গাড়িতে আগুন দিলেই কেল্লা ফতে। তাই হরতাল মানতে বাধ্য করার স্বাধীনতা ভোগ করে এদেশের হরতালকারীরা, অন্য অনেক দেশেই যা থাকে না। দেশের সর্বত্র ভিক্ষা করা ও চাঁদা তোলার স্বাধীনতা আছে বাংলাদেশে, যা পারে না উন্নত চীনের নাগরিকরা। আইন থাকা সত্ত্বেও গাড়িতে সিএনজি নেওয়ার এবং ফেরিতে ওঠার সময় যাত্রী বাসে বসে থাকার স্বাধীনতা ভোগ করা যায় বাংলাদেশে। এ ক্ষেত্রে নরওয়ে বা ফিনল্যান্ডের যাত্রীদের বাংলাদেশের যাত্রীদের মতো স্বাধীনভাবে গাড়িতে বসে থাকার অধিকার নেই। এদেশের মটর সাইকেল চালকরা সিগন্যাল অগ্রাহ্য করে যত্রতত্র ফ্রি স্টাইলে ছোটার ও পথচারিকে ধাক্কা দিয়ে যেভাবে ফুটপাথ দিয়ে ছুটতে পারে দুরন্ত বালকের মতো, তা ভোগ করতে পারে না বিশ্বের কোনো উন্নত কিংবা অনুন্নত দেশে। আবার এদেশের অনেক দোকানিই ওজনে কম দেওয়ার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে, ‘তথাকথিত উন্নত দেশের মতো’ তাকে কড়ায় গণ্ডায় ১ কেজিতে ১০০০ গ্রামই দিতে হয় না। দেশের সর্বত্র ফিটনেসবিহীন লঞ্চ, বোট, টেম্পো, বাস ইত্যাদি চলার স্বাধীনতা পায় বর্ণিত বাহনের মালিক ও চালকরা, যা ইউরোপের কোনো দেশই পায় না। হেলপার হিসেবে কাজ শেষে জাল লাইসেন্স কিংবা বিনা লাইসেন্সে পাবলিক বাসের ড্রাইভার হওয়ার স্বাধীনতা আর কোন দেশের নাগরিক ভোগ করতে পারে চরম স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশ ছাড়া? আবার এদেশের সরকারি অফিসগুলো বিনা নোটিশে যখন তখন বিদ্যুত্, গ্যাস, পানি সরবরাহ বন্ধ করার স্বাধীনতা ভোগ করে, যা পারে না ‘তথাকথিত স্বাধীন’ বিশ্বের দেশগুলো। প্রকাশ্যে অফিস-আদালতে ঘুষ চেয়ে নানা কৌশলে তা আদায় করার স্বাধীনতা পায় আমাদের অফিসের লোকজন, যা কোরিয়ান বা জাপানিরা পারে না। লাখ লাখ মানুষ কোনো কাজ না করেও কেবল চাঁদাবাজি করে জীবন যাপনের স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে বাংলাদেশের মতো দেশে। যা পারে না মেক্সিকো কিংবা ইতালির সাধারণ মানুষ। এভাবে বিচার করলে দেখা যাবে ইউরোপ-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার অনেক দেশের নাগরিক স্বাধীনতার নামে প্রকৃতপক্ষে ‘পরাধীন’, সে হিসেবে একাত্তরে ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তে কেনা বাংলাদেশের লোকজন কতই না স্বাধীন! এ চরম তথা পরম স্বাধীনতা হয়তো এজন্য যে, পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ যখন নিজের দেশকে স্বাধীন রেখেছিল কিংবা অন্যের দেশ দখল করেছিল, তখন বাঙালিরা ছিল নিজ দেশেই পরাধীন। হাজার বছর পরাধীনতার গ্লানি থেকে একাত্তরে প্রকৃত স্বাধীনতা পেয়ে নিজেরা নিজেদের শাসক হয়ে পুরো দেশটিকে পরিণত করেছে একটি স্বেচ্ছাচারী ‘চরম স্বাধীন’ দেশ হিসেবে, যার বর্ণনা সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরা হলো। এখন এ জাতিকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি এভাবে ‘চরম স্বাধীন দেশ’ থাকবে অনন্তকাল? নাকি কিছুটা ‘পরাধীন’ হবে অন্যের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর জন্যে? ঢাকা