দেশে তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা ২২ দশমিক ৪ ভাগ কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এছাড়াও শতকরা ৩৫ দশমিক ৩ ভাগ নারী কর্মী বলেছেন যে তারা কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের প্রতি যৌন হয়রানির ঘটনা দেখেছেন বা শুনেছেন। অথচ দেশের বৈদেশিক আয়ের ৮০ শতাংশ আসে এই পোশাক শিল্প থেকে এবং এখানে কর্মরতদের মধ্যে শতকরা ৭০ জন নারী।
গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি মিলনায়তনে ‘তৈরি পোশাক শিল্প কারখানায় নারী শ্রমিকদের যৌন হয়রানি : সংগ্রাম ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন অনুষ্ঠানে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) ও কর্মজীবী নারী যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এই গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে—তৈরি পোশাক খাতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে এ খাতে নিয়োজিত নারীদের জন্য নিরাপদ কর্ম পরিবেশ নিশ্চিত করা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য শিরিন আখতার বলেন, পুরুষতান্ত্রিকতা সারা বিশ্বেই রয়েছে। আমাদের নারী নির্যাতনের বিষয়ে সামাজিকভাবে সচেতন হতে হবে। তাছাড়া নারী নির্যাতনের বিষয়ে রাজপথে আন্দোলন জোরালো নয় বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সরকারের সদিচ্ছা আছে। এখন দ্রুত বিচার ও শাস্তি দিতে আমাদের সমন্বিতভাবে রাজপথে জোড়ালো আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা যে ধরনের যৌন হয়রানির শিকার হয়, এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি, অর্থাত্ ৪২ দশমিক ৩৩ শতাংশ হচ্ছে ‘কামনার দৃষ্টিতে তাকানো’। এরপর আছে ‘সংবেদনশীল অঙ্গে কোনোকিছু নিক্ষেপ করা’ যা শতকরা ৩৪ দশমিক ৯২ এবং সংবেদনশীল অঙ্গের প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকানো’ যা শতকরা ৩৩ দশমিক ৮৫ ভাগ। কাজ বোঝানোর বা কথা বলার সময় হাত বা শরীর স্পর্শ করা শতকরা ২৮ দশমিক ৫৭, এছাড়াও আছে বাজে গালি দেওয়া, চাকরিচ্যুতির হুমকি, অশোভন অঙ্গভঙ্গি, পদোন্নতির কথা বলে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব ইত্যাদি।
গবেষণাটি ঢাকার মিরপুর ও চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ ও বাইজিদ বোস্তামি রোডে অবস্থিত ২২টি পোশাক কারখানায় পরিচালিত হয়েছে। এই গবেষণার মূল তথ্য সংগৃহীত হয়েছে একটি কাঠামোবদ্ধ প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে।
যৌন হয়রানির ফলে নানাধরনের ক্ষতি হয়ে থাকে নারী শ্রমিকের ও কারখানা কর্তৃপক্ষের। নারী শ্রমিক রাগ হন, ভয় পান, অপমানিত বোধ করেন, তাদের কাজে ভুল হয়, উত্পাদনের পরিমাণ কমে যায়, ক্রেতাদের অভিযোগের পরিমাণ বাড়ে, অনেকে পদত্যাগ করে, আত্মহত্যাও করেন কেউ কেউ ।
পোশাক শিল্প কারখানায় যৌন হয়রানি ঠেকাতে কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে যেমন—কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন, নারী শ্রমিকদের সচেতনতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির ওপর সরকার ও ক্রেতাদের নজরদারি বাড়াতে হবে, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে মনিটরিং সেল বসাতে হবে, যৌন হয়রানি যে একটি অপরাধ সে বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে নারীর সংখ্যা বাড়াতে হবে । অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, সুইডিশ দূতাবাসের সেক্রেটারি ইলভা শালসট্রেন্ড সেকেন্ড। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। সমাপনী বক্তব্য রাখেন কর্মজীবী নারীর সভাপতি ড. প্রতিমা পাল মজুমদার।