সিলেট ও কমলগঞ্জে চায়ের উত্পাদন হ্রাসের আশংকা
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০১৩, ২২:১১
ফেব্রুয়ারি ও মার্চের বৃষ্টি চা-গাছের জন্য খুবই প্রয়োজন। কিন্তু এবার এ সময়ে সিলেট বিভাগে তেমন বৃষ্টি হয়নি। তাই সিলেট অঞ্চলের বেশির ভাগ বাগানগুলো থেকে চা-পাতা তোলা সম্ভব হচ্ছে না। গত বছর সিলেটে ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে আশানুরূপ বৃষ্টি হয়েছিল। ফলে চায়ের উত্পাদনও হয়েছিল ভালো। এবার অবস্থা অন্যরকম। চা-বাগান সংশ্লিষ্টদের দুশ্চিন্তায় সময় কাটছে। এর মধ্যে দু’দিন বৃষ্টি হয়ে গেছে। তবে কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়।
চা-বাগান সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেটের বাগানগুলোর অবস্থা যেমন তেমন। মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জের বাগানগুলো বৃষ্টির অভাবে অনেকটা শোচনীয়। তারা জানান, এসব এলাকায় কৃত্রিম সেচ সুবিধাও নেই। অনেক স্থানে পাশের ছড়াগুলোও শুকিয়ে গেছে। তাই বৃষ্টির জন্য তারা চাতকের মত আকাশ পানে চেয়ে আছেন।
গত মৌসুমে এই সময়ে সিলেটের বাগানগুলোতে একশ’ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু এবার এ সময়ে মাত্র ২২ দশমিক ৫মি.মি.বৃষ্টি হয়েছে। তাই মারাত্মক অস্বস্তিতে আছেন চা-বাগান মালিক-শ্রমিকরা। বৃষ্টির স্পর্শে যেখানে চা-বাগানগুলো এখন গাঢ় সবুজ আকার ধারণ, আর বাগানে বাগানে শত শত নারী-পুরুষ চা-চয়নে (চা-পাতা তোলায়) ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু সেখানে এখন অন্যরকম দৃশ্য। তবে সিলেটের কোন কোন বাগানে কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে বাগানগুলোকে সতেজ রাখার চেষ্টা চলছে। এসব বাগানের পাহাড়ের ঢালুতে চা শ্রমিকরা পাতা তুলছেন।
সিলেট শহরের অদূরে হাবিব নগর চা-বাগান ম্যানেজার হুমায়ুন কবির জানান, তাদের বাগানে কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে কোন রকমে চা-চয়নের কাজ শুরু হয়েছে কয়েকদিন আগে। তিনিও বৃষ্টির স্বল্পতার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই সময়ে ভালো চা-উত্পাদনের জন্য বৃষ্টি খুবই প্রয়োজন।
এদিকে দেশীয় বাজারে বছরে ৫ শতাংশ ভোক্তা বাড়লেও চায়ের উত্পাদন বাড়ছে মাত্র ১ শতাংশ। অতিরিক্ত চাহিদা মেটাতে এখন চা আমদানি হচ্ছে। কিন্তু চা শিল্পে গড়ে উঠা সিন্ডিকেট আর বছর বছর বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে দেশের চা শিল্প দুর্দিন কেটে উঠতে পারছে না। চা বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্য। কিন্তু এখন ইন্দোনেশিয়া থেকে চা আমদানি করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই এ খাতে নজর না দিলে ভবিষ্যতে দেশের চায়ের বাজারের একটি বিরাট অংশ দখল করে নেবে বিদেশি চা।
আবহাওয়াজনিত কারণ ছাড়াও চা-গাছের বয়সও উত্পাদনের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। সূত্র জানায়, দেশে মোট ২০ হাজার হেক্টর জমিতে চা-বাগান রয়েছে। এসব বাগানের চা-গাছের বয়স ৬০ বছরের বেশি। ফলে উত্পাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। সেই সাথে রয়েছে বাগান অব্যস্থাপনার বিষয়টিও। এ ব্যাপারে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি চা-বাগানের পরিচালক বলেছেন, পর্যাপ্ত পানির অভাব, ছায়া বৃক্ষ নিধন ও রাজনৈতিক কারণসহ নানা কারণেও সার্বিক উত্পাদন ব্যাহত হচ্ছে।
কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা জানান, আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে কমলগঞ্জ উপজেলার ২২টি চা-বাগানে বিপর্যয় নেমে এসেছে। এসব বাগানের চা-গাছে রেড স্পাইডারের (লাল রোগ) আক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে এবং চা গাছ মরে যাচ্ছে। সেচ ব্যবস্থা থাকলেও নদী, ছড়া শুকিয়ে যাওয়ায় সেচ দিতে না পারায় চায়ের উত্পাদন হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বৃষ্টিপাত না হলে চা শিল্পে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসবে এবং চায়ের উত্পাদন হ্রাস পেয়ে শিল্পের উপর এর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন। সরেজমিনে কমলগঞ্জ উপজেলার শমশেরনগর, আলীনগর, শ্রীগোবিন্দপুর, পাত্রখোলা, কুরমা, চাম্পারায় চা-বাগান ঘুরে দেখা যায়, দীর্ঘ অনাবৃষ্টিতে এ বছর উপজেলার ২২টি চা-বাগানে নতুন ও পুরাতন চা-গাছের ব্যাপক ক্ষতিসাধিত হচ্ছে। খরতাপে নতুন সৃজিত ও পুরাতন চা-গাছ মরে যাচ্ছে। অনেক আগেই নদী, ছড়া ও চা-বাগানের জলাশয়সমূহে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চা-বাগানসমূহের বিভিন্ন টিলায় সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। চলতি মৌসুমে চা-বাগানের প্লান্টেশন এলাকার চা-গাছ কাটিং (আগাছা ছেঁটে দেয়া) হয়। আর এসব কাজের পর নিয়মিত সেচ দেয়ার প্রয়োজন হয়। পাত্রখোলা চা-বাগানের সর্দার আমিনুল ইসলাম ও চা শ্রমিক ইউনিয়ন মনু-ধলই ভ্যালীর সভাপতি গরানা অলমিক বলেন, সেচের অভাবে সবক’টি চা-বাগানে দেদারসে চা-গাছ মরতে শুরু করেছে। এতে চা উত্পাদন ব্যাপকহারে হ্রাস পাবে বলে তারা মন্তব্য করেন।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গলস্থ চা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ড. মঈনুদ্দীন আহমদ কিছুটা চা গাছ মরে যাওয়ার কথা স্বীকার করে ইত্তেফাককে বলেন, এখন পর্যন্ত চা-বাগানসমূহে তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। তবে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বৃষ্টিপাত না হলে চা শিল্পে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও বলেন, আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।