মেঘ চায় যে মাছরাঙা

গ্রাম-গাঁয়ে চলতে চলতে হঠাত্ আপনার কানে যদি ‘মেঘ-হও, মেঘ-হও’ কথাটা ভেসে আসে নিশ্চয়ই আপনার মনে প্রশ্ন জাগবে, কার আবার মেঘের এত দরকার পড়ল? যার কণ্ঠ থেকে এমন আওয়াজ ভেসে আসছে—তার অবশ্য মেঘের খুব দরকার! তবে সে বুঝেশুনে ‘কথাটা’ বলছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন। কারণ শব্দটা ভেসে আসে একটা পাখির কণ্ঠ থেকে। নাম ‘মেঘহও মাছরাঙা’। মাছরাঙাই বটে তবে এটা বেশ বড়সড় গোছের। মাছরাঙা হলেও গোত্রের অন্যদের মত মাছের ওপর অতটা লোভ নেই। বরং ব্যাঙ, ইঁদুর এসব পেলে বেশি খুশি। কে জানে, ব্যাঙের লোভেই এরা ‘মেঘ-হও, মেঘ-হও’ বলে ডাকাডাকি করে কিনা! এ পাখির ইংরেজি নাম ‘স্টর্ক বিলর্ড কিংফিশার’। একে ‘মিস্ট্রি বার্ড’ বা ‘মিসলিডিং বার্ডও’ বলা হয়। তবে পাখিটাকে কেন ‘রহস্যময়’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ বলা হয়—তার কারণ অবশ্য জানা যায়নি। পাখিটার বৈজ্ঞানিক নাম Halcyon Capenisis, গোত্রের নাম হালসিওনিদি। দক্ষিণ-দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এদের বাস। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ব্রুনাই, লাওস, ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরে এদের বেশি দেখা যায়। এছাড়াও চীনের দক্ষিণাঞ্চলেও কিছু নজরে পড়ে। স্বভাবে পরিজায়ী নয়। এ পাখি এক এক সময় এক একভাবে ডাকে। যেমন-কোন গাছের ডাল ছেড়ে উড়ে যাওয়ার সময় ডাকে ‘ক্যা-ক্যা-ক্যা,’ প্রজনন সময়ে গান গায় ‘পিউ-পিউ...পিউ-পিউ...পিউ-পিউ’, আবার মাঝে মাঝেই গম্ভীর স্বরে ডাকে ‘মেঘ-হও...মেঘ-হও’। এ পাখি জলাশয়ের আশপাশে গাছের ডালে চুপচাপ বসে থাকে। জোড়ায় জোড়ায় বিচরণ করলেও বসে না পাশাপাশি। খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে বা সঙ্গীটি কাছে পিঠে কোথাও লুকিয়ে থাকে। তবে যেখানেই থাকুক না কেন ডাকাডাকি করে নিজেদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান সেরে নেয়। মেঘহও লম্বায় প্রায় ৩৬-৩৮ সেন্টিমিটার। মাথা ও ঘাড় উজ্জ্বল বাদামি। ঘাড়, গলা, বুক থেকে বস্তিপ্রদেশ পর্যন্ত হলদে বাদামি। অপ্রাপ্ত বয়স্কদের বুকে কালো ডোরা দাগ থাকে এবং শরীরে কমলা রঙের আভা লক্ষণীয়। পিঠ, ডানা, লেজ নীল সবুজের মিশ্রণ। চোখের বলয় লালচে। ঠোঁট রক্ত লাল, অগ্রভাগ কালচে। পা ও আঙ্গুল পরিষ্কার লাল। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। প্রজনন সময় জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর। অঞ্চলভেদে প্রজনন মৌসুমের হেরফের লক্ষ্য করা যায়। এরা জলাশয়ের খাড়া পাড়ে সুড়ঙ্গ করে বাসা বানায়। অনেক সময় গাছের গর্তেও বাসা বাঁধে। ডিম পাড়ে ৪-৫টি।